জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়া

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২১, ১০:৩৫ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৫৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বে প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে ১ থেকে ৩ মিলিমিটার করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি’র মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে এর দীর্ঘ উপকূল এলাকা এবং কৃষি খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা। এই অঞ্চলের ৪৩ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষি খাতে নিয়োজিত। আমরা দেখছি যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলে

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেমনি বলা হচ্ছে এ কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই তাপপ্রবাহ শুরু হয় বছরের মে মাসে এবং তা প্রলম্বিত হয় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ বছর মে মাসের শেষ দিকেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও নেপালে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা প্রদান করেনি দেশটির কর্র্তৃপক্ষ, তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দুটি দেশ বাংলাদেশ ও ভারতে এরই মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে। গত মার্চে নয়াদিল্লিতে তাপমাত্রা পৌঁছে গিয়েছিল ৪০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যা মার্চ মাসে গত ৭৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল এ বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যবর্তী সময়ে দেশটির বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হবে। পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগে কর্মরত সরদার সরফরাজ চলতি বছরের এই আগাম তাপপ্রবাহকে স্বাভাবিক ভাবতে পারছেন না। তিনি এই অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই অভিযুক্ত করছেন। বিশেষ করে এই বছর পশ্চিম দিক থেকে হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছে এবং করাচিতে দক্ষিণ দিকে থেকে সমুদ্র থেকে বয়ে আসা হাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সারা দেশ। সরফরাজ বলেন, আগামী দিনগুলোতে ব্যাপক অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অঙ্গরাজ্য সিন্ধু প্রদেশে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে করাচিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এ-সময় কমপক্ষে ১,২০০ মানুষের প্রাণহানি হয় এবং ৪০ হাজার মানুষ হিটস্ট্রোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঋতুরাজ বসন্ত যখন পূর্ণ যৌবনে, ঠিক তখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর করাচির বাসিন্দারা বছরের প্রথম তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এপ্রিল মাসের তিন তারিখে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় যা ছিল ১৯৪৭ সালের পরে এপ্রিল মাসে শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

তাপ সূচক হচ্ছে বাতাসে তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতার যৌথ মাত্রা। তাপমাত্রার প্রভাবে মানুষের দেহে কতটা গরম অনুভব হয় তার পরিমাপক হচ্ছে এটি। একে আপাত তাপমাত্রা হিসেবেও মনে করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য অপ্রত্যাশিত এবং চরম আবহাওয়া করাচি নগরীর ২০ কোটি বাসিন্দার জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে উঠছে। অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে যেমন দুর্ভোগ তেমনি বৃষ্টিতেও বাড়ছে দুর্ভোগ। গত বছর বর্ষা মৌসুমে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে নগরীর বাসিন্দাদের জীবন যেন থমকে গিয়েছিল। ১৯৩১ সালের পর গত বছর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। বৃষ্টির কারণে নগরীতে বন্যা সৃষ্টি হয় এবং বাসিন্দাদের বেশ কিছুদিন বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন থাকতে হয়। সে-সময় কমপক্ষে ৪১ জন মানুষের প্রাণহানি হয়। আমাদের দেশের শহর-বন্দরগুলোও খুব দ্রুত বড় হচ্ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কংক্রিটের দালান আর কমছে সবুজ গাছপালা। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ রয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, আগামী দিনগুলোতে এ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হবে। বিভিন্ন ধরনের সিম্যুলেশন এবং ভবিষ্যতে জনগণের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এই গবেষণায় ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি সংক্রান্ত কিছু অনুমান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয় প্যারিস চুক্তির ঈপ্সিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশি^ক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে হ্রাস করা সম্ভব হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহ একটি স্বাভাবিক জলবায়ু ঘটনা হিসেবেই চলমান থাকতে পারে।

ওয়েট বাল্ব টেম্পারেচারের মাধ্যমে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নির্ণয় করা হয়, পাশাপাশি বাতাসের গতি, মেঘাচ্ছন্নতা, সূর্যের কৌণিক অবস্থান এবং অন্যান্য অবস্থান নিরূপণ করা হয়। এই নির্ণয় প্রক্রিয়ায় ৩২ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রার মধ্যে ঘরের বাইরে শ্রম অনিরাপদ, এবং এই মাত্রা হচ্ছে মানুষের সহ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ। এর অতিরিক্ত তাপমাত্রায় মানুষ তার দেহকে ঠান্ডা করার ক্ষমতা হারায়। গবেষকদের মতে দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অসহনীয় দাবদাহে পর্যুদস্ত হবে কারণ এখানকার ওয়েট বাল্ব সূচকে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সে. এর ওপরে উঠতে শুরু করেছে। প্রায় ১.৫ বিলিয়ন জনসংখ্যার এই অঞ্চলে জন্য ফাহাদ সাঈদের এই গবেষণা ফলাফল একটি সতর্কবার্তা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি নিঃসন্দেহে এখানে ফসল উৎপাদন এবং শ্রমিকদের কার্যক্ষমতার ওপরে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। আর অন্যদিকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়ন এবং নতুন নতুন আবাসন প্রকল্পের কথা চিন্তা করলে নির্মাণ শ্রমিকরা ধীরে ধীরে জনসংখ্যার আরও একটি বিপদগ্রস্ত অংশ হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এর অর্থ হচ্ছে ভূমণ্ডলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাবে। আর এর ফলে উপকূলীয় নগরীগুলো আরও বিপদাপন্ন হয়ে উঠছে। উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে অতি আর্দ্রতা মানে হচ্ছে দুর্যোগের ঘনঘটা। গবেষণায় বলা হয় উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব মূলত অনুভূত হবে করাচি, পেশওয়ার, মুম্বাই ও কলকাতার মতো বড় বড় উপকূলীয় শহরে কর্মরত হাজার হাজার দিনমজুর ও কলকারখানার শ্রমিকদের মধ্যে। এরা হচ্ছে দরিদ্রতম মানুষ যাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজের সুযোগ নেই। অন্যভাবে বলা যায়, তাপমাত্রার এই ঊর্ধ্বগতির ফলে বাড়বে দারিদ্র্য, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনস্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি এই অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ২৯ শতাংশ, অর্থাৎ ২১৬ মিলিয়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সবাই অতি দরিদ্র। এটাই শেষ নয়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে অনুপাতহীনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এখানকার নারীরা। মার্কিন থিংকট্যাংক আর্বান ইনস্টিটিউট ২০১৭ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনসৃষ্ট নানামুখী চাপে বাড়িতে বাড়িতে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে এবং দরিদ্র নারীরা ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গবেষণায় আরও বলা হয়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে দিল্লি এবং ইসলামাবাদে দরিদ্র পরিবারগুলোতে কেউ অসুস্থ হলে নারীদের স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও অতিরিক্ত একঘণ্টা সেবাপ্রদান করতে হয়। জলবায়ুর অভিঘাতে জেন্ডার সমতার বিষয়ে পাকিস্তানি গবেষক  নামিরাহ হামিদ বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি করতে হলে নারী নেতৃত্বকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট নীতিগুলো আরও নারীবান্ধব হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বিশুদ্ধ জ্বালানিতে রান্নার অভিগম্যতা, দুর্যোগ প্রশমন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নারীদের যুক্ত করতে হবে।

রাজনৈতিক কারণে ভারত ও পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ অনেক দেশ হয়তো অনেক বিষয়ে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে অনাগ্রহ বোধ করতেও পারে, তবে জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয় যা সবার জন্যই সমান। দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা বা সার্কের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে গবেষণা ও তথ্য আদান প্রদানের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। 

ঝুঁকিতে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে যাওয়ার কারণ হচ্ছে এটি একদিকে সর্বোচ্চ খরা এবং অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে পড়বে। ব্রিটিশ সমীক্ষাটি অনুযায়ী, উচ্চ ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ৪৯তম অবস্থানে রয়েছে চীন, ৮১তম অবস্থানে ব্রাজিল এবং ৮৬তম অবস্থানে জাপান। এছাড়া ‘মধ্যম’ ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশসমূহের তালিকায় রয়েছে ১১৭তম অবস্থানে রাশিয়া, ১২৯তম অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ১৩১তম অবস্থানে জার্মানি, ১৩৩তম অবস্থানে ফ্রান্স এবং ১৩৮তম অবস্থানে যুক্তরাজ্য। ‘সবচেয়ে কম’ ঝুঁকির মধ্যে থাকা ১১টি দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। এই তালিকায় নেদারল্যান্ডস ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো রয়েছে যারা ইতিমধ্যে তাদের নিম্নাঞ্চলকে বাঁচাতে যথেষ্ট প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। মেপলক্রফ্ট-এর পরিবেশ বিশ্লেষক আনা মস বলেন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা এবং হার দুটোই বাড়ছে। অতি সামান্য পরিমাণ তাপমাত্রা বৃদ্ধিই মানব পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে পানির অভাব, শস্য উৎপাদন হ্রাস, রোগ-বালাই বৃদ্ধি এবং সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ফলে ভূমি হ্রাসের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত