করোনার টিকায় আশার আলো

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২১, ১০:৩৬ পিএম

চলমান করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে জনসংখ্যার বেশিরভাগকে টিকার আওতায় আনা। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই এই সংকটে রয়েছে। তবে, শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো নিজেরা টিকা প্রস্তুত করায় এবং আগাম অর্থ দিয়ে আগেভাগে নিজেদের জনগোষ্ঠীর জন্য টিকা নিশ্চিত করতে পারায় খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন কোভ্যাক্স জোটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় সচেষ্ট। বিশেষত দরিদ্র দেশগুলোতে টিকাকরণের জন্য স্বল্পমূল্যে টিকা জোগাড় ও বিতরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এক্ষেত্রে একটি বড় সংকট হলো যথাসময়ে চাহিদামতো টিকার জোগান নিশ্চিত করা। কেননা, টিকা উৎপাদনকারী সবগুলো দেশের সম্মিলিত সক্ষমতাও চাহিদা-জোগানের এই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারছে না। দেশে টিকাদান শুরুর পর তা আবার সাময়িকভাবে থমকে যাওয়ার নেপথ্যে উপরোক্ত পরিস্থিতিও খানিকটা দায়ী। তবে, এখন দেশে একত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিকার চালান পৌঁছে যাওয়ায় দেশের বেশিরভাগ মানুষকে টিকাদানের প্রচেষ্টায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ দুদিনেই দেশে করোনার মোট ৪৫ লাখ টিকা এসেছে। এর মধ্যে টিকার বৈশ্বিক জোট কোভ্যাক্স থেকে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার ২৫ লাখ টিকা ও চীন থেকে বাংলাদেশের কেনা সিনোফার্মের ২০ লাখ টিকা। এভাবে দেশে মোট চার ধরনের ১ কোটি ৫৯ লাখ ৬২০ টিকা এলো। অবশ্য, এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে ১ কোটি ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯০ ডোজ টিকা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে। সে হিসেবে শনিবার পর্যন্ত দেশে আরও ৫৭ লাখ ২৪ হাজার ৫১৩ টিকা মজুদ ছিল। এই মজুদ টিকা দিয়ে এখনই আরও ২৮ লাখ ৬২ হাজার ২৫৬ জনকে টিকা দেওয়ার কাজ শুরু করা যাবে। এ প্রসঙ্গে কভিড-১৯ টিকাদান টাস্কফোর্স কমিটির প্রধান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, নতুন করে ৪৫ লাখ টিকা আসায় এখন আবার নতুন করে গণটিকাদান নিবন্ধনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা জাতীয় টিকা বিতরণ কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছে। কমিটি অনুমোদন দিলেই দেশে আবার গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। আসলে এতদিনে দেশব্যাপী টিকাদানের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন ছিল। একইসঙ্গে প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল সেই রোডম্যাপ অনুসারে দফায় দফায় নির্দিষ্ট সময়ে টিকার জোগান নিশ্চিত করার। তাহলে টিকাদানের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং টিকাদান কোনো বিরতি ছাড়াই লাগাতার চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যেত।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ করা দরকার যে, পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশও দেশের সব মানুষকে একই কোম্পানির টিকা দিতে পারবে না। সেটার প্রয়োজনও নেই। এতদিন দেশে সিনোফার্ম, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ফাইজার-এর তিন ধরনের টিকা দেওয়া হয়েছে। এখন মডার্নার টিকা আসায় সেটা দেওয়ারও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে, মডার্নার টিকা দেশের সব জায়গায় দেওয়া যাবে কি না, সেটা নিয়ে একটু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ এই টিকা মাইনাস ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখতে হয়। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে যেখানে টিকা সংরক্ষণের কোল্ডচেইন সুবিধা রয়েছে সেসব এলাকাতেই মডার্নার টিকা দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে একই ফর্মুলায় তৈরি ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির দুই ডোজ টিকা দেওয়ার যে ‘মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ’ পদ্ধতি পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে সাফল্য পেয়েছে সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথম ডোজ একটি কোম্পানির টিকা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পরে দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে আরেকটি কোম্পানির সমজাতীয় টিকা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এখন প্রাপ্ত টিকাগুলোর মধ্যে সমজাতীয় টিকাগুলোর দুই ডোজের মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ পদ্ধতিতে যেতে পারে। কেননা, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে এই পদ্ধতিতে বেশি সুফল পাওয়ার কথাও নিশ্চিত করেছেন। তবে এটা করতে হলে আগে যথাযথ পরীক্ষা চালাতে হবে।

এটা সত্যি যে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা, করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আরও জোর দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বেশিরভাগ মানুষকে টিকাদানের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। কেননা জনসংখ্যার অন্তত ৮০ ভাগ মানুষকে টিকাকরণের আওতায় আনা ছাড়া কোনোভাবেই বহুল আলোচিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের আর কোনো পথ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি আবারও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, টিকা কেনার জন্য যত টাকাই লাগুক দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা করা হবে। বৈশ্বিক বাজারে চড়া দামে কিনলেও দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে টিকা দেবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এজন্য এবারের বাজেটেও ৩২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। আরও ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা আছে রিজার্ভে, যদি লাগে সেটাও ব্যবহার করা হবে। আশা করা যায়, সরকার প্রধানের এই দৃঢ় প্রত্যয় বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং টিকাদান কর্র্মসূচির পরিচালকরা দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে করোনার টিকাদানে অগ্রগতি নিশ্চিত করবেন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত