উৎপাদনে শীর্ষে রপ্তানিতে তলানিতে

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২১, ১১:১৪ পিএম

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যেসব বিষয় নিয়ে সত্যিকার অর্থেই গর্ব বোধ করতে পারে তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্য। বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় ছোট্ট আয়তনের এই দেশে

কৃষকরা শুধু দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই করেননি, কৃষি উৎপাদনের বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক একটি অবস্থানও তৈরি করেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, উৎপাদনে নাটকীয় অগ্রগতি ঘটলেও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ফলে কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও বহুমুখীকরণেও পিছিয়ে রয়েছে দেশ। এর ফলে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার দুর্বল ব্যবস্থাপনাজনিত কারণে উৎপাদিত ফসলের এক উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্টও হচ্ছে। এসব দুর্বলতার কারণে কৃষি উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে থেকেও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে তলানিতে বাংলাদেশ। 

কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণে যথাযথ মনোযোগ এবং বিনিয়োগের অভাবই এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ। বিগত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদনে বিশে^র শীর্ষ দশে স্থান করে নেওয়ার সাফল্য বিবেচনা করলে এ বিষয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। আর বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ টন উৎপাদন করে সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। আলু উৎপাদনে বিশ্বে ষষ্ঠ। বছরে ৩৭ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন করে বিশ্বে দ্বিতীয়। বছরে ২৪ লাখ টন উৎপাদন করে আম উৎপাদনে অষ্টম। ১০ লাখ ৪৭ হাজার টন উৎপাদন করে পেয়ারায় অষ্টম। ছাগলের দুধ উৎপাদনে দ্বিতীয় এবং ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে চতুর্থ। একদা সোনালি আঁশ খ্যাত পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, যেখানে মোট বিশ্ব উৎপাদনের ৪২ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ। আর ইলিশে প্রথম, যেখানে মোট বিশ্ব উৎপাদনের ৮৬ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে।

কৃষি উৎপাদনের এই সাফল্যের বিপরীতে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ^বাজারে প্রায় তলানির দিকে। বাস্তবিক অর্থে এটা খুবই দুঃখজনক বিষয় যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের পেশা এখনো কৃষি সেখানে রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। সবশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট রপ্তানিতে কৃষির অবদান ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। যেখানে নিজ দেশের রপ্তানি আয়েই কৃষিপণ্যের অবস্থান তলানিতে সেখানে বিশ^বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনার কোনো সুযোগই নেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং অগ্রাধিকার দৃশ্যমান নয়। তেমনি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান নীতি-কৌশলের ব্যর্থতাও চোখে পড়ার মতো। সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘রপ্তানিতে গুরুত্ব হারাচ্ছে কৃষিপণ্য’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি থেকে বর্তমান বাস্তবতার খানিকটা আভাস পাওয়া যেতে পারে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ঢাকা থেকে বিমানে করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শাকসবজি-ফলমূল বা যেকোনো কৃষিপণ্য পাঠাতে কেজিপ্রতি বিমান ভাড়া গুনতে হয় ১০০ থেকে শুরু করে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত। অথচ প্রতিবেশী দেশের নিকটতম শহর কলকাতা থেকে একই গন্তব্যে এই ভাড়া মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। তুলনামূলক অতিরিক্ত ভাড়াসহ শুধু বিমানবন্দরেই কৃষিপণ্যের রপ্তানিকারকদের যেসব বাধার মধ্যে পড়তে হয় তা দূর করতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ধরনা দিয়েও সুফল পাচ্ছেন না কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকরা। কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিভিন্ন ড্রাই বা শুকনো পণ্যের সঙ্গে কৃষিপণ্যকে অসম প্রতিযোগিতা করতে হয়। বিমানবন্দরে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে যেসব অশুল্ক বাধার মধ্যে পড়তে হয় সেগুলো চিহ্নিত করেছেন তারা। এর অন্যতম হলো পণ্য লোডিং হ্যান্ডেলিং ও স্ক্যানিং করার জন্য চাহিদার তুলনায় খুবই কম স্পেস পাওয়া। দুটি মেশিনের মাধ্যমে শাকসবজি স্ক্যানিং করার কথা থাকলেও একটি মেশিন বেশিরভাগ সবসময় অচল থাকায় স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। আরেকটি বড় সমস্যা কার্গো ভিলেজের লোডিং এরিয়াতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকা। ফলে কৃষিপণ্যের সতেজতা নষ্ট হয় এবং বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুনাম নষ্ট হয়। পাশাপাশি এয়ারলাইনসগুলোর শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে সাময়িক সময়ের জন্য কার্গো ভিলেজে ‘কুল চেইন’ ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি হলেও শাহজালাল বিমানবন্দরে সেই ব্যবস্থা না থাকা। এছাড়া শাকসবজি রপ্তানিতে অটোমেশন প্রক্রিয়া সম্পাদিত থার্ড পার্টির মাধ্যমে সম্পাদনের কারণে ব্যবসায়ীদের ‘বিজনেস সিক্রেসি’ হুমকির মুখে পড়াও একটি বড় সংকট বলে তারা মনে করছেন। অন্যদিকে, থার্ড পার্টিকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতি মাসে এই খাত থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানো।

সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে জোর দিয়ে যথাযথ নীতি-কৌশল গ্রহণ করলে দেশ যেমন রপ্তানি আয় বৃদ্ধির এক নতুন ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হতো, তেমনি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধিও পাশাপাশি উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতেন। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এসব বাধা দূর করে আশু পদক্ষেপ নেওয়া। একইসঙ্গে কৃষি উৎপাদনে দেশের সাফল্য কাজে লাগাতে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত