সরকারের কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে যান। সেখানে গিয়ে কমবেশি সবাই সেমিনার বা ওয়ার্কশপে অংশ নেন। সেসব সেমিনার বা ওয়ার্কশপে উপস্থাপনের জন্য তারা যা লিখে নিয়ে যান বেশিরভাগ কর্মকর্তাই তার বাইরে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। অভিযোগ আছে, অনেকেই অন্য দেশের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে অংশ নিতে পারেন না।
দেশের ভেতরেও ইংরেজিতে দক্ষ কর্মকর্তার অনেক চাহিদা। বিভিন্ন মন্ত্রী বা সচিবকে অনেক সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি (অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রমোশন ও ডেপুটেশন) উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবকে ইংরেজিতে দক্ষ কর্মকর্তা দেওয়ার অনুরোধ করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই এ কথা চালু আছে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ইংরেজি ভাষায় তৈরি করা আন্তর্জাতিক চুক্তি না বুঝেই স্বাক্ষর করছে। অথচ বিশ্বায়নের এ যুগে ইংরেজি ছাড়া যেকোনো দপ্তরের কর্মকর্তাদের এক কদম চলারও সুযোগ নেই। এ জায়গা থেকে বের হয়ে আসার জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণসহ প্রশাসনের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ মডিউলে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রশিক্ষণকালে কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক ইংরেজি চর্চা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবিলায় ইমোশনাল হেলথ সাইকোলজি প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ড. এম আসলাম আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব প্রশিক্ষণ হতে হবে জনবান্ধব। শুধু জনবান্ধবই নয়, পিছিয়ে পড়া জনবান্ধব। আমাদের দেশে প্রশিক্ষণ যে নেই তা নয়। আসলে প্রশিক্ষণ হয় একরকম আর কাজ হয় আরেকরকম। প্রশিক্ষণে যা শেখানো হয় তা বাস্তবায়ন করার পরিবেশ নেই বলে ফিডব্যাক পাওয়া যায়। তারা জানেন, বোঝেন কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেন না। অনেক সময় নিজেদের অসহায় ভাবেন। আমাদের এসবের ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’
বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংস্থা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। একটা সংস্থার প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুর সঙ্গে অন্য সংস্থার ওভারলেপিং হচ্ছে। বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, আইন ও প্রশাসন কোর্স, উচ্চতর প্রশাসন ও উন্নয়ন কোর্স (এসিএডি), সিনিয়র স্টাফ কোর্স (এসএসসি), পলিসি প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কোর্সসহ (পিপিএমসি) বিভিন্ন কোর্সে ঘুরেফিরে একই বিষয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সহিদউল্যাহর নেতৃত্ব একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ মডিউলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কমিটি গত ২ জুন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথমে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ এবং আইন ও প্রশাসন কোর্সের মডিউল সংশোধন করা হবে। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ বা বিপিএটিসি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মডিউল সংশোধন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর বিসিএস প্রশাসন একাডেমি মডিউল সংশোধন করার প্রস্তাব পাঠাবে। যেসব বিষয় একাধিক প্রশিক্ষণের কারিকুলামেই অন্তর্ভুক্ত সেসব বিষয় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে সব ক্যাডার কর্মকর্তাকে উপযোগী করে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আইন ও প্রশাসন কোর্সে শুধু প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের উপযোগী করে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অর্থাৎ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের কারিকুলামে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে তা অন্য কোনো কোর্সের মধ্যে থাকবে না।
বিপিএটিসিতে প্রশিক্ষণার্থীদের ইংরেজি ভাষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। প্রশিক্ষণের সময় শ্রেণিকক্ষ, শ্রেণিকক্ষের বাইরে ক্যাফেটেরিয়া ও লাইব্রেরিসহ সব জায়গায় সবসময় ইংরেজি ভাষার চর্চা বাধ্যতামূলক করা হবে। বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। কর্মকর্তাদের রাইটিং অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল স্কিল বাড়ানোর জন্য কম্প্রেহেনসিভ এক্সামিনেশনে প্রশিক্ষণার্থীদের বর্তমান পরীক্ষার বদলে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রতিটি ন্যূনতম পাঁচ হাজার শব্দের দুটি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়। প্রশিক্ষণের শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজানো হবে যাতে করে প্রশিক্ষণার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আইন ও প্রশাসন কোর্সের মেয়াদ বাড়ানো হবে। এ কোর্সের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ফৌজদারি আইন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ, ভূমি আইন, বিদেশি ভাষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মডিউল সংশোধন করবে। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য ফৌজদারি আইন (সিআরপিসি) বিষয়ে একটি আলাদা মডিউল চালু করা হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় আইনগত ও পদ্ধতিগত বিষয়সমূহও মডিউলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে নবীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিখুঁতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবেন।
এভাবে বিপিএটিসি ও আইন ও প্রশাসন কোর্সের বিষয়ের পুনরাবৃত্তি রোধ, বিষয়ভিত্তিক সমন্বয় সাধন, প্রশিক্ষণ মডিউলকে প্র্যাকটিস ওরিয়েন্টেড ও যুগোপযোগীকরণ করা হচ্ছে। এ দুটি প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে নবীন কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, সেবার মানসিকতা, আচরণগত উৎকর্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটনো হবে। বুনিয়াদি এবং আইন ও প্রশাসন কোর্স আপডেট করার পর এসিএডি, এসএসসি, পিপিএমসি কোর্স আপডেট করা হবে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। কর্মকর্তারা যেন বিশ্বের মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রশিক্ষণ মডিউলে পরিবর্তন এনে যুগোপযোগী করা হচ্ছে।’
বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের বিভিন্ন মডিউলে প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষা সফর কমিয়ে প্রশিক্ষণকালীন নিজ গ্রাম, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জেলা ও উপজেলা, গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি সংস্থা, মেগা প্রকল্প পরিদর্শন করানো হবে। প্রশিক্ষণ মডিউলের লেকচার কমিয়ে প্রেজেন্টেশন, ডেমোনসট্রেশন, কেস স্টাডি, এক্সারসাইজ, ওয়ার্কশপ, রিপোর্ট রাইটিং, গ্রুপ ওয়ার্ক, অ্যাকশন রিসার্চ এসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জনে কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ কারণে এসডিজি কোর্সটাকে বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিকভাবে আপডেট করতে হবে। কোর্সটিতে কেস স্টাডি, ওয়ার্কশপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ইনফরমেশন কমিউনিকেশন টেকনোলজিতে প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ইনফোগ্রাফিকস অ্যান্ড প্রেজেনটেশন টেকনিক এবং ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কনভেনশন চুক্তি আন্তর্জাতিক সংস্থার বিষয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের ধারণা দেওয়ার জন্য এ বিষয়গুলোকে মডিউলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার একীভূত হওয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রশাসন বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও প্রায়োগিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আইন ও প্রশাসন কোর্সের মডিউল সংশোধন করা হবে।
প্রশাসন ও ইকোনমিক ক্যাডার একীভূত হওয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে বিস্তারিতভাবে ধারণা দেওয়া হবে। প্রজেক্ট সম্পর্কে প্রায়োগিক ধারণা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট ভিজিট করানো হবে। এনএপিডির সঙ্গে পরামর্শ করে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সিপিটিইউর সঙ্গে পরামর্শ করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট মডিউলগুলোও সংশোধন করা হবে।
ভূমি অফিস পরিদর্শনের ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকার ভূমি অফিসের বদলে রাজধানীর বাইরের ভূমি অফিস পরিদর্শন করানো হবে। এতে প্রশিক্ষণার্থীরা ভূমি অফিসের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি ও এডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করানো হবে। এতে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা থাকবে।
প্রশিক্ষণার্থীদের ই-গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনোভেশন ইন পাবলিক সার্ভিস বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিটিআরসি ও বিইআরসি ট্রেনিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশন বিষয়ে আলাদা মডিউল করা হবে। যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা ডব্লিউটিও, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সম্পর্কে জানতে পারে।
ল্যাংগুয়েজ স্কিল মডিউলে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাগুলোর মধ্যে ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, অ্যারাবিক ও মেনডারিন ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় না পড়েন। আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিতে দক্ষতার পরিমাপক আইইএলটিএস পরীক্ষায় প্রশিক্ষণার্থীদের ন্যূনতম ৬ পয়েন্ট অর্জনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে।
