করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে ময়মনসিংহে প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ হার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় জেলাজুড়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাসেবা দিতে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে কর্র্তৃপক্ষকে। করোনা ইউনিটে চাহিদার অর্ধেক চিকিৎসক থাকায় প্রায়ই সাধারণ ওয়ার্ড থেকে চিকিৎসকদের এনে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যাদের নেই করোনা চিকিৎসার বিশেষায়িত জ্ঞান। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ায় সংকট আরও প্রকট আকার নিতে পারে আশঙ্কা করছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা এবং টাঙ্গাইল, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই হাসপাতালের নতুন ভবনে করোনা ইউনিট চালু হলে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১৩টি শয্যা এবং ২১০টি সাধারণ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বাড়ায় সম্প্রতি করোনা ইউনিটে আইসিইউ শয্যা বাড়িয়ে ২০টি এবং সাধারণ ওয়ার্ডে শয্যা বাড়িয়ে ৩০০টি করা হয়েছে। তবুও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, মমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গতকাল সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত রেকর্ড ২৯৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এদের মধ্যে ২০ জন আইসিইউতে এবং বাকিরা সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন।
মমেক হাসপাতালের করোনাবিষয়ক ফোকাল পারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কোনো রোগীকেই ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। অর্ধেক জনবল দিয়েই ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই সাধারণ ওয়ার্ড থেকে কর্মরত চিকিৎসকদের এনে সেই অভাব পূরণ করা হচ্ছে। করোনা ইউনিটের পাঁচটি ফ্লোরে প্রতিদিন তিন শিফটে ৪০ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে করোনা ডেডিকেটেড চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৯ জন। বাকি ২১ জনের স্থলে সাধারণ ওয়ার্ডে কর্মরতদের এনে সেবার কাজ করাতে হচ্ছে।’
করোনা ইউনিটে চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে মমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. ওয়ায়েজ উদ্দিন ফরাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক হাজার শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। রোগীর চাপ বাড়ায় করোনা ইউনিটে শয্যার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত করোনা রোগীর সেবা দিতে এখন বাড়তি চিকিৎসকেরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তবে সীমিত জনবল নিয়েও চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় যথাসম্ভব সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি করোনা ইউনিটে চিকিৎসক বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’
এদিকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা সংকটের আশংকা দেখা দিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতেও। সংকট মোকাবিলায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে চিকিৎসক ও কিছু টেকনিশিয়ান চাওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। করোনা চিকিৎসায় বিভাগে ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে ২০টি এবং জামালপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। শেরপুর ও নেত্রকোনাতে নেই কোনো আইসিইউ শয্যা।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ বিভাগে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন ১২১ জন চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পদায়ন করা না হলে আগামীতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশংকা আছে।’
ময়মনসিংহ জেলায় সবশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী ৭০৭টি নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২১০ জনের। পরীক্ষা অনুপাতে আক্রান্তের হার ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জন করোনা শনাক্ত হয়ে এবং ৯ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
