প্রধান চরিত্রের পুরো নামটিই সিনেমার নাম, ড. রেহানা মরিয়ম নূর। তবে এর অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বোঝা যাবে একদম সিনেমার শেষ দৃশ্যে গিয়ে। তার আগ পর্যন্ত মেডিসিনের এই তরুণ সহযোগী অধ্যাপক, যিনি একজন বিধবা, যার প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া একটি মেয়ে রয়েছে, তাকে মনে হবে নরক থেকে উঠে আসা এক গোঁয়ার শিক্ষক।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পরীক্ষার হলে স্কেলের পেছনে নোট লেখার জন্য এক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে তিনি নীতির পরাকাষ্ঠা দেখান। তবে এটি কেবলই ভূমিকা, আসল ঘটনা শুরু হবে যখন তিনি এক অধ্যাপককে এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করতে দেখে ফেলেন। ওই অধ্যাপকের পেছনে তিনি এমন ভাবে উঠে-পড়ে লাগেন, যেমনটা হাড় দেখে করে ক্ষুধার্ত কুকুর।
কাহিনিকার-পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র এক ‘ভারসাম্যহীন’ নারী হৃদয়ের শিহরণ জাগানিয়া প্রতিকৃতি যেন! অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন যে চরিত্র রূপায়ণ করেছেন অসামান্য সফলতার সাথে।
যৌন নিগ্রহের ঘটনা বিচার করার ক্ষেত্রে অন্য সবার মতো ডানে বাঁয়ে তাকানোর বদলে, তাক করা বন্দুকের প্রতি অবিচল একাগ্রতা দেখানোর মতো লড়ে গেছেন রেহানা। আর সেই নারীর প্রতিই সম্মান জানানো হয়েছে সাদের সিনেমায়। তার এই কুকুরের মতো ধৈর্য একই সাথে তাকে করেছে নায়ক, আবার ঠিক একই কারণে তার প্রতি করুণারও উদ্রেক হবে দর্শকের। ফলে নারীবাদীরাও তাকে অনুসরণ করতে স্বস্তি পাবে না, স্বস্তি পাবে না যারা যৌন নিগ্রহের ঘটনাকে ক্ষমার চোখে দেখে তারাও।
রেহানা বাংলাদেশের যে মেডিকেল কলেজে কাজ করেন, সেখানে যৌন নিপীড়নমূলক আচরণ খুবই প্রকটভাবে বিদ্যমান। যেখানে রেহানা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দুষ্টুমির বিষয়ে খুবই কঠোর অবস্থানে, সেখানে প্রফেসর আরেফিন (কাজী সামি হাসান) অনেকটাই সহজ পন্থা নিয়ে থাকেন, বড়জোর কবজিতে একটা চাঁটি মেরেই ছেড়ে দেন। একদিন সেই প্রফেসরের অফিস থেকে তার ছাত্রী অ্যানিকে কাঁদতে কাঁদতে বের হতে দেখতে পান রেহানা, তার অন্তরের পরিশুদ্ধতার প্রকাশ ঘটে যেন মাথায় ঘোমটা দেয়া ঢাকা সাদা ওড়নায়। ভয়াবহ কিছু ঘটেছে আঁচ করতে পেরে পুরো বিষয়টি জানতে কৌতুহলী হয়ে ওঠেন তিনি।
গল্প যত এগোয়, ততই বাড়ে এই ঘটনায় রেহানার অযাচিত নাক গলানো। আমি এই ঘটনার সাক্ষী, আমি তো চুপ করে থাকতে পারি না, এই ভেবে তিনি অ্যানিকে বাধ্য করতে চান অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে। অ্যানি যখন রাজি হয় না, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই ধর্ষিত হয়েছেন বলে দাবি করবেন। তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ওই অধ্যাপককে দিয়ে অপরাধ স্বীকার করানো, পদত্যাগ করা, যাতে তিনি আর কোন শিক্ষার্থীকে নিজের শিকারে পরিণত করতে না পারেন।
এই পর্যন্ত দর্শক রেহানাকে সমর্থনই দিয়ে যাবে, যদিও প্রকাশ্যে ফাঁসির বিষয়ে রেহানার অতি উৎসাহ নিয়ে অনেকেরই আপত্তি থাকবে। তবে সিনেমার দ্বিতীয় অংশে এসে এই নারীর মনের গভীর অন্ধকারের দেখা মিলবে, সিনেমা মোড় নেবে নারীকে দমন করে রাখা, উদ্বেগ আর সহিংসতার কাহিনিতে।
রেহানার জীবনের একটা বড় অংশ আবর্তিত হয় তার মেয়ে ইমু (এই চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন আফিয়া জাহান জায়মা), যে কি না প্রায়শই মায়ের অবহেলার শিকার। আদর করে ইমুকে মাম্মি ডাকেন রেহানা, আর ইমু রেহানাকে ডাকে মাম্মা। মায়ের মতোই জেদি ইমু, আর তাদের দুজনের দ্বৈরথ যেন এক হৃদয় বিদারক জয়হীন প্রতিযোগিতা। এটা পরিষ্কার যে রেহানা এই ছোট মেয়েটির মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান, তাদের দুজনের এই মানসিক দ্বন্দ্ব দুজনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে ।
এই সিনেমায় কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক অবস্থান বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটাননি পরিচালক, সে জন্যেই দর্শক দুইদিক থেকেই ঘটনার গতি দেখতে পান, যেটা একে অন্যের সাথে সাংঘর্ষিকও বটে। রেহানার ভাই যখন ইমুকে মাম্মার কাছে রেখে আসতে যায়, এটা জেনেও যে শিশুটিকে সাংঘাতিকভাবে আশাহত করবে তার বোন, তখন সে প্রশ্ন করে, তুমি কি এটা তার জন্য করছ, নাকি নিজের জন্য?
সিনেমা যতই নাটকীয় মোড় নিতে থাকে, বাঁধনের চরিত্র ততই নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়, মনে হয় সাদ খুব ভালো করেই জানতেন কীভাবে তার ভেতর থেকে চরিত্রটিকে বের করে আনতে হয়। কারিগরি দিক থেকেও ভীষণ দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন সাদ এবং সিনেমার ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি তুমিল তমিজুল। প্রতিটি দৃশ্যে গাঢ়, ঘোলাটে নীলের ব্যবহার এর মধ্যে অন্যতম। যেন প্রতিটি দৃশ্য থেকে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ঠান্ডা, নিরানন্দ রঙের ব্যবহার। রেহানার একমুখী মন, এবং তার ঘোরগ্রস্ততা বোঝাতে, শুধু মাত্র মানুষের চেহারাগুলোকেই ফোকাস করা হয়েছে প্রতিটি দৃশ্যে, ব্যাকগ্রাউন্ড অস্পষ্ট রেখে। ক্যামেরার কাজও খুবই সহজাত, এবং পুরোপুরি স্থির হয়নি কখনোই।
হলিউড রিপোর্ট থেকে অনূদিত।
