ইউসুফ খান থেকে মেগাস্টার দিলীপ কুমার

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ১১:২৪ পিএম

বাবার সঙ্গে বোম্বেতে পা রেখেছিলেন পেশোয়ারের ইউসুফ খান। পরে বাড়ি থেকে পালিয়ে কাজ করতেন রেস্টুরেন্টে। ১৯৪২ সালে বোম্বে টকিজে ১২৫০ রুপিতে অভিনয় শুরু করেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বলিউডের অসংখ্য হিট সিনেমার অভিনেতা ২০২১ সালের ৭ জুলাই সকালে মৃত্যুবরণ করেন। দিলীপ কুমারের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

পেশোয়ারের ইউসুফ খান

১৯২২ সালের ১১ ডিসেম্বর। পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের প্রাণকেন্দ্র কিসসা খাওয়ানি বাজারে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে অনেক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পেশোয়ারে ডিসেম্বর মাসে ভীষণ ঠা-া পড়ে, তুষারপাতও হয়। একদিকে বাজারে আগুন জ্বলছে, অন্যদিকে তুষারপাত হচ্ছে। এমনই পরস্পরবিরোধী পরিবেশে খাওয়ানি বাজারের এক মুসলিম পাঠান পরিবারে জন্ম নেন ইউসুফ খান। মোহাম্মদ সারওয়ার খান ও আয়েশার ১২ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন ইউসুফ। তার বাবা ছিলেন একজন ফল ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে পেশোয়ার থেকে সরাসরি ফ্রন্টিয়ার মেইল ট্রেনে তিনি প্রায়ই বোম্বে আসতেন। তবে এভাবে বারবার যাওয়া-আসা না করে তিনি চাচ্ছিলেন স্থায়ী কোনো জায়গা খুঁজতে। তিনি জানতেন পেশোয়ারের বাগানে উৎপাদিত ফল বোম্বে নগরীতে বিক্রি করলে বেশি লাভের সম্ভাবনা আছে। এজন্য তিনি বোম্বেতে ব্যবসা প্রসারের একটি সুযোগ খুঁজছিলেন। ১৯৩৫ সালে বাবার সঙ্গেই এক দিন সেই ফ্রন্টিয়ার মেইলে চেপে প্রথম বোম্বেতে আসেন ইউসুফ। তার কাছে তখন ট্রেন, স্টেশন, মানুষের এত ভিন্নতা একদম নতুন দৃশ্য। ট্রেন যখন স্টেশনে থামে, তার বাবার বন্ধুরা তাকে স্বাগত জানাতে আসতেন। এ দৃশ্য দেখে বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন কিশোর ইউসুফ। স্টেশনগুলোতে এসে তিনি নতুন একটি দৃশ্য দেখতে পেলেন। তার বাবা যখন ব্যবসায় প্রসার খুঁজছেন, তত দিনে উপমহাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহভাবে। চা-ওয়ালারা গ্রাহক খুঁজত ‘হিন্দু চা, হিন্দু পানি’, ‘মুসলমান চা, মুসলমান পানি’ বলে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই বোম্বের কোলাবা এলাকার নাগদেবি স্ট্রিটে পরিবারের সঙ্গে বসতি গড়লেন ইউসুফ খান।

১৯৩৭ সালে বোম্বের আনজুমান ইসলাম হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ইউসুফ। কিছুদিন পর বোম্বে থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে দেওলালিতে আবার তার পুরো পরিবার স্থানান্তরিত হয়। কয়েক বছর পর তারা আবার বোম্বেতে ফিরে আসেন। ইউসুফ তখন বোম্বের বিখ্যাত খালসা কলেজে ভর্তি হন। এখানে পড়ার সময় তার পরিচয় হয় হিন্দি সিনেমার আরেক কিংবদন্তি রাজকাপুরের সঙ্গে। এই দুই কিংবদন্তির বন্ধুত্ব আজীবন স্থায়ী ছিল। অন্যদিকে, রাজকাপুরের দাদা দেওয়ান বশেশ্বর নাথ কাপুর পেশোয়ারে ইউসুফদের প্রতিবেশী ছিলেন।

ইংরেজি ও উর্দুর প্রতি ইউসুফের অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। তবে দুর্দান্ত মেধাবী বলতে যা বোঝায় তেমন তিনি কখনোই ছিলেন না। বাবা অবশ্য চাইতেন ইউসুফ ভালোভাবে লেখাপড়া শেষ করে চাকরিজীবী হন। নিয়তির লিখন অবশ্য ভিন্ন ছিল। রক্ষণশীল পরিবারের শেকল থেকে বের হয়ে ইউসুফ হাঁটলেন একদম ভিন্ন পথে।

বাড়ি থেকে পালিয়ে

দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের দামামা বাজছে। ইউসুফের বাবার ব্যবসায় তখন একদমই লাভ হচ্ছে না। পেশোয়ারের বাগান থেকে কম খরচে ফলমূল আনতে পারছিলেন না। কারণ ট্রেনগুলো তখন ব্যবহার করা হচ্ছিল অস্ত্র আর গোলাবারুদ বহনের কাজে। ফল ব্যবসা আর চালানো গেল না। অর্থের জোগান দিতে না পেরে তার মন-মেজাজ সব সময় বিগড়ে থাকত। এমন একসময় বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন ইউসুফ। পকেটে মাত্র ৪০ রুপি নিয়ে পুনাতে (বর্তমান পুনে) চলে গেলেন। জীবনের এই পর্বে ইউসুফ ছিলেন একদম একা। অজানা জীবনে কোথায় গেলে কাজ মিলবে জানতেন না। পুনেতে এসে আলাপ হলো এক ক্যাফে মালিকের সঙ্গে। পাশে পেলেন এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দম্পতিকে। তাদের সূত্রে দেখা হলো এক ক্যান্টিন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে। সেনাবাহিনীর ক্লাবের কাছে একটি স্যান্ডউইচের দোকান খুললেন ইউসুফ। ইংরেজি ভালো বলতে আর লিখতে পারতেন। ব্যবসা দাঁড় করাতে সময় লাগল না। তার সততা ও বুদ্ধি দিয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য এখানেও তার সহায়ক ছিল না। যুদ্ধের কারণে এই রেস্টুরেন্টের ব্যবসাও খারাপ হচ্ছিল। সেখান থেকে তাকে চলে যেতে বলা হয়। সিদ্ধান্ত নিলেন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবেন। চাকরি করে জমানো পাঁচ হাজার রুপি নিয়ে আবারও চলে এলেন বোম্বেতে। এত দিন দূরে থাকায় বাবার মনেও ছেলের জন্য ভালোবাসা জমানো ছিল। দুজনে আবার মিলিত হলেন। এবার ফলের ব্যবসা ছেলেকে বুঝিয়ে দিলেন বাবা।

বোম্বে টকিজে

ইউসুফ চেয়েছিলেন পেশাদার ক্রিকেটার হতে। কিন্তু পরিবারের কারণে সেটি পারেননি। বাড়িতে ফিরেও অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হননি তিনি। কিন্তু কাজ তো করতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় বলে রাখছেন কাজের জন্য। এর মধ্যেই জীবন বদলে দেওয়া সুযোগ এলো। তিনি কাজ খুঁজছেন শুনে তার একজন শিক্ষক পরিচয় করিয়ে দিলেন ভারতের অভিনেত্রী দেবিকা রানীর সঙ্গে। হিমাংশু রায়কে সঙ্গে নিয়ে দেবিকা তখন প্রতিষ্ঠা করেছেন বোম্বে টকিজ স্টুডিও। হিন্দি চলচ্চিত্র প্রযোজনার একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠান তখন এটি। ইউসুফ সেখানে গিয়ে শুধু কাজ চাইলেন। যেকোনো কাজ তিনি করতে রাজি ছিলেন। কাজ পেলেন ছবির গল্প বাছাই ও চিত্রনাট্য লেখার কাজে সহায়তার জন্য। ভালোভাবে কাজ করার কারণে ইউনিটে তিনি পরিচিত হয়ে উঠলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ইউসুফকে দেবিকা অফার দিলেন অভিনয় করার জন্য। এদিকে ইউসুফ জীবনে কোনো সিনেমা তো দেখেননি, তার দেখা বলতে শুধু যুদ্ধের একটি ডকুমেন্টারি। তিনি জানতেন না অভিনয় কীভাবে করতে হয়। কিন্তু ভালো অর্থ পাওয়া যাবে এটা জেনে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। অবশেষে ১৯৪২ সালে মাসিক ১২৫০ রুপি বেতনে বেতনভুক্ত অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হলেন বোম্বে টকিজের।

পরের দিন দিলীপ কুমার বোম্বে টকিজের অফিসে গেলেন। দেবিকা রানী তাকে বিখ্যাত অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলিউডের শো-ম্যানখ্যাত রাজকাপুর। খালসা কলেজে পড়ার সময় থেকে তাদের পরিচয়। ইউসুফকে সেখানে দেখে বললেন, ‘আরে, তুমি এখানে? তোমার বাবা কি জানে তুমি অভিনয়ে নামছো?’

ইউসুফ রাজের বন্ধুত্ব দেখে খুশি হলেন দেবিকা। শুরুতে ইউসুফের কাজ ছিল সেটে বসে শুধু সুপারস্টার অশোক কুমারের কাজ দেখা। পরিচালক জ্ঞান মুখার্জি তখন অশোককে নিয়ে কিসমত (১৯৪৩) সিনেমার কাজ করছিলেন। ইউসুফ নিয়মিত তার অভিনয় দেখতে লাগলেন। বাসায় গেলে মা চাকরির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, ‘একটি কোম্পানিতে কাজ করছি। কোম্পানির পরিস্থিতি অনেক ভালো।’ কী কাজ করতে হয়, সে ব্যাপারে এড়িয়ে চলতেন সবাইকে।

ইউসুফ খান থেকে দিলীপ কুমার

ইউসুফ যখন নিয়মিত সেটে বসে অভিনয় দেখছেন দেবিকা তখন তাকে নিয়ে কাজের পরিকল্পনা শুরু করেছেন। ইউসুফ তখনো জানেন না জীবনে কত বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে তার। মিডিয়াপাড়ায় দেবিকা ঘোষণা দিলেন নতুন যুবককে নিয়ে সিনেমা বানাতে যাচ্ছেন তিনি। ইউসুফকে ডাকলেন। জানালেন, ‘দেখো ইউসুফ, আমরা তোমাকে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সিনেমা বানাতে যাচ্ছি। তবে এই নামে নয়। মুসলমান নামের চেয়ে হিন্দু নাম দেখলে স্ক্রিনের প্রতি দর্শক বেশি আকৃষ্ট হবে। তাই আমি পর্দায় তোমার নামটা পরিবর্তন করতে চাই। ইউসুফ খানের বদলে দিলীপ কুমার নাম আমার পছন্দ।’ দ্বিধায় পড়ে গেলেন ইউসুফ। মুসলিম নাম থেকে হিন্দু নাম পরিবর্তনের কথা জানলে তার পরিবার তাকে মেনে নেবে না তিনি জানতেন। তিনি নিজেও চাচ্ছিলেন না নাম বদলাতে। পরদিন শশধর মুখার্জির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তিনি নাম পরিবর্তনের পক্ষে মত দিলেন। তিনি বললেন, ‘দেখো, সুপারস্টার অশোক কুমারের প্রকৃত নাম কিন্তু কুমুদলাল কাঞ্জিলাল গাঙ্গুলি। অশোক কুমার নামেই সবাই তাকে চেনে। তাই, আমি বলছি তোমার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটা ঠিক আছে।’

রুপালি পর্দায়

১৯৪৪ সালে ইউসুফ খান তথা দিলীপ কুমার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘জোয়ার ভাটা’ মুক্তি পায়। তবে সিনেমাটি ফ্লপ হয়। ভারতীয় সিনেমার সমালোচক বাবুরাও পাটেল তখন বলেছিলেন, ‘আমাদের চলচ্চিত্র তারকাদের মধ্যে দিলীপ কুমার একদম নির্লিপ্ত’। পরে ১৯৪৭ সালে ‘জুগনু’ ও ‘নূর জেহান’-এ দর্শক তার অভিনয় বেশ পছন্দ করেন। ‘শহীদ’ চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পর বাবুরাও পাটেল নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ‘মূল চরিত্রকে অন্তর দিয়ে অনুধাবন করেছেন দিলীপ। পুরো চরিত্রে একদম স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন তিনি।’

আর থামানো যায়নি দিলীপকে। একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নদীয়া কি পার’, ‘শবনম’, মেহবুব খানের ‘আন্দাজ’ (এই চলচ্চিত্রে রাজকাপুর ও অভিনেত্রী নার্গিসের সঙ্গে কাজ করেছেন দিলীপ কুমার)। ১৯৫৪ সালে ‘দাগ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে নব্য প্রতিষ্ঠিত ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান। তিনি সর্বমোট সাতবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন, পেয়েছেন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডও। ১৯ বার তিনি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। ভারতীয় সিনেমায় অসামান্য অবদানের জন্য দিলীপ কুমারের ৯৭তম জন্মদিনে ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’ তাকে সম্মানিত করে। কিছু চলচ্চিত্রে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির অভিনয় করায় ‘ট্র্যাজেডি কিং’ উপাধি পান দিলীপ কুমার। এর মধ্যে একটি ছিল, ১৯৫১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিদার’ সিনেমা। এতে তিনি একজন অন্ধ ব্যক্তির ভূমিকায় অভিনয় করেন যিনি অপারেশনের পর আবারও দৃষ্টি ফিরে পান। পরে আবার অন্ধত্ব বরণ করেন যখন জানতে পারেন তার অপারেশন করা চিকিৎসক ও তিনি একই নারীকে ভালোবাসেন। এই অভিনয় করার জন্য দিলীপ কুমার বোম্বের সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের একজন অন্ধ ভিক্ষুককে বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করেছেন। দিলীপের ট্র্যাজেডি কিং উপাধি আরও পোক্ত হয় ১৯৫৫ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবদাস’ অবলম্বনে বিমল রয়ের ‘দেবদাস’-এ মদ্যপ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য।

দিলীপ কুমার অভিনীত প্রায় প্রতিটি সিনেমা, যেমননয়াদৌড় (১৯৫৭), মুসাফির (১৯৫৭), মধুমতি (১৯৫৮), পয়গাম (১৯৫৯), কোহিনূর (১৯৬০) সুপার-ডুপার হিট হয়। হিন্দি সিনেমার স্বর্ণালি যুগের বিখ্যাত নায়িকা নার্গিস, মধুবালা, নিম্মি, বৈজয়ন্তীমালা, মীনা কুমারী, ওয়াহিদা রেহমানসবাই দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দিলীপ কুমারের কোনো বিকল্প ছিল না। তার সৌভাগ্য হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। পরিচালক কমরুদ্দিন আসিফের অনবদ্য সৃষ্টি মুঘল-ই-আজম (১৯৬০) হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ছবির একটি। সম্রাট আকবরের চরিত্রে রাজকাপুরের বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর ও সম্রাট জাহাঙ্গীর ওরফে প্রিন্স সেলিমের চরিত্রে দিলীপ কুমার দুর্দান্ত অভিনয় করেন। ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ পরিচালক ডেভিড লিয়েন দিলীপ কুমারকে লরেন্স অব অ্যারাবিয়া সিনেমায় শেরিফ আলীর ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু দিলীপ কুমার তাকে না করে দেন। এই চরিত্রে পরে অভিনয় করেন মিসরীয় অভিনেতা ওমর শরীফ। দিলীপ কুমারের নিজের প্রযোজিত ছবি ‘গঙ্গা যমুনা’ (১৯৬১) খুব বিখ্যাত একটি ছবি। নিজের ভাই নাসির খানকে এই ছবিতে অভিষিক্ত করেন তিনি। সেটাতে তিনি নিজেও দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন।

সত্তর দশকে ত্রিমূর্তি দিলীপ-দেব-রাজের দাপট কমে যায় রাজেশ খান্না ও পরে অমিতাভ বচ্চনের আগমনে। অবশ্য বয়সও হয়ে গিয়েছিল তাদের। তবু ওয়াহিদা রেহমানের সঙ্গে দিল দিয়া দরদ লিয়া (১৯৬৬), রাম আউর শ্যাম (১৯৬৭) বক্স অফিসে তুমুল ব্যবসা করে। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনীত তার শক্তি (১৯৮২) সিনেমাটিও হিট হয়। তারপর তিনি বিধাতা (১৯৮২), দুনিয়া (১৯৮৪), মশাল (১৯৮৪), কর্ম (১৯৮৬) ও সওদাগর (১৯৯১) সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৯৮ সালে কিলা সিনেমায় সর্বশেষ অভিনয় করেন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দাপুটে অভিনেতা দিলীপ কুমারের রুপালি পর্দার বর্ণাঢ্য জীবন।

বর্ণাঢ্য ব্যক্তি জীবন

ক্যারিয়ারের মতো রঙিন ছিল দিলীপ কুমারের ব্যক্তি জীবনও। ১৯৪৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শহীদ’ সিনেমার নায়িকা কামিনী কৌশলের সঙ্গে তার প্রেমের গল্প সে সময় মিডিয়াপাড়ায় বেশ চর্চা হতো। দুজনে বিয়ে করবেন বলেও ঠিক করেছিলেন। কিন্তু বাধা দিলেন কামিনীর দাদা। তিনি রাজি ছিলেন না এই সম্পর্কে। শোনা যায় তিনি দিলীপ কুমারকে হুমকিও দিয়েছিলেন। এরপর তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। সে বছরই কামিনী বিয়ে করেন তার প্রয়াত দিদির স্বামীকে।

এরপর বলিউডপাড়া মুখর ছিল দিলীপ কুমার আর মধুবালার প্রেম নিয়ে। দীর্ঘ সাত বছর চলেছিল তাদের প্রেমপর্ব। এই সম্পর্ক ভেঙে যায় দুই তারকার ইগো সমস্যায়। একটি ছবির শুটিং লোকেশনে মধুবালাকে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না তার বাবা। পরিচালক-প্রযোজক অনুরোধ করেন দিলীপ কুমারকে। তিনি যেন কথা বলেন মধুবালার বাবার সঙ্গে। দিলীপ কুমারের অভিযোগ ছিল, মধুবালার বাবা তাকে অপমান করেছেন। অন্যদিকে মধুবালার বক্তব্য ছিল, দিলীপ কুমারের কাছে অপমানিত হয়েছেন তার বাবা আতাউল্লাহ খান। তিনি তার বাবার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেননি। মধুবালার কথায় আতাউল্লাহর কাছে ক্ষমা চাননি দিলীপ কুমার। শেষ পর্যন্ত এ সম্পর্কও ভেঙে যায়। ১৯৬০ সালে মধুবালা বিয়ে করেন কিশোর কুমারকে। ১৯৬৬ সালে দিলীপ বিয়ে করেন সায়রা বানুকে। শোনা যায়, তার বিয়ের খবরে মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মধুবালা।

২২ বছর বয়সী সায়রা বানুকে বিয়ের সময় দিলীপ কুমারের বয়স ছিল ৪৪ বছর। একাধিক সাক্ষাৎকারে সায়রা বানু বলেছেন, তিনি ১২ বছর বয়স থেকেই দিলীপ কুমারের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। অথচ তার স্বপ্নের নায়ক তাকে প্রথম দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। প্রথম আলাপে সায়রা বানুর রূপের প্রশংসা করলেও ‘বাচ্চা মেয়ে’ বলে বজায় রাখতেন দূরত্ব।

সায়রা বানু নিজেও অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন। শোনা যায়, সে সময় রাজেন্দ্র কুমারের সঙ্গে তার মৃদু ভালো লাগার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সায়রার মা, বিগত দিনের অভিনেত্রী নাসিম বানুর হস্তক্ষেপে বিবাহিত রাজেন্দ্র কুমারের কাছ থেকে সরে আসেন ‘জংলি’ ও ‘পড়োসন’-এর নায়িকা। এরপর নাসিম বানুই উদ্যোগী হয়ে দিলীপ কুমারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। তখন সায়রা বানুর মনে হয়েছিল, দিলীপ কুমারকে স্বামী হিসেবে পেয়ে তার বহু দিনের স্বপ্ন পূর্ণ হলো। সে সময় অনেকেই বলেছিলেন, এই বিয়ে বেশি দিন স্থায়ী হবে না। কিন্তু নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করে দিলীপ কুমার-সায়রা বানু দুজনে দুজনের পাশে ছায়া হয়ে পাঁচ দশকের বেশি দাম্পত্যজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। পাকিস্তানের নাগরিক আসমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ায় তাদের দাম্পত্যে ফাটল ধরেছিল আটের দশকের গোড়ায়। গুঞ্জন আছে, তিনি সায়রা বানুকে ডিভোর্স করে বিয়ে করেছিলেন আসমাকে। পরে অবশ্য দুজনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়। সায়রা বানু আর অভিনয়ে ফেরেননি। তাদের মতো পাঁচ দশকের বেশি সময় কাটানো দাম্পত্য জীবনের গল্প বলিউডে বিরল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত