করোনায় আবার দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। আগের দিন গত মঙ্গলবারের ১৬৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙে গতকাল বুধবার এক দিনে দেশে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ২০১ জন মারা গেছেন। মহামারীর ১৬ মাসে এই প্রথম দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ২০০-এর ওপরে উঠল।
গত ২৫ জুন দেশে প্রথম সর্বোচ্চ ১০৮ জনের মৃত্যু হয়। পরের দিন তা নেমে আসে ৭৭ জনে। এরপর ২৭ জুন আবার সর্বোচ্চ ১১৯ জনের মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়। এর থেকে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০-এর নিচে নামেনি; বরং বাড়তে বাড়তে গতকাল ২০০ অতিক্রম করল। এ নিয়ে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১৫ হাজার ৫৯৩।
একইভাবে রোগীতেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ১৬২ জনের রেকর্ড হয়েছে গতকাল। করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের ব্যাপক বিস্তারের মধ্যে এপ্রিলের রেকর্ড ভেঙে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়ায় গত ২৮ জুন। এরপর ১ জুলাই থেকে সারা দেশে লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি হয়। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার রেকর্ড ১১ হাজার ৫২৫ জন রোগী শনাক্তের খবর আসে। পরদিন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো তা ১১ হাজারের ওপরে রয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৯ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬৮।
তবে পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার দুদিন ধরেই ৩১ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে।
মৃত্যুর সর্বোচ্চ ও রোগীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ডের দিনে দেশের ২০ জেলা করোনা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব জেলায় দুই সপ্তাহ আগে রোগী শনাক্তের হার ছিল সর্বোচ্চ ২৬ এবং সর্বনিম্ন শূন্য ও ৬ শতাংশ। অথচ গতকাল সর্বশেষ এসব জেলায় সর্বোচ্চ শনাক্ত হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ ও সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ।
এমন অবস্থায় দেশের করোনা সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মতে, এভাবে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকলে করোনা পরিস্থিতি চলতি জুলাই মাসে এপ্রিল-জুনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অবস্থাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
অধিদপ্তর এমন পরিস্থিতির জন্য দেশের চলমান লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ অমান্য করাকে কারণ হিসেবে দেখছে। অধিদপ্তরের মতে, এতে করে রোগী সংখ্যা যদি অস্বাভাবিক বেড়ে যায় তাহলে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, জানুয়ারিতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৬২৯। এপ্রিলে সেটি লাখ ছাড়িয়েছিল। জুন মাসে ১ লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জনে থেমে ছিল, আর জুলাইয়ের মাত্র সাত দিন অতিক্রান্ত হচ্ছে। সাত দিনের মধ্যে ছয় দিনে ৫৩ হাজার ১৪৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সংক্রমণের উচ্চমুখী এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা এপ্রিল ও জুন মাসকে ছাড়িয়ে যাবে। লকডাউন বা বিধিনিষেধ অমান্য করার কারণে রোগীর সংখ্যা যদি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, তাহলে আমরা আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাব।
সংক্রমণ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে এই কর্মকর্তা জানান, এক সপ্তাহ ধরে মৃতের সংখ্যা ১০০-এর ওপরে রয়েছে। এক সপ্তাহের চিত্র যদি আমরা দেখি, ৩০ জুন ১১৫ জন মারা গিয়েছিলেন, ১ জুলাই ১৪৩, ২ জুলাই ১৩২, ৩ জুলাই ১৩৪, ৪ জুলাই ১৫৩, ৫ জুলাই ১৬৪ ও ৬ জুলাই ১৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি। এর আগে ঢাকা বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি থাকত। কিন্তু কিছু দিন ধরে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে মৃত্যুর হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
হটস্পট ২০ জেলা : দুই সপ্তাহে দেশের ২০ জেলা করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। জেলাগুলো হলো শরীয়তপুর, ভোলা, পাবনা, হবিগঞ্জ, বরগুনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ফেনী।
এর মধ্যে দুই সপ্তাহ আগে শরীয়তপুরে শনাক্ত হার ছিল শূন্য শতাংশ, এখন সেখানে শনাক্ত হার ৩৬ শতাংশ। একইভাবে ভোলায় ছিল ৬, এখন ২৭ শতাংশ; পাবনায় ছিল ১১, এখন ২০ শতাংশ; হবিগঞ্জে ছিল ১১, এখন ৪১ শতাংশ; বরগুনায় ১১, এখন ৩১ শতাংশ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১, এখন ৩২ শতাংশ; কক্সবাজারে ১২, এখন ৩২ শতাংশ; লক্ষ্মীপুরে ১২, এখন ৩৫ শতাংশ; টাঙ্গাইলে ১৩, এখন ৫১ শতাংশ; মুন্সীগঞ্জে ১৩, এখন ৪১ শতাংশ; নারায়ণগঞ্জে ১৩, এখন ৩১ শতাংশ; নেত্রকোনায় ১৫, এখন ৩৬ শতাংশ; শেরপুরে ১৫, এখন ৩০ শতাংশ; কুমিল্লায় ১৬, এখন ৩৬ শতাংশ; পটুয়াখালীতে ১৯, এখন ৩৭ শতাংশ; বরিশালে ২০, এখন ৪৯ শতাংশ; নোয়াখালীতে ২৬, এখন ৩২ শতাংশ; গোপালগঞ্জে ২৭, এখন ৫১ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ২৬, এখন ৩৮ শতাংশ এবং ফেনীতে রোগী শনাক্তের হার ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ৫৫ শতাংশ হয়েছে।
রোগী ও মৃত্যু বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি : গত দুই সপ্তাহে দেশে রোগী ও মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এ সময় রোগী বেড়েছে ১০৯ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। দুই সপ্তাহ আগে দেশে দৈনিক রোগী শনাক্ত হতো ৩ হাজার ৮৫৩ জন করে, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৯ জনে। একইভাবে দুই সপ্তাহ আগে যেখানে দৈনিক মারা যেত ৬৪ জন, এখন মারা যাচ্ছে ১৩৩ জন করে।
মৃত্যু বেড়েছে রংপুর বিভাগে : গত দুই সপ্তাহে দেশের আট বিভাগের মধ্যে চার বিভাগে মৃত্যু বেড়েছে। এগুলো হলো খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু বেড়েছে রংপুর বিভাগে ১৮৬ শতাংশ। দুই সপ্তাহ আগে এই বিভাগে দৈনিক মারা যেত ৪ জন করে, এখন মারা যাচ্ছে ১১ জন করে। এরপর ১৫৮ শতাংশ মৃত্যু বেড়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এখানে আগের মতোই দৈনিক দুজন করে মারা যাচ্ছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু বেড়েছে খুলনা বিভাগে ১১৬ শতাংশ। আগে এই বিভাগে দৈনিক মারা যেত ১৮ জন করে, এখন মারা যাচ্ছে ৪০ জন করে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে মৃত্যু বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। আগে এখানে মারা যেত দৈনিক ১৩ জন করে, এখন ১৮ জন।
২৪ ঘণ্টায় বেশি মৃত্যু খুলনা বিভাগে : এই বিভাগে এ সময় মারা গেছে ৬৬ জন। এখানে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ১ হাজার ৬০৩ জন, যা দেশের মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৫৮ জনের। এখানে এ নিয়ে মোট মারা গেল ৭ হাজার ৮৭১ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫০ শতাংশের বেশি।
গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে যে ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১২ জন যশোর এবং ১২ জন খুলনা জেলার বাসিন্দা ছিলেন। আর ঢাকা বিভাগে মারা যাওয়া ৫৮ জনের মধ্যে ২৯ জনই ঢাকা জেলার।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২১, রাজশাহী বিভাগে ১৮, রংপুর বিভাগে ১৪, সিলেট বিভাগে ৯, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮ ও বরিশাল বিভাগে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায়।
মৃত ২০১ জনের মধ্যে ১১৫ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। ৪৭ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে; ২৫ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে; ৯ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে; ৪ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং ১ জনের বয়স ১১ থেকে ২১ বছরের মধ্যে ছিল।
তাদের ১১৯ জন পুরুষ, ৮২ জন নারী। ১৬৫ জন সরকারি হাসপাতালে, ২৩ জন বেসরকারি হাসপাতালে এবং ১২ জন বাসায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একজনকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়।
২৪ ঘণ্টায় বেশি রোগী ঢাকা বিভাগে : কেবল ঢাকা বিভাগেই এক দিনে ৪ হাজার ৭৩২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা দিনের মোট শনাক্তের ৪২ শতাংশের বেশি। খুলনা বিভাগে এক দিনে শনাক্ত রোগী বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯০০, চট্টগ্রামেও দেড় হাজারের ওপরে।
ঢাকা বিভাগের মধ্যে ঢাকা জেলায় ৩ হাজার ২৮৫, টাঙ্গাইলে ২৭৭, গাজীপুরে ২২০, ফরিদপুরে ১৬৩, নারায়ণগঞ্জে ১৫৬, গোপালগঞ্জে ১৫৩ ও কিশোরগঞ্জে ১১৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক দিনে।
চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৬১১, কুমিল্লায় ৩০৩, কক্সবাজারে ১৭৬, নোয়াখালীতে ১৫৭ ও ফেনীতে ১২৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে পাবনায় ২৯১, রাজশাহী জেলায় ২৩৪, বগুড়ায় ১৫৪ ও নাটোরে ১২৯ জন নতুন রোগী মিলেছে।
খুলনা বিভাগের খুলনা জেলায় ৫৮৫, যশোরে ৩৭৩, কুষ্টিয়ায় ২৩৪, ঝিনাইদহে ১৫৬, চুয়াডাঙ্গায় ১৩০, বাগেরহাটে ১১৮ ও সাতক্ষীরায় ১১১ জনের মধ্যে ধরা পড়েছে সংক্রমণ।
রংপুর বিভাগের দিনাজপুরে আরও ১১১ ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১০৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ ছাড়া অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে সিলেট জেলায় ২১৩, বরিশাল জেলায় ১৭৩, ঝালকাঠিতে ১৬৩, পিরোজপুরে ১২১ ও ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৭ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে এক দিনে।
