৮ কর্মকর্তার বদলি নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি বিভক্ত

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২১, ০২:৩০ এএম

আটজন কালচারাল অফিসারকে জেলায় বদলির আদেশ নিয়ে তোলপাড় তৈরি হয়েছে শিল্পকলা একাডেমিতে। শিল্পকলা একাডেমির প্রধান মনে করছেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন রামেন্দু মজুমদারসহ একাডেমির পরিচালনা পরিষদের একাধিক সদস্য। তারা বলছেন, পরিষদ সভার সিদ্ধান্তই মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। এ নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা পরিষদ এখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে।

গত ২৪ জুন আট কালচারাল অফিসারকে জেলায় বদলির আদেশ দেয় মন্ত্রণালয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশ দিতে পারে না দাবি করে আট কর্মকর্তার পক্ষে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী আবদুল মতিন সরকার।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের বদলির আদেশ বাতিল করে গত ৩০ জুন আট কর্মকর্তাকে নিজ নিজ পদে বহাল থাকার পাল্টা আদেশ দিয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বলছেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের বদলির আদেশ ‘শিল্পকলা একাডেমি আইন, ১৯৮৯’-এর লঙ্ঘন। অন্যদিকে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলছেন, আইন মেনেই বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্পকলা একাডেমির পরিষদ সভা। মন্ত্রণালয় পরিষদ সভার সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করছে।

শিল্পকলা সূত্র জানায়, ১৫ জন কালচারাল অফিসারের সদর দপ্তরে থাকা নিয়ে গত ৭ এপ্রিল একাডেমির ১২০তম পরিষদ সভায় আলোচনা হয়। পরিষদের সদস্য রামেন্দু মজুমদার বিষয়টি সভায় উত্থাপন করেন। মহাপরিচালক পরবর্তী সভায় এই ১০ কালচারাল অফিসারের সদর দপ্তরে থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন বলে জানান।

পরিষদ সভার সদস্য সচিব ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিষদ সভায় ১০ কালচারাল অফিসারকে বদলির বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তবে তাদের বদলির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরবর্তী সভায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে বলে আলোচনা হয়েছে।’

অন্যদিকে সেই বৈঠকের সভাপতি ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিষদ সভায় বদলির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি শিল্পকলা আইন মেনেই কার্যকর করছে। বিষয়টি যেহেতু আদালতে গড়িয়েছে, সেখানেই বিষয়টি মীমাংসা হবে।’

গত ২৪ জুন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমা বেগম সাক্ষরিত বদলির আদেশে বলা হয়েছে, ‘শিল্পকলা একাডেমির অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে সদর দপ্তরে জেলা কালচারাল অফিসারের পদ না থাকায় গত ৭ এপ্রিল একাডেমির ১২০তম পরিষদ সভার অনুচ্ছেদ ৬-এর সিদ্ধান্ত-২ মোতাবেক বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী আফসানা খান রুনাকে মুন্সীগঞ্জ, শহিদুল ইসলামকে সাতক্ষীরা, ফারহানা রহমানকে শেরপুর, চাকলাদার মোস্তফা আল মাসউদকে চুয়াডাঙ্গা, এরশাদ হাসানকে টাঙ্গাইল, আল হেলালকে নওগাঁ, আসাফ-উদ-দৌলাকে বরগুনা এবং হাসান মাহমুদকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়। ৩০ জুনের মধ্যে তাদেরকে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় ১ জুলাই পূর্বাহ্ণে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের আদেশ ‘শিল্পকলা আইন, ১৯৮৯’ লঙ্ঘন উল্লেখ করে ২৪ জুন হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী আবদুল মতিন সরকার। এই আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এটি তো আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। ৮ কর্মকর্তার বদলি আইন লঙ্ঘন করে করা হয়েছে। আমরা আদালতে রিট করেছি। এখন আদালত বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

৩০ জুন এক অফিস আদেশে মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক বদলির আদেশ বাতিল করে ৮ কর্মকর্তাকে নিজ নিজ পদে বহাল থাকার নির্দেশ দেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। একাডেমির মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক বদলির আদেশ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে, সেটি অবহিত করে ২৭ জুন আমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি, সেখান থেকে আমি কোনো উত্তর পাইনি। তাছাড়া ১ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে ৩০ জুন ৮ কর্মকর্তাকে সদর দপ্তরে নিজ নিজ পদে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছি।’

পরিষদ সভার বৈঠকে উপস্থিত অধ্যাপক মলয় ভৌমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ জন কালচারাল অফিসারকে জেলায় বদলির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এটি শিল্পকলা আইন মেনেই কার্যকর হবে। আর সেদিনের বৈঠকটি যেহেতু অনলাইনে হয়েছে, সেখানে পুরো আলোচনার তো ভিডিও রেকর্ড থাকার কথা। সেটি দেখলেই পরিষ্কার হওয়া যাবে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি যেহেতু আদালতে গড়িয়েছে, সেটি নিয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

সভায় উপস্থিত রামেন্দু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ জন কালচারাল অফিসারকে বদলির ব্যাপারে সভায় আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনার প্রেক্ষিতেই মন্ত্রণালয় ৮ জনকে বদলি করেছে।’ শিল্পকলার বিষয়ে পরিষদের সিদ্ধান্তে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনার জন্য একটি আইন রয়েছে। সেই আইনে মহাপরিচালক প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সেদিনের বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ের রেজ্যুলেশন আকারে আমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় রেজ্যুলেশনে কিছু পরিবর্তন এনে বদলির আদেশ জারি করেছে। আমি মনে করছি, এটি শিল্পকলা আইন লঙ্ঘন হচ্ছে। কারণ, আইন অনুযায়ী পরিষদ সভার সিদ্ধান্ত শিল্পকলা একাডেমি বাস্তবায়ন করবে। ১৬ জুন এক চিঠিতে মন্ত্রণালয়কে আমি আইন লঙ্ঘনের বিষয়টিও অবহিত করেছি। সেটারও আমি কোনো উত্তর পাইনি।’

এদিকে হঠাৎ করে বদলির আদেশে শিল্পকলা একাডেমির স্বাভাবিক কাজের গতিতে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মনে করছেন মহাপরিচালক।

তবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির কাজে গতি আনতেই ৮ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। অনেক জেলাতেই কালচারাল অফিসার না থাকার কারণে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।’

শিল্পকলার মহাপরিচালক বলেন, ‘সদর দপ্তরে একাডেমির কার্যক্রম পরিচালনায় ৭১টি প্রথম শ্রেণির পদ থাকলেও গত তিন বছর ধরে ৩২টি পদই শূন্য রয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে ১৫ জন কালচারাল অফিসারকে এনে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলির মাধ্যমে একাডেমিকে গভীর সংকটে ফেলে দেওয়া হলো।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত