১৯৫৬ সালে চীনা ওষুধ ব্যবসায়ী সান থিও কুন গোড়াপত্তন করেন প্রাচীন গ্রাম লোরং বোয়াংককের। ঠিক এর ৯ বছর পর স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সিঙ্গাপুর। উন্নয়নের জোয়ারে একে একে কৃষিপ্রধান গ্রামীণ সাংস্কৃতিক আবহ মুছে গেলেও দেশটিতে একমাত্র গ্রাম হিসেবে টিকে আছে কাম্পং লোরং বোয়াংকক। লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
কাম্পং লোরং বোয়াংকক
আকাশচুম্বী ভবনের শহুরে আবহের বাইরে সিঙ্গাপুর দেখতে কেমন ছিল তা বোধ হয় সিঙ্গাপুরের বাসিন্দারা ভুলেই গেছেন। যে নগরায়ণকে বিভিন্ন দেশে এত উৎসাহিত করা হয় সেই নগরায়ণের চূড়ান্ত রূপ আজকের সিঙ্গাপুর। ইট-কাঠ-পাথরের সারি সারি সুউচ্চ ভবন, ঝাঁ চকচকে রাস্তা, সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধা সব মিলিয়ে আজকের সিঙ্গাপুর। ১৮১৯ সালে ব্রিটিশদের হাত ধরে বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল সিঙ্গাপুর। প্রাচীন দ্বীপে শুরু হওয়া নগরায়ণের বীজ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ঝাঁ চকচকে দালানের সিঙ্গাপুরে এখন টিকে আছে একটি মাত্র গ্রাম। সে গ্রামের নাম কাম্পং লোরং বোয়াংকক।
উত্তর-পূর্ব সিঙ্গাপুরের ব্যস্ত ইয়ো চু কাং রাস্তাটি ধরে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে একটি দীর্ঘ মাটির পথ। প্রায় ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্য সে পথ। যেতে যেতে ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে দেখা মিলবে প্রাকৃতিক দৃশ্য। দালান কোঠার ভিড়ে সেই দৃশ্যে মনে হতে পারে টাইম ক্যাপসুলে চাপিয়ে হয়তো ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিন একরের জমিতে দাঁড়িয়ে আছে সিঙ্গাপুরের কাম্পং লোরং বোয়াংকক। ১৯৫৬ সালে সান থিও কুন কিছু জমি কিনে নেন। তার সেই জমির কারণেই এখনো টিকে আছে গ্রামটি। স্কোয়াট বাংলোর সারি সারি গ্রামীণ ঘরবাড়ি নিয়ে গ্রামটিকে অতীতের ঐতিহ্যবাহী স্থান ছাপানো পোস্ট কার্ডের মতো দেখায়।
কাম্পং শব্দটি মালয় ভাষা থেকে আসা। যার অর্থ দাঁড়ায় গ্রাম। শহুরে বিস্তারের বিপরীতে গ্রামটি সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামীণ মরূদ্যানের মতো। স্থানীয়ভাবে কাঠের ঘরবাড়ি বানানো হয়। কাঠের কাঠামোর ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে সে ঘরবাড়ি আপনাকে বাংলাদেশি গ্রামের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। পুরো গ্রামে আছে একটি মাত্র মসজিদ। স্থানীয়ভাবে সে মসজিদকে বলা হয় সুরা।
স্থানীয় একমাত্র মসজিদের নাম সুরা আল ফেরদাউস। কংক্রিটের আচ্ছাদনের বাইরে এখানে চোখে পড়ে গাছের আচ্ছাদন। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে উপকূলীয় গাছ কেটাপাং। কেটাপাং-এর সারি সারি গাছ যেন দাঁড়িয়ে বলতে চাইছে, ‘আমার রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম!’ কাছাকাছি বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলছে তার। এক সিঙ্গাপুরের সব তার চলে গেছে ভূগর্ভে। বিপরীত দিকে বৈদ্যুতিক খুঁটি জানান দিচ্ছে ভূগর্ভে যাওয়ার আগে আমরা এরকমই ছিলাম। গ্রামের বয়স্ক বাসিন্দারা তাদের বারান্দায় বসে ঝিমাচ্ছে। প্রতিটি ঘরে পোষা মুরগি খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে ইচ্ছেমতো এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। কেউ নেই তাদের বিরক্ত করার জন্য। সন্ধ্যা নামলেই ঝিঁঝিঁর ডাকে প্রকৃতি জানান দেবে রাত নেমেছে, খেয়ে দেয়ে ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে। পরদিন সকাল শুরু হবে মোরগের ডাকে। মোরগের কোরাসের চেয়ে ভালো কোনো অ্যালার্মের খোঁজ পাওয়া যাবে না সেখানে। স্মার্টফোনের অ্যালার্মে ঘুমভাঙা সিঙ্গাপুরকে অবাক করে দিয়ে সে প্রাকৃতিক অ্যালার্ম তার বুকের ভেতরে বাস করে। শহুরে নানা দূষণের বাইরে একটি আরামদায়ক আবহে ডুবে আছে সে গ্রাম।
আজ বেশিরভাগ মানুষ চোখ বুজলে যে সিঙ্গাপুর দেখতে পায় তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা কাম্পং লোরং বোয়াংকক জানে নগরায়ণের ভিড়ে প্রাচীনপন্থি হয়ে টিকে থাকার আনন্দ। অথচ ১৯৭০ সালের দিকে এই লোরং বোয়াংকক সিঙ্গাপুরের সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অনুমান করেছিলেন প্রায় ২২০টি নামকরা গ্রাম দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। গ্রাম ভেঙে উন্নয়নের জোয়ারে শহুরে পোশাক গায়ে জড়িয়ে জাতে উঠেছে সিঙ্গাপুর। হারিয়েছে প্রাণ। চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্যের সমাহার দূরে ঠেলে ইতি ঘটেছে প্রাচীন নিজস্ব জীবনযাপনের। শেষে একা হতে হতে একমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে কাম্পং লোরং বোয়াংকক।
কেন এই পরিবর্তন
১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়ার পর উচ্চাকাক্সক্ষী সিঙ্গাপুর দ্রুত নগরায়ণের পথে হাঁটতে শুরু করে। ১৯৮০ সালের দিকে নগরায়ণের হার দ্রুত বাড়তে থাকে। তরুণ সিঙ্গাপুর তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবার চোখে পড়তে শুরু করে। নিজের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও বেগবান করতে প্রাচীন কৃষিভিত্তিক দেশ থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করে দেশটি। ভদ্রলোকের খাতায় নাম ওঠাতে আপাদমস্তক পরিবর্তন করতে থাকে। জনবহুল স্থানগুলোর স্থানীয় ঘরবাড়ি-দোকানগুলোকে মুছে দিয়ে আকাশচুম্বী ভবন গড়ে উঠতে থাকে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের নামে শুরু হয় এক্সপ্রেসওয়ের যুগ। ছোট গ্রামের আটপৌরে আবহ মুছে ছোট রাস্তাগুলো প্রশস্ত করে তৈরি হয় মাল্টি-লেন মহাসড়ক। দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় গ্রামগুলো একে একে মৃত্যুমুখে পড়ে যায়। নগরায়ণের অটোমেটেড অস্ত্রের বিপরীতে প্রাচীন গাছে ঘেরা গ্রামগুলো তাদের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন থেকে বিচ্ছিন্নতর হতে থাকে গ্রাম খুনের ইতিহাস। মহাসড়কের মাটিতে কান পাতলে আজও শোনা যাবে গ্রামীণ মেঠোপথের আর্তি।
শত শত ঐতিহ্যবাহী গ্রামকে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে দেশীয় উদ্ভিদের বেড়ে ওঠা। হারিয়েছে শত শত প্রজাতির স্থানীয় পশুপাখি। মাটির পথগুলো সমতল করা হয়েছে। সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই গ্রামগুলোতে ধ্বংস করা হয়েছে জীবন ও জীবিকা। গ্রামের বাসিন্দারা তাদের বাপ-দাদার ভিটা ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিল। কিন্তু রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তাদের পুরনো বাড়ির ওপরে স্থাপিত হয়েছে সরকারি প্রণোদনার দালান। সে ভর্তুকি দেওয়া ফ্ল্যাটে বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে প্রাচীন অধিবাসীদের। বর্তমান সিঙ্গাপুরের ৮০% মানুষ বাস করে সেই নির্মম ইতিহাস চাপা দেওয়া দালানে। গ্রামীণ সংস্কৃতি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধাহত প্রতিরোধ আত্মসমর্পণ করে বসে। মুছে যেতে থাকে ‘কাম্পং স্পিরিট’ও। সিঙ্গাপুরের প্রাচীন অধিবাসীদের ভেতরে লালন করা সৌহার্দ্য, বিশ্বাস ও উদারতার শিক্ষা মার খায়। অ্যাপার্টমেন্টের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ঘুরে বেড়ায় প্রাচীন দীর্ঘশ্বাস। কাম্পং-এর বাসিন্দারা পরস্পরকে এতই বিশ্বাস করত যে তাদের কখনো দরজা বন্ধ করার দরকার হতো না। পরিবারগুলো প্রতিবেশীদের পাশে থাকার জন্য সব উন্মুক্ত করে রাখত। যার যা প্রয়োজন নিজের মতো করে নিয়ে যেত। আবার নিজ দায়িত্বে ফেরত দিয়ে যেত সেগুলো। জীবনযাত্রায় সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করাই ছিল সেই সংস্কৃতির ধর্ম। সেই সংস্কৃতিকে মুছে সরকারি ব্যানারে স্থাপিত হয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট।
ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরের হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড ডিজাইন-এর সঙ্গে একত্রিত হয়ে শহুরে কাম্পংগুলোর জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে সেই প্রাচীন গ্রামীণ আবহ। মোশন সেন্সর ও শেয়ারড ওয়াইফাই ব্যবহারের মাধ্যমে নাকি ফিরিয়ে আনা যাবে সেই প্রাচীন দোরখোলা সৌহার্দ্য ও বিশ্বাস। জাতীয় উন্নয়ন বিষয়ক তৎকালীন মন্ত্রী লরেন্স ওং বলেন, এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল আমাদের উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে কাম্পং চেতনাকে শক্তিশালী করা। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন আসে জীবনযাপনের চর্চাই কি কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ এই সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করবে? সেখানে পরিবেশও কি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়?
লোরং বোয়াংকক কীভাবে বেঁচে গেল
কাম্পং লোরং বোয়াংকক বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ আশপাশের এলাকা সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকার মতো বাণিজ্যিক, শিল্প ও আবাসিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো এলাকাই বাদ পড়েনি নগরায়ণের কবল থেকে। বন পরিষ্কার করে সব এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নগরায়ণ প্রকল্পে। অবশ্য লোরং বোয়াংকক টিকে থাকার আরও একটি কারণ আছে। গ্রামের জমিদার গ্রামটিকে শহরায়ণ প্রকল্প থেকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছিলেন। সান থিও কুনের হাতে শুরু হওয়া গ্রাম এখনো টিকে আছে তার বংশধরদের হাতে। চীনা ওষুধ বিক্রেতা সান থিও কুনের বংশধর এসএনজি মুই হং এখন গ্রামের জমিদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় গাইড হিসেবে কাজ করেন কেয়ান্টা ইয়াপ। তিনি জানালেন, গ্রামটির বেশিরভাগ প্লট নিকটবর্তী হাসপাতাল ও রাবার বাগানের শ্রমিকদের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রতিটি বাড়ির ভাড়া ছিল ৪.৫০-৩০ ডলার। এখনো কাম্পং লোরং বোয়াংককে বসবাসকারী ২৫টি পরিবার একই হারে খাজনা দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া ব্লকে বাড়ির ভাড়া প্রায় ২০ গুণ, অথচ ঘরগুলো অনেক ছোট ছোট। কাজেই সাশ্রয়ী আবাসনের দিক থেকে কাম্পং লোরং বোয়াংকক সবার চেয়ে এগিয়ে আছে। অথচ ১৯৯০ সালের পর থেকে সেখানে নতুন কোনো অধিবাসী আসেনি। ভবিষ্যতে কেউ আসতে পারে সে সম্ভাবনাও কম। এসএনজি মুই হং ছেলেবেলায় তার বাবা সান থিও কুনকে ওষুধ বানাতে দেখেছেন। তিনিও তার জীবনে সে চর্চা করে গেছেন। তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর আগে তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কাম্পং লোরং বোয়াংকক যেভাবেই হোক সংরক্ষণ করব। সেখান থেকে একচুল নড়েননি তিনি। কয়েক দশক ধরে নিজের প্রতিজ্ঞায় অবিচল থেকে গ্রামটি রক্ষা করে যাচ্ছেন।
২০১৪ সালে গ্রামটি ধ্বংস করে একটি মহাসড়ক, দুটি স্কুল ও একটি পার্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গ্রামপ্রধানের তীব্র আপত্তির কথা আগে থেকেই জানত সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। সরকার যদিও পরে সে প্রস্তাব থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রী ডেসমন্ড লি বলেছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে এ উন্নয়ন বাস্তবায়নের কোনো ইচ্ছে নেই সরকারের।’ মন্ত্রীর কথায় একটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে উন্নয়ন মানেই প্রাণ থেকে পাথুরে জীবন যাপনের পথে ধেয়ে চলা।
সে সময় সিঙ্গাপুরের অনেক মানুষ সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। সিঙ্গাপুরবাসী তাদের এই গ্রামটিকে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে। যদিও সিঙ্গাপুর সরকার কাম্পং লোরং বোয়াংকককে তাদের উন্নয়নের বিরোধী বলে মনে করত। কিন্তু জনমতের চাপে বাধ্য হয়ে তারা এখন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।
সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নীতি ও নেতৃত্বের বর্তমান সহকারী অধ্যাপক ও প্রাক্তন রাজনীতিবিদ ড. ইন্তান মোখতার ব্যাখ্যা করেছেন, ‘কাম্পং লোরং বোয়াংকককে কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের জন্য স্কুলের অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে। যখন কোনো পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় তখন সরকারের উচিত স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলা। তাদের কথা শুনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। সামগ্রিক ও সুসংগত উপায়ে কাজ করেও উন্নয়ন রাস্তায় হাঁটা সম্ভব।’ গ্রামটির অধিবাসী নাসিম জানান, ‘শুনে ভালো লাগছে যে, সরকার আমাদের কাম্পংকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আপনাকে এমন কিছু রেখে যেতে হবে যা পরবর্তী প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় দেশটি কীভাবে এসেছিল। আমরা সবাই কুঁড়েঘর থেকে উঠে এসেছি। সরকারকে বুঝতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে বোঝাতে সহায়তা করতে হবে যে, কেন কাম্পং লোরং বোয়াংকক সংরক্ষণ করা দরকার।’
লকডাউনের পর
গত জুন মাসে সিঙ্গাপুরে লকডাউন রদ করা হয়। তখন দেখা যায় আবাসন বদলানোর প্রতি মানুষের নতুন আগ্রহ। কাম্পং লোরং বোয়াংকক হয়ে ওঠে শহুরে খাঁচায় লকডাউনের ফলে আটকেপড়া মানুষের আগ্রহের জায়গা। কেয়ান্টা ইয়াপ জানালেন, ‘এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। দীর্ঘদিন মানুষ আটকে ছিল। কেউ কোথাও যেতে পারেনি। ফলে স্থানীয় পর্যটনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। অনেক ভ্রমণকারী নিজেরাই মাঝেমধ্যে গ্রামে ঘুরতে যান। নির্জন গ্রামে ২৫টি পরিবার এখন কৌতূহলী পথচারীদের অবিরাম স্রোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।’
সিঙ্গাপুরের জমি যেখানে অতি মূল্যবান পণ্য সেখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রাচীন সাংস্কৃতিক আবহ ধরে রাখা এবং সেটির বিকাশে এগিয়ে আসা ভীষণ কষ্টসাধ্য বিষয়। কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে হাঁটছেন জেনেই সান থিও কুন যে গ্রামের গোড়াপত্তন করেছিলেন, সেটি এখনো তার সন্তানদের হাত ধরেই টিকে আছে। যেকোনো দেশ ও তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জাতির শেকড়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। এ মুহূর্তে সিঙ্গাপুরের জন্য কাম্পং লোরং বোয়াংকক সেই প্রাচীন সাংস্কৃতিক মহীরুহ। যেকোনো পরিস্থিতিতে গ্রামটি টিকিয়ে রাখা একান্ত দরকার।
