মাতম চলছেই, নিখোঁজদের সন্ধানে দৌড়ঝাঁপ স্বজনদের

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০২:২৫ এএম

ভোলার আমিনাবাদের কবির মো. মোজাম্মেল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হাসনাইন (১২)। করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় গত ঈদুল ফিতরের এক সপ্তাহ পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় কাজ নেয়। উদ্দেশ্য ছিল কৃষক বাবার অভাবের সংসার চালাতে একটু পাশে দাঁড়ানো। কারখানার চতুর্থ তলায় সেমাই তৈরির কাজ করত হাসনাইন। ওই ভবনে আগুন লাগার পর থেকে নিখোঁজ দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট হাসনাইন।

হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানা ভবনে আগুন লাগার পর থেকেই হাসনাইনের মামি ফরিদা বেগম, খালা লাইজু বেগম ও বড় বোন তানিয়া কখনো কারখানার সামনে আবার কখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে ছুটছেন। তাদের ছোটাছুটিতেও ছেলের কোনো সন্ধান না মেলায় গতকাল রবিবার ভোলার চরফ্যাশনের আবদুল্লাহপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন বাবা মো. ফজলুর রহমান। ভোলা থেকে সোজা ঢামেক মর্গে আসেন ডিএনএ নমুনা দিতে।

মর্গের সামনে আহাজারি করে ফজলুর রহমান বলছিলেন, ‘আমার মাসুম বাচ্চা, আমার কাছ থেকে নিয়ে আসছে, পূর্বপরিচিত ঠিকাদার মোতালেব নিয়ে আসছিল। আমি প্রতিদিন এক-দুবার ফোনে কথা বলতাম, ভালোই আছে শুনি কল দিলে। মোতালেবকে বলি, আমার ছেলে কাজ না পারলে আমার বুকে ছেড়ে দেন, ছয় দিন পর চলে আসব বলেছিল। বৃহস্পতিবার ৫টায় আমার মনে খারাপ লাগে, রাকিবকে (ভাতিজা) ফোন দিই, ধরে না, ঠিকাদারও ফোন ধরে না। পরে মোতালেব ফোন ধরে জানায়, কারখানায় আগুন লাগছে।’

আর্তনাদ করতে করতে তিনি আরও বলেন, ‘নমুনা দিয়েছি। আমার ছেলেরে আমার কাছে দেন, লাশ হইলেও লাশটা দেন। আমি আমার ছেলেডারে চাই।’

রূপগঞ্জের ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ নোমান মাতব্বরের (১৮) বাবা আবদুল মান্নান মাতব্বর গতকাল ভোলার চরফ্যাশন থেকে ঢামেক মর্গে আসেন ডিএনএ নমুনা দিতে। তিনি জানান, চার বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করছে নোমান। কারখানার পাশেই থাকত। দূর সম্পর্কের চাচা ফয়সাল তাকে এখানে নিয়ে আসে। আগুন লাগার পর পাঁচতলায় ওঠে তারা দুজনই। তখন নোমান আবার সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামে বের হওয়ার জন্য। চারতলায় নামার পর গেট আটকে দিলে সেখানে আটকে পড়ে। ফয়সাল আগুন লাগার পর বাড়িতে ফোন দিয়ে খবর জানায়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া তিন লাশের দাবিদার এখনো পাওয়া যায়নি। আগুনে পুড়ে বিকৃত হওয়া সব লাশের স্বজন শনাক্তে গত শুক্রবার থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে সিআইডি। ঢামেক মর্গের পাশে ক্যাম্প বসিয়ে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত ৪৫ লাশের দাবিদার ৬৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডি। অবশিষ্ট তিন লাশের দাবিদার এখনো কেউ আসেনি নমুনা দিতে। আজ সোমবার থেকে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। লাশ ও স্বজনদের ডিএনএ নমুন মিলিয়ে মরদেহ বুঝিয়ে দিতে ন্যূনতম তিন সপ্তাহ লাগবে।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ সুপার রুমানা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) পর্যন্ত ৪৫ লাশের দাবিদারদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোনো কোনো লাশের একাধিক স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা ৬৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্যমতে, ৪৮টি লাশের জন্য আমরা তাদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছি। এখনো তিনটি লাশের কোনো স্বজন আমাদের কাছে আসেনি। আগামীকাল (আজ সোমবার) থেকে মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে লাশের দাবিদাররা নমুনা দিতে পারবে। ঢামেক মর্গে আমরা ফোন নম্বরসহ নমুনা সংগ্রহের ব্যানার টানিয়ে দিয়েছি। যতক্ষণ সবকটি লাশের দাবিদার না আসবে, ততক্ষণ আমাদের এ কার্যক্রম চলমান থাকবে।’

ঢামেক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, মর্গে আসা ৪৮টি মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত শেষ করে তিন ভাগে ভাগ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১৫টি মরদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে, ৮টি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্চুয়ারিতে আর বাকি ২৫টি মরদেহ রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত