এক. মগবাজারের রহস্যময় বিস্ফোরণের ক্ষত শুকায়নি এখনো। আর প্রতিদিন করোনায় মৃত্যুর মিছিল চলছে বিরামহীন। এরই মধ্যে আবারও এলো আগুনে মৃত্যুর খবর, পুড়ে কয়লা হওয়া লাশের ছবি। মনে পড়ে ২০১০ সালের ৩ জুন রাজধানীর নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে মারা গেলেন ১২৫ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে মারা গেলেন আরও ৮১ জন। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে লাগা আগুনে পুড়ে কয়লা হলেন ১১২ পোশাক শ্রমিক। একই বছর রানা প্লাজায় ভবন ধসে জীবন্ত সমাধি হলো কত কত প্রাণের। দেশের কলকারখানায় এ রকম মারাত্মক অগ্নিকা- আর ভয়াবহ দুর্ঘটনার যেন কোনো শেষ নেই। আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া লাশের ছবি, আকাশ ছেয়ে ফেলা আগুনের লেলিহান শিখা কিংবা বিধ্বস্ত কোনো ভবনের ছবি দেখলে হঠাৎ কারুর মনে হতেই পারে যে এসব ছবি কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা। কিন্তু না। সিরিয়া কিংবা ফিলিস্তিন নয়, আমাদের দেশেই বারবার এমন মর্মান্তিক সব দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে।
দুই. দুই দশকেরও বেশি আগে থেকে কবি-শিল্পী কফিল আহমেদ গানে গানে বলে চলেছেন ‘আমারে তালাবদ্ধ রেখে, আমারে আগুনে পুড়িয়ে মেরে/প্রেসনোট, শুধু প্রেসনোট আমি চাই না।। বদ্ধ দমবদ্ধ ঘরে আমারে আটক মানি না, তোমারে আটক মানি না।।’ অথচ এই প্রেসনোটই যেন এখনো এদেশে শ্রমিকদের একমাত্র বাস্তবতা। মৃত্যু আর নামকাওয়াস্তে ক্ষতিপূরণের প্রেসনোট জারি করেই দায়িত্বশীলরা কর্তব্য শেষ করেন! আর যারা অর্থনীতির চাকাটি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে টেনে নিয়ে যান, তারা বরাবারই এই দেশে তালাবদ্ধ অবস্থায় আগুনে বা ভবন ধসে মারা পড়েন। কফিল আহমেদ এই গানটি লিখেছিলেন ১৯৯৭ সালে রাজধানীতে একটি কারখানায় তালাবদ্ধ অবস্থায় আগুনে পুড়ে সাত শ্রমিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে। তারপর কত শত শত শ্রমিক কত কত কারখানায় এভাবে তালাবদ্ধ অবস্থায় জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন। কিন্তু কারখানা মালিক আর সরকারের কলকারখানা পরিদর্শকদের কারা সেসব মৃত্যুর জন্য দায়ী সেসব নিয়ে রাষ্ট্র আজও কোনো প্রেসনোট দিল না। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুসের কারখানায় এক নিমেষে অর্ধ শতেরও বেশি শ্রমিকের জীবন চলে গেল, সে জীবনের দাম আমরা কোন পাল্লায় মাপছি। বক্তৃতাবাজি করে বলাই যায় প্রতিটি জীবনই মূল্যবান। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা আর শিল্পমালিকদের নির্লজ্জ বয়ানের পর এই সব তরতাজা প্রাণই তো কেবল কয়েকটা মাত্র সংখ্যায় পরিণত হয়। একুশ শতক আর সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তবতায় আমাদের শোকের আয়ু তো বড়জোর এক সপ্তাহ মাত্র!
তিন. এই করোনা মহামারীর সময়ে আরও হাজারটা সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকা শ্রমজীবী এই মানুষেরা শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না! এমনকি তারা ছবিও হতে পারলেন না। কেননা পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় কারুর পক্ষেই আর কারুকে এমনকি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি। স্বজনরা এখন নিহতের লাশ দাবিও করতে পারছেন না। বলছেনআমার মায়ের, আমার ভাইয়ের, আমার বোনের হাড়গোড়গুলো দয়া করে দিন! শ্রেণি বিচারে হতাহতদের সবচেয়ে আপন অন্য শ্রমিকরা উঠে এসেছেন ছবিতে বিক্ষুব্ধ, দ্রোহী। এখনো বেঁচে থাকা এই শ্রমিকরা জানতে চান, কেন বারবার তাদের এমন করে মরতে হয়? কেন আগুন লাগলে শুধু শ্রমিকরাই মরে? শ্রমিকরা সেই কবে থেকে এই প্রশ্ন তুলে আসছেন। একেকটি ঘটনায় কত কত মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছে। চলে গেছে কত কত দিন। তবু কারখানার আগুনে শুধু শ্রমিকরাই পুড়ে মরবেন। আর সে দায় নেওয়ার জন্যও কেউ থাকবে না। দায়ের হিসাব চোকানো হবে ন্যূনতম অর্থমূল্যে। হয়তো, লাশের মূল্য নির্ধারণ করার জন্য সংশ্লিষ্টরা খাতা-কলম নিয়ে বসেছেন। উন্নয়নের এই দেশে এভাবে শ্রমিক সে জীবিতই হোক কিংবা মৃত শ্রমিক কেবলই সংখ্যা। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকা-ে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর আশা কর হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোধোদয় হবে, সরকারও কারখানা মালিকদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করবে। কিন্তু ৯ বছর পর এসে দেখা গেল, অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষাই আমরা নিইনি। কারখানাগুলো চলছে ডিক্টেটরশিপ কায়দায়। আইনের বিষয়টি খাতা-কলমে আছে। বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেই।
চার. সেজান জুসের এই কারখানার আগুন নেভাতে প্রায় দুদিন সময় লেগেছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। আর আগুনে পুড়তে থাকা কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকা শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বঞ্চনা আর মালিক পক্ষ, সরকার পক্ষসহ সব পক্ষের প্রতিই শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। এ বিক্ষোভের একটা তাৎপর্য আছে। এ দেশে শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ভালো না। তারা বারবার নিজের স্বজনদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে দেলোয়ার হোসেনদের হাসতে দেখেছে। তারা বারবার আবুল হাসেমদের অনায়াসেই বলতে শুনেছে ‘আমার কোনো দায় নেই।’ তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকা- নিয়ে মামলা চলার সময় প্রতিষ্ঠানটির মালিক দেলোয়ার হোসেনকে বলতে শোনা গিয়েছিল‘আমার কিসসু হবে না।’
পাঁচ. রূপগঞ্জের সজীব গ্রুপের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুন লাগার রহস্য হয়তো উদঘাটন করা হবে। সেসব জানার পর হা-হুতাশ করা মানুষের সংখ্যা বাড়বে। হয়তো প-িতজনেরা অনেক অনেক তেল-জল খরচ করে এর নিদান দেবেন। আমরা সেসব শুনব। কিন্তু দেশে বর্তমানে চালু থাকা আর সব কলকারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, অগ্নিকা-ের মতো ব্যাপার ঘটলে তা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় আছে কি না, কারখানা থেকে বের হওয়ার পথ আছে কি না, কমপ্লায়েন্স নীতিমালায় যা যা বলা আছে সেসব কি আদতেই এরা মেনে চলে কি না সেই জরুরি প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে? মালিকদের কি আমরা এইসব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে বাধ্য করতে পেরেছি? উত্তরটা সহজেই অনুমেয়। কেউ দেবে না। তবু এমন সব জরুরি বিধিবিধানের অসম্পূর্ণতা নিয়েই কারখানাগুলো চলতে থাকবে? কারখানা বা শিল্পমালিকরা একদিকে শ্রমিকদের দাস গণ্য করার সামন্তবাদী আচরণ অব্যাহত রাখছে আরেকদিকে এই শিল্পমালিকরাই দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে দিন দিন আরও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে। এই মালিকদের কাছে শ্রমিকের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা নয় মুনাফাটাই বড়। একই কথা খাটে সরকারের কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, শ্রম-শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের বড়-ছোট সব কর্মকর্তার বেলাতেও। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন হলেও তারা উপরি পাওনার লোভে নিজেদের বিকিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। এখন সে সবের ফলভোগ করছে এই শ্রমিকরা। অপরাধ করে পার পাওয়া গেলে, শ্রমিকদের ঝুঁকির মধ্যে রেখে মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ অসৎ ব্যবসায়ীরা নেবেই। কারখানার কর্মপরিবেশের সঙ্গে কোটি শ্রমিকের নিরাপত্তার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিও জড়িত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও এসব কারখানা দেখভালের দায়িত্ব যাদের, তাদের কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেওয়া চলবে না।
লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি
