করোনার মধ্যেও ব্যাংকে আমানত বাড়লেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় (এনবিএফআই) এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চ ত্রৈমাসিকে ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৮ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে এনবিএফআইগুলোর আমানত কমেছে ৫৬৩ কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকে আমানত ছিল ১২ লাখ ৯০ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। মার্চে এসে এ খাতের আমানত বেড়ে হয় ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানত বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, গত ডিসেম্বরে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে মোট আমানত ছিল ৪৪ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। গত মার্চে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোয় গচ্ছিত আমানত কমে হয় ৪৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য ৩ মাসে এ খাতের আমানত ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কয়েকটি এনবিএফআইয়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এ খাতের আমানত তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরাও এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
তারা বছলেন, পিপলস লিজিং অবসায়নের পর এ খাতের গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় ২০১৯ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত কমে গেলেও ২০২০ সালে তা কিছুটা বেড়েছিল।
দেশে কার্যরত ৩০টি বেসরকারি লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানি রয়েছে। এর বাইরে ৪টি সরকারি এনবিএফআই রয়েছে, যেগুলো জনসাধারণের কাছ থেকে কোনো ধরনের আমানত সংগ্রহ করে না। এই ৩৪টি এনবিএফআই ছাড়াও ২টি অতফসিলি ব্যাংক এবং একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান এনবিএফআই হিসেবে তাদের আমানতের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়।
সব মিলিয়ে ৩৭টি এনবিএফআইয়ের কাছে গত মার্চ পর্যন্ত মোট আমানত ছিল ৪৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এই আমানতের ৯২ শতাংশই রাজধানী ঢাকার ভেতরের শাখাগুলোয় রয়েছে।
ব্যাংকের মতো সব ধরনের লেনদেনের লাইসেন্স না থাকলেও বেশ কিছু এনবিএফআই মেয়াদি আমানত নিতে পারে। এ ধরনের এনবিএফআইগুলো নন-ব্যাংক ডিপোজিটরি করপোরেশন হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৯ সালের ১০ জুলাই পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের অবসায়নের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার।
লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ ধরনের অনিয়মের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বেসরকারি এনবিএফআইগুলো থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করেন গ্রাহকরা। এ খাতের প্রতিষ্ঠানের আমানতের বড় একটি অংশের জোগানদাতা ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও এনবিএফআই থেকে তাদের আমানত তুলে নিতে শুরু করে।
এসব কারণে ২০১৯ সালে এনবিএফআইগুলোর ১ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা আমানত কমে যায়।
এদিকে গত মার্চে এনবিএফআইগুলোর বিতরণ করা লিজ বা ঋণ দেওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এনবিএফআইগুলোর বিতরণ করা ঋণ বা অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য ৩ মাসে এনবিএফআইগুলোর বিতরণ করা ঋণ বেড়েছে ৬১৪ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছে শিল্প খাতে, প্রায় ৩৭ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, ভোক্তাঋণ ১৪ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ১৪ শতাংশ, কৃষিতে প্রায় ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে এনবিএফআইগুলো।
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ব্যাংকের মতো এনবিএফআইগুলোকেও তারল্য সহায়তা দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে এনবিএফআই থেকে আমানত তুলে না নেয় সে জন্যও ব্যাংকগুলোকে দফায় দফায় নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমানত তুলে নেওয়ায় সৃষ্ট তারল্যসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিলও দাবি করেন বিএলএফসির সভাপতি ও আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোমিনুল ইসলাম।
