শত শত ভাতাবঞ্চিত টাকা ভুতুড়ে নাম্বারে!

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ০৩:০০ এএম

ঢাকার আশুলিয়ার চারাবাগের সত্তরোর্ধ্ব মালেকা বেগম।  একেতো বিধবা তার ওপর সন্তানরা দেয় না ভরণপোষণ। প্রতি তিন মাস পরপর সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (বয়স্ক ভাতা) থেকে পাওয়া তিন হাজার টাকা আর আশপাশের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত টুকটাক সহায়তায় তিন বেলা খাবার জোগাতে এমনিতেই হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু গত ৯ মাস জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতিতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের ভাতার টাকা বিতরণ কার্যক্রম শুরুর পর বিপাকে পড়েছেন মালেকা বেগম। ভাতার কার্ডে তার মোবাইল নম্বরের একটি ডিজিট ভুল করেছেন তথ্য সংগ্রহকারীরা। এখন মালেকার ভাতার টাকা যাচ্ছে অন্য এক ব্যক্তির এমএফএস নম্বরে। এই জটিলতা নিরসনের জন্য সাভার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে দিনের পর দিন ধর্ণা দিচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ মালেকা বেগম। কিন্তু জটিলতা আর কাটছে না।

জটিলতা নিরসনের আশায় গত বৃহস্পতিবার ফের সাভার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে এসেছিলেন মালেকা বেগম। কার্যালয়টির সামনে বয়স্কভাতার কার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মালেকা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। সন্তান থেকেও নেই। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, আর পারছি না। এখনই পড়ে যাব। নাম্বার ভুল হওয়ায় ৯ মাস ধরে বয়স্ক ভাতার টাকা পাচ্ছি না। দুই দিন আগেও দুবার ঘুরে গেছি, আজকে আবারও আসছি। আমার বইয়ের নাম্বার ঠিক আছে, কিন্তু অফিসের লোকজন নাম্বার ভুল করায় আমার টাকা দিচ্ছে না।’

মালেকা বেগমের সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল তখন পাশেই সমাজসেবা কার্যালয়ের বারান্দার ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন আরেক ভুক্তভোগী মনোরা বেগম। ঢাকার আমিনবাজারের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব এই নারীও নাম্বার ভুলের কারণে তার বয়স্কভাতার টাকা তুলতে পারছেন না। জটিলতা নিরসনের আশায় এর আগেও কয়েকবার সমাজসেবা কার্যালয়ে এসে ফেরত যান। মোবাইল নাম্বার না মেলায় ভাতার টাকা পাচ্ছেন না তিনি।

ভাতার কার্ডে মোবাইল নাম্বার ভুল ওঠার কারণে বেদে ভাতার টাকা তুলতে পারছেন না রহিমা বেগম। সাভারের কাঞ্চনপুরের বাসিন্দা এই নারী জটিলতা নিরসনের জন্য সমাজসেবা কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরছেন। চার বছর তিনি ঠিকমতো ভাতার টাকা পেলেও গত এক বছর ধরে ভাতা পাচ্ছেন না। ক্ষুব্ধ ও হতাশ রহিমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখান থেকে বলে ব্যাংকে যেতে, আর ব্যাংকে গেলে এখানে আসতে বলে। আমি এখন কোথায় যাব?’

ভাতার টাকা উত্তোলনে জটিলতা নিরসনে সাভার পৌরসভার কর্নপাড়া থেকে সমাজসেবা কার্যালয়ে এসেছিলেন ঝর্না আক্তার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমি মাত্র পনেরশ টাকা পাইছি। এখনো তিন হাজার টাকা পাচ্ছি না। ৮-৯ মাস ঘুরে পায়ের জুতা ক্ষয় করেও এখানকার কর্মকর্তাদের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমার টাকা এখন কীভাবে পাব?’

একই রকম অভিযোগ আরও শতাধিক নারী-পুরুষের। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন ভাতার টাকা উত্তোলনের জটিলতা নিরসনের জন্য উপকারভোগীরা সাভার সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভাতার টাকা তুলতে না পেরে এই করোনাকালে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। সমাজসেবা কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরেও ভাতার টাকা তুলতে পারছেন না উপকারভোগীরা। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও দূরদূরান্ত থেকে অতিরিক্ত টাকা ভাড়া দিয়ে এসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাক্সিক্ষত সেবা। উপকারভোগীদের অনেকেই ভাতার টাকার জন্য ঘুরছেন ছয় মাস থেকে এক বছর ধরে। এসব টাকা উপকারভোগীদের হিসাবে জমা না হয়ে ‘ভুতুড়ে’ (উপকারভোগীর নাম্বার ভুল তোলায় ভুল ব্যক্তির নাম্বারে) সব হিসাবে জমা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণেই দুর্ভোগ বেড়েছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সাভার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী শতাধিক নারী-পুরুষ ভাতা উত্তোলনের বই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা একবার কর্মকর্তার কক্ষে আবার তার অধীনস্থ কর্মচারীর কক্ষে তো আবার আরেক কক্ষে ছুটছেন। এভাবে কার্যালয়টির তিনটি কক্ষে ছোটাছুটি করছিলেন ভুক্তভোগীরা। তিনটি কক্ষের ভেতরেই ছিল লোকজনের ভিড়। ছিল না স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেকেই কার্যালয়ের বারান্দায় ও আশপাশে অবস্থান করছিলেন। গণমাধ্যমকর্মী এটা বুঝতে পেরে এই প্রতিবেদককে ঘিরে ধরেন কয়েক ভুক্তভোগী। তারা নিজেদের দুর্ভোগের গল্প একনাগাড়ে স্বেচ্ছায় বলতে থাকেন।

তাদের কথা বলা শেষ হলে সাভারের বনগাঁও এলাকা থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংরক্ষিত নারী আসনের একজন জনপ্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এলাকার তিন শতাধিক লোকের মোবাইল নাম্বার ভুল করেছে কর্র্তৃপক্ষ। যে কারণে প্রায়ই তারা এখানে এসে ঘুরে যায়, কিন্তু টাকা আর পায় না। তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য আমি নিজেও এখানে আসি সহযোগিতার জন্য। আমি মনে করি সমাজসেবা কর্মকর্তার গাফিলতির কারণেই অনেকের টাকা ভুল নাম্বারে চলে যাচ্ছে। যেহেতু তাদের ভুলের কারণে টাকা অন্যত্র চলে যাচ্ছে তাই এই দায় তাদেরকেই নিতে হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. শিবলী জাম্মান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দায় আমাদের এবং সমাধানও আমরা করব। এই মুহূর্তে যাদের টাকা নাম্বার ভুলের কারণে অন্যত্র চলে গেছে তাদের সমাজসেবা কার্যালয় থেকে একটি আবেদন ফরম নিতে হবে। সেখানে সঠিক মোবাইল নাম্বার এবং যাবতীয় তথ্য পূরণ করে জমা দিলেই আমরা সংশোধন করে দেব। তা না হলে আবারও টাকা অন্যত্র চলে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার উপকারভোগী রয়েছে। বর্তমানে অনলাইন পদ্ধতি চালু হওয়ায় এবং সময় স্বল্পতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের দিয়ে ডাটা এন্ট্রির কাজ করা হয়েছে। সে সময় কিছু উপকারভোগীর নাম্বার ভুল হওয়ায় টাকা পেতে সমস্যা হচ্ছে। তবে কর্র্তৃপক্ষ আমাদের কাছে ভুল নাম্বারে টাকা চলে যাওয়াদের তালিকা চেয়েছে। যেহেতু এটি একটি নতুন প্রোগ্রাম। হয়তো কেন্দ্রীয়ভাবে বিষয়টি মনিটরিং করে দেখবে এবং সমন্বয় করে সরকার কিছু টাকা ভর্তুকি দিতে পারে।’

সাভার উপজেলায় ইউনিয়নগুলোর চেয়ে পৌরসভায় ভুলের পরিমাণ বেশি জানিয়ে শিবলী জাম্মান বলেন, ‘এখানে উপকারভোগী না পাওয়ায় আমি নিজে ১৫ দিন মাইকিং করিয়েছি। এরপরও উপযুক্ত ভাতাভোগী না থাকায় অন্য ইউনিয়ন থেকে এক হাজার ভাতাভোগী এনে সমন্বয় করা হয়েছে।’

মোবাইল নাম্বার ভুলের কারণে ভাতাভোগীদের টাকা উত্তোলনে দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার পৌরসভার মেয়র হাজী আবদুল গণি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাম্বারের ভুলের কারণে অনেকেই এমন দুর্ভোগে পড়েছেন বলে শুনেছি। তবে প্রতিকারের জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে আসেনি। আর ভাতাভোগীদের তালিকা তৈরির কাজ করেন কাউন্সিলররা। সবমিলিয়ে যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তারা আরও সতর্ক থাকলে এত মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত