আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস আজ

বিলম্বিত বিচারে হতাশ দেশের বিচারপ্রার্থীরা

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ০৩:২৫ এএম

আজ ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক ‘ন্যায়বিচার’ দিবস। ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এ আদালতের কর্মকা-ের স্বীকৃতি দিতে ও অপরাধ যেখানেই হোক, মানুষ যেন বিচারপ্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারে, সে ধারণা বদ্ধমূল করতে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার এ দিনটি ন্যায়বিচার দিবস হিসেবে পালিত হয়। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অক্ষমতা কিংবা অনিচ্ছার কারণে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধগুলো যেন বিচারহীনতায় না পড়ে মূলত এ ধারণা থেকেই এ দিবসটির উদ্ভব ঘটে। আইন বিশেষজ্ঞরা ন্যায়বিচার বলতে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ প্রতিটি নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত, প্রকাশ্য ও পক্ষপাতহীন বিচার পাওয়া, সংশ্লিষ্ট আইনের ন্যায়বিচার প্রদানের সক্ষমতা ও বিচারকের দক্ষতা ও যোগ্যতার কথা বলেন।

এদিকে এমন একটি সময়ে দিবসটি এলো যখন করোনাভাইরাসজনিত মহামারী পরিস্থিতিতে দেশের বিচারাঙ্গনে একপ্রকার অচলাবস্থা বিরাজ করছে। সঙ্গে দীর্ঘদিনের মামলাজট সমস্যা তো আছেই। সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী বিচারপ্রার্থীকে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ বিঘিœত হয়। দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলো দীর্ঘদিন ধরেই  মামলার ভারে ন্যুব্জ। বিপরীতে এ জট থেকে নিষ্কৃতি পেতে কার্যকর কোনো উদ্যোগের কথা শোনা যায়নি গত কয়েক দশকেও। বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার ফলে আর্থিক, মানসিকসহ নানাভাবে এর খেসারত দিচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। উপরন্তু করোনাভাইরাজনিত মহামারীর কারণে দেড় বছরে বিচারকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। আইন করে ভার্চুয়াল আদালত চালু হলেও এর সুফল এখনো দেশের সব প্রান্তে পৌঁছেনি। ফলে বিলম্বিত বিচারে বিচারপ্রার্থীর হতাশা ও ভোগান্তিও কমেনি।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, মামলাজটের কারণে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়। দিনের পর দিন বিচার চলতেই থাকবে, বিচারপ্রার্থী বিচারের জন্য ঘুরতে থাকে, এ অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে এখন আদালতের বিচার কার্যক্রমে গতি কমেছে। তবে, উচ্চ আদালতে ভার্চুয়ালি মামলা পরিচালনায় গতি এলেও অধস্তন আদালতে ভার্চুয়ালি বিচারকাজ সীমিত পরিসরে হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়ানো দরকার। তা না হলে বিচারপ্রার্থী মানুষদের বড় একটা অংশ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। আমার মনে হয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচারকে ত্বরান্বিত করা দরকার। যাতে জনগণ বুঝতে পারে যে বিচার হচ্ছে এবং আইন ও আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।’ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘যে হারে মামলা বাড়ছে এবং জট হচ্ছে, তাতে এ থেকে উত্তরণের একটিমাত্র উপায় হলো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দেওয়া। বিশেষ করে দেওয়ানি ক্ষেত্রে সালিস ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে পক্ষগণের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হলে কোনো পক্ষ আদালতমুখী হবে না। এতে করে মামলাজটও সহনীয় পর্যায়ে আসবে।’  

আইন ও বিচার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০১১ সালের শেষের দিকে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন অনিষ্পন্ন ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৩২ হাজার। আর এখন উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে ৩৮ লাখের  মতো মামলা বিচারাধীন। মাত্র এক দশকে ১৭ লাখের মতো মামলা বেড়েছে।  অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৩১ লাখের বেশি মামলার মধ্যে ১৪ লাখের বেশি দেওয়ানি ও প্রায় ২০ লাখ ফৌজদারি মামলা। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা পাঁচ লাখের বেশি। যার বেশিরভাগ মামলাই ফৌজদারি। করোনাকালে বিচার নিষ্পত্তি খুব বেশি না হলেও মামলা বাড়ার এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে মামলা বাড়লেও দীর্ঘদিনেও আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কার হয়নি। বিচারপ্রার্থীকে দ্রুত সময়ে ন্যায়বিচার দিতে লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ কিংবা পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। মামলাজট কমাতে আপসযোগ্য মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, মধ্যস্থতা, সালিস ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পক্ষগণের বিরোধ নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থাও উল্লেখ করার মতো নয়। আর মহামারীর মতো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ন্যায়বিচার মানেই বিচারপ্রার্থীর দ্রুত ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিচার পাওয়া। এটি তখনই হয় যখন দেশে স্বাভাবিক অবস্থা থাকে এবং আইন আদালত চলতে পারে। কিন্তু করোনা মহামারীর মতো পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই এখন স্বাভাবিক নেই। স্বাভাবিকভাবে বিচারের প্রত্যাশা করলেও সেটি  বিঘিœত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ধরে দেশে মামলাজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণে কার্যকর কোনো দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। মহামারীর কারণে ভবিষ্যতে এ জট আরও ভয়াভহ আকার ধারণ করবে। এমনিতেই জনসংখ্যার তুলনায় বিচারক, আদালতের অবকাঠামো ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা কম রয়েছে। ভার্চুয়াল আদালত চালু হলেও সেটি হচ্ছে সীমিত আকারে। এখন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আইন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি দক্ষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে যারা বিভিন্ন পরামর্শ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করবেন।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী বাংলাদেশ ল রিপোর্টার্সের (বিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ন্যায়বিচার মানে আইন সবার প্রতি সমভাবে প্রযোজ্য হবে এবং বিচার স্বচ্ছ ও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পৃথিবীতে এখন ঝড়ঝঞ্ঝা ও মহামারী চলছে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও হত্যা ও অন্যান্য অপরাধ বাড়ছে। এর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বিচার বিভাগ ও প্রসিকিউশন টিম হিমশিম খাচ্ছে। কারণ মামলাজট একটা বড় সমস্যা। অপরাধ হচ্ছে কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না। আর তদন্ত শেষ হলেও বিচার শেষ হচ্ছে না। রায় হলেও আপিলে সময় লাগছে।’ তিনি বলেন, ‘করোনায় বিচারে দীর্ঘসূত্রতা আরও বেড়েছে। দেড় বছর ধরে আদালত নিয়মিতভাবে চলতে পারছে না। অন্যদিকে বিচারক সংকট, দক্ষ প্রসিকিউশন টিমের অভাব রয়েছে। ভার্চুয়াল আদালতে কিছু মামলা চললেও সেটি যথেষ্ট নয়। বিচারিক আদালত সাক্ষ্য নিতে পারছে না। সব মিলিয়ে বিচারকাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। এটা বাস্তবতা। এখন এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, সেটি নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত