সরকারের দায়িত্ব, জনগণের কর্তব্য

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০৪ এএম

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে লকডাউন শিথিল করার বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। এর জন্য দেশে ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন। আবার লকডাউন শিথিল করার পক্ষেও অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন। লকডাউন শিথিলের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, লকডাউন শিথিল না করলে কৃষক ও খামারিরা গরু বেচবে কী করে? লোকে কোরবানির ঈদ করবে কী করে? যেহেতু এটা করতেই হবে, ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ব্যাপার আছে, সেহেতু লকডাউন শিথিল না করে উপায় নেই। কারও কারও মতে, সরকারের সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা আছে। সরকার চাইলে ঈদ বন্ধ করতে পারবে না। আর মানুষের রুটি-রুজিরও ব্যাপার আছে। সরকার হয়তো কিছু লোককে বসিয়ে খাওয়াতে পারবে। কিন্তু কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের সবাইকে পারবে না। কাজেই আপাতত লকডাউন শিথিল না করে সরকারের সামনে আর বিকল্প কী?

একথা ঠিক যে, ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা কমাতে লকডাউন জরুরি ছিল। যদিও আমাদের দেশে লকডাউন কার্যকর করা অনেক কঠিন কাজ। বিশেষ করে ঈদে মানুষকে ঘরে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। গত মে মাসে ঈদুল ফিতরের সময়ে গণপরিবহন বন্ধ করে, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ জারি করে মানুষকে ঘরে রাখতে সরকার ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। মানুষ বাড়িতে ঠিকই গেছে। মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে তেমন সুফল কখনোই ফলেনি। কারণ বেশিরভাগ মানুষ এসব বিধিনিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। আর ঈদ আমাদের দেশের মানুষের কাছে এক অন্য রকম আবেগ ও চাঞ্চল্যের নাম। ঈদ এলে মানুষ গ্রামে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায়। কিছু মানুষ জীবন দিয়ে হলেও সে সময় ঘরে ফিরতে চায়। নাড়ির টান, শেকড়ে ফেরা, হোম সিকনেস ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের দেশের মানুষের কাছে অনেক প্রিয়। নিজের এলাকায়, নিজের বাড়িতে ফিরতে, সেখানে নিজের মতো করে থাকতে তাই তো সবাইকে মরিয়া চেষ্টা চালাতে দেখা যায়। রুটি-রুজির প্রয়োজনে বাঙালি ঘরের বাইরে যায় বটে, কিন্তু ঘরের জন্য প্রাণ সারাক্ষণ আনচান করে। একটু ছুটি পেলেই ছুটে যায় বাড়িতে। বাড়িতে গিয়ে আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে ঈদ করতেই হবে। তাই তো সব ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে গত ঈদুল ফিতরে নিজ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে মানুষ মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। বাস, রেল বা লঞ্চের মতো গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও, বিপুল সংখ্যক মানুষ কয়েক দিনের প্রচেষ্টায় কঠিন বিড়ম্বনা সয়ে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। পরিবার-পরিজন, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ট্রাকে, অটোতে, মোটরসাইকেলে, মুরগির গাড়িতে, ঝুলে, পাইপ বেয়ে লঞ্চে উঠে, এমনকি হেঁটেও বাড়িতে পৌঁছেছে। একই কায়দায় আবার ফিরেও এসেছে।

সেই সময় বাড়িমুখী মানুষের ঢল দেখে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনও কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছে। প্রথমে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখলেও পরে তা খুলে দেওয়া হয়েছে। নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করার প্রবল আকাক্সক্ষার কাছে প্রতিকূলতা, দুর্ভোগ, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবকিছু মার খেয়েছে। তখনো এক শ্রেণির মানুষ সরকারের সমালোচনা করেছিল। সরকার কেন আরও কঠোর হলো না অথবা ঈদে মানুষ বাড়ি যাবেই, এমন বাস্তবতায় গণপরিবহন খুলে দিয়ে মানুষের চলাচল কেন নিরাপদ ও স্বস্তির করা হলো না এমন মন্তব্য শোনা গেছে। আবার এবার ঈদে যখন সরকার লকডাউন শিথিল করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহনসহ সব কিছু খুলে দিয়েছে, তখনো সরকারের সমালোচনা করা হচ্ছে। তবে সব দোষ সরকারের ওপর চাপানোটা সম্ভবত যুক্তিসংগত নয়। ফরাসি দার্শনিক জোসেফ দ্য মেস্ত্র একদা একটি মূল্যবান কথা বলেছিলেন জনগণ তাদের যোগ্য সরকারই পেয়ে থাকে। আমরা নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম নই! বাংলাদেশের নাগরিকদের এক বড় অংশ এখনো মনে করে, করোনা হচ্ছে বড়লোকের রোগ, গরিবের করোনা হয় না। বেশিরভাগ মানুষ মাস্ক পরে না। পড়লেও মাস্ক পরার নিয়ম মানে না।

 হ্যাঁ, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা ‘সামাজিক দূরত্ব’ বা ‘শারীরিক দূরত্ব’ কথাটা কেবল মুখে বলে আর কানে শুনেই গেলাম, কোথাও কেউ মানলাম না অথবা কাউকে মানতে বা মানাতে দেখলাম না! অবশ্য এ বিষয়ে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীই সেরা উদাহরণ। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কাকে বলে তা ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন। তিনি তার সহকর্মী জিনা কোলাড্যাঙ্গেকে স্বাস্থ্য দপ্তরের ভেতর চুমু খেয়ে সামাজিক দূরত্বের নীতিমালা ভঙ্গ করার পর পদত্যাগ করেছেন!

এ কথা ঠিক যে, করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ যে মারণরূপ ধারণ করেছে, তাতে বিধিনিষেধ চালু করা এবং তা মেনে চলা ছাড়া উপায় নেই। সরকার ও জনগণ উভয়ের সদিচ্ছা থাকলে অনেকাংশে এই ধ্বংসলীলা এড়ানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা, যুদ্ধকালীন তৎপরতার মতো করে গণটিকাকরণের কাজ এগিয়ে নেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে সরকার ও জনগণ কারও মধ্যেই তেমন সিরিয়াসনেস দেখা যাচ্ছে না। এতে করে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল এ তো মহামারীর প্রত্যক্ষ বিষফল। এর চেয়েও বড় বিপদ আমাদের সামনে। সংখ্যাতত্ত্বের কোনো হিসাবেই বোধ হয় লেখা থাকবে না, কত জন রোজগার হারালেন; পাওনাদারের লাঞ্ছনা কত জনের কপালে জুটল, আর কত ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো। শুধু কি দু’বেলা কোনো মতে খেতে পেলেই বেঁচে থাকা যায়? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, আনন্দানুষ্ঠান, ন্যায়বিচার এসবও তো প্রয়োজন। বিচারব্যবস্থার কথাই ধরা যাক! এমনিতে এ দেশের বিচারব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রতা রোগে আক্রান্ত। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো হাজির মহামারী। করোনার কারণে মামলাজট আরও বাড়ছে। বিচারপ্রার্থী মানুষের হতাশাও কেবল বাড়ছে।

গণপরিবহন বন্ধ রেখে করোনা কিছুটা রোখা যায় বটে, কিন্তু এর বিনিময়ে সাধারণ মানুষের কত হতাশা, আর কত চোখের জল ঝরে, সেই পরিসংখ্যান কিন্তু কেউ রাখে না। লকডাউনের সঙ্গে অনেকের জীবনেই নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। গত দেড় বছরে বিভিন্ন সময়ের লকডাউনে গণপরিবহন-সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, শ্রমিক, ছোটখাটো দোকানদার, রাজমিস্ত্রি, পরিচারিকা, হকার, ফেরিওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের জীবনে নেমে এসেছে অত্যন্ত করুণ পরিণতি। পেশা পরিবর্তন করেও পেটে টান পড়ছে। পরিবার নিয়ে উপোস করছে, চুরি করছে, আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এর শেষ কোথায়? আসলে লকডাউন কোনো সমাধান নয়। মহামারী মোকাবিলার লকডাউনের বাইরের উপায়ের দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে বেশি। সরকারকে এ ক্ষেত্রে গণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবতার নিরিখে কর্মসূচি ঠিক করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের ধৈর্য আছে, যদি এক বেলাও খেতে না পায়, তবু কেউ মুখ খুলবে না। প্রতিটি সংসারে আজকাল খরচ বেড়েছে, সেই তুলনায় অর্থ উপার্জন নেই। এর মধ্যে লকডাউন মেনে চলা অনেকের জন্যই অসম্ভব। এই পরিস্থিতি মানা যেত, যদি ইউরোপ এবং আমেরিকায় সরকার যেমন সুযোগ-সুবিধে দেয় নাগরিকদের, তেমন আমরা পেতাম সরকারের থেকে। তার কতটুকু মিলছে?

যাদের টাকা আছে, তারা বলবেন আগে মানুষের জীবন, তাই লকডাউন করে রাখা হোক। অবশ্যই আগে জীবন। বেঁচে থাকার অধিকার সব মানুষেরই আছে। তবে যাদের টাকা আছে, লকডাউন চললেও তাদের সংসার চলে যাবে। কিন্তু যাদের উপার্জন বন্ধ, তারাও তো বাঁচতে চান। বাঁচতে গেলে টাকা-পয়সা খরচ করে কিনে খেতে হবে, এটা কেন বুঝতে পারছেন না লকডাউনের সমর্থকরা? সেই খাবার কোথায় পাবেন তারা, রোজগার না থাকলে? জরুরিভিত্তিতে টিকাকরণের ক্ষেত্রে সরকারের দায় আছে। এ মুহূর্তে সরকারের উচিত সেই কাজটি ভালোভাবে এবং গুরুত্বের সঙ্গে করা। আর জনগণের উচিত যথাযথ নিয়মে মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। কেবল সরকারের সমালোচনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, নিজেদের কর্তব্যটুকুও পালন করতে হয়।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত