পেগাসাস কেলেঙ্কারি

৪৫ দেশের ৫০ হাজার ভিআইপির ফোনে আড়ি!

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ০২:০৪ এএম

ইসরায়েলের একটি কোম্পানির তৈরি পেগাসাস নামের স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিশ্বের দেশে দেশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে আড়ি পাতার ঘটনা ফাঁস হয়েছে। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, মন্ত্রী, আমলা এমনকি কোনো কোনো দেশের ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্যদের ফোনেও চলেছে এই নজরদারি। ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য ওয়্যার, গার্ডিয়ানসহ ১৭টি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ফাঁস হওয়া তালিকায় বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৫টি দেশের মন্ত্রী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নম্বরও রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এ তালিকায় কাদের নাম আছে তা এখনো জানা যায়নি। 

গত রবিবার গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক সংবাদ সংস্থা ফরবিডেন স্টোরিজ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রথম ফাঁস হওয়া এই তালিকা হাতে পায়। পরে তা অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে শেয়ার করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের তৈরি করা স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে এই আড়ি পাতার ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, এমনকি কোনো কোনো দেশের ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্যদের ওপরও আড়ি পাতা হয়েছে। মূলত কর্র্তৃত্ববাদী দেশগুলোর সরকার আড়ি পাতার কাজে এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেছে।

পেগাসাস হলো একটি ম্যালওয়্যার। এটি ব্যবহার করে আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সব মেসেজ, ফটো, ইমেইল, কল রেকর্ড বের করা যায়। এই ম্যালওয়্যার ফোন ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতেই মাইক্রোফোন চালু করে দেয়।

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসেও খবরের শিরোনামে আসে পেগাসাস। সেখানে বলা হয়, সারা পৃথিবীর প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল। সেই তালিকায় ছিলেন কূটনীতিক, নেতা, সাংবাদিক ও সরকারি আধিকারিকরা। বিশেষ করে তাদের প্রায় সবাই ছিলেন ফেইসবুকের মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী। এবার অনুসন্ধানকারীদের হাতে ৫০ হাজারেরও বেশি ফোন নম্বর এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৬ সাল থেকে এনএসওর গ্রাহকরা এসব নম্বরে আড়ি পেতেছে।

গার্ডিয়ান বলছে, যেসব ফোন নম্বর পাওয়া গেছে তার সবগুলোতেই পেগাসাসের মাধ্যমে আড়ি পাতা হয়েছে বা তা করার চেষ্টা হয়েছে সে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে অনুসন্ধানকারীদের ধারণা, এনএসওর গ্রাহক (কর্তৃত্ববাদী সরকার) বিভিন্ন দেশের সরকার নজরদারির জন্য এসব ফোন নম্বর চিহ্নিত করেছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁস হওয়া তালিকায় শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, অ্যাকাডেমিক, এনজিও কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরাও রয়েছেন। তালিকায় থাকা নম্বরের অল্প কিছু মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি ফোনেই পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হয়েছে।

রবিবার সকালেই এই তালিকা ফাঁস হতে শুরু করে। প্রথমে তালিকায় ১৮০ জনের বেশি সাংবাদিকের নম্বর থাকার কথা জানা যায়। যাদের মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ফ্রান্স ২৪, ইকোনমিস্ট, এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদক, সম্পাদক ও নির্বাহীরাও আছেন। পরে ৫০ হাজারেরও বেশি ফোন নম্বরে আড়ি পাতার তথ্য জানা যায়।  

এ তালিকায় আছে ভারতের অন্তত ৩০০ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম। দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে, নেটওয়ার্ক-১৮, দ্য হিন্দু এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বেশ কিছু বড় সাংবাদমাধ্যমের ৪০ জনেরও বেশি সাংবাদিক, তিনজন বিরোধী নেতা, কেন্দ্রীয় দুই মন্ত্রী, দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বর্তমান ও সাবেক প্রধান এবং ব্যবসায়ীসহ অন্তত ৩০০ জনের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল পেগাসাস অ্যাপের মাধ্যমে। 

যদিও নরেন্দ্র মোদি সরকার হ্যাকিংয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। পাল্টা দাবি করেছে, ফোনে আড়ি পাতা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার কোনো ভিত্তি নেই। সরকারের তরফে বলা হয়েছে, ভারত একটি মজবুত গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে সব নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়। এই প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে ২০১৯-এ পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন বিল আনা হয়েছে। ২০২১-এ আনা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি আইন, যাতে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত