দর্শক ধরে রাখার কী উপায়

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ১০:০৮ পিএম

ঈদ একদিন। ছুটি তিন থেকে পাঁচ দিন। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে ঈদের আয়োজন এখন ষষ্ঠ এমনকি সপ্তম দিন পর্যন্ত গড়ায়। ভবিষ্যতে যে দশ দিন ধরে অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে না, তা বলা যায় না।

আমাদের জীবনে উৎসবের ঘাটতি আছে হয়তো তাই ঈদ উৎসবকে টেনেটুনে দীর্ঘায়িত করার বাণিজ্যিক প্রয়াস নেওয়া হয়। বিশেষ করে, বিশেষ দিনে মিডিয়াগুলো থাকে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে সয়লাব হয়ে। সাবেক ঐতিহ্য অনুযায়ী আনন্দ মেলার নামে যা হয়, তার মান নিয়ে সবার মধ্যেই হতাশা। সংগীতানুষ্ঠান বা সেলিব্রিটি টক শো বাদ দিয়ে অন্য কোনো অনুষ্ঠান করার আইডিয়ার অভাবেই হয়তো বেশি প্রাধান্য পায় টিভি নাটক। আমাদের মিডিয়াগুলোতে সারা বছর যেসব নাটক প্রচারিত হয়, তার মধ্যে বেশি থাকে সিরিয়াল। যার বেশির ভাগ মানসম্মত না হওয়ায় দর্শক বিশেষ দিনের নাটক বা ঈদের নাটকগুলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। একই সঙ্গে টিভি চ্যানেলগুলো মুখিয়ে থাকে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায়। যার ফলাফল মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন। আর অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে বিরক্ত হয়ে পড়েন দর্শকরা। ঈদ মৌসুমে বা বিশেষ দিবসের টেলিভিশন নাটক অনুষ্ঠানে এর মাত্রা বহু গুণ ছাড়িয়ে যায়।

এবার ঈদে একটি নাটক দেখব বলে ঠিক করেছিলাম। নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে বসলেও বিজ্ঞাপনের দাপটে শেষ পর্যন্ত নাটক দেখতে পারব বলে মনে হলো না। ঈদের দ্বিতীয় দিন দুটো চ্যানেল পাল্টে পাল্টে একই সময়ে দুটো নাটক দেখার চেষ্টা করেছিলাম। একটা ক্লাসিক ধাঁচের মনে হলেও অন্যটা ঈশপের গল্পের মতো। আরও কয়েকটা নাটক আধাআধি দেখা হলো। এ ক্ষেত্রে যা লক্ষণীয় তা হলো, প্রতিটি নাটকে চরিত্র সংখ্যা ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্ভবত বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে এমনটা হয়ে থাকে। কিন্তু তিনটা বা চারটা চরিত্র নিয়ে নাটক নির্মাণ করতে গেলে স্ক্রিপ্টের মান, নির্মাণশৈলী এবং যে ধরনের অভিনয় দক্ষতার প্রয়োজন হয় তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়।

মাস মিডিয়ায় সবার রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী নাটক নির্মিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সব দর্শক তো আর সমরসেট মম বা জ্যাঁ জেনের নাটকের রুচি নিয়ে নাটক দেখতে বসেন না। তবে সাধারণ দৃষ্টিতে নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের মান আপ টু দ্য মার্ক হওয়া দরকার।

টিভি নাটকগুলোতে অভিনয় প্রসঙ্গে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ‘অভিনয়শিল্পী হওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তা এ প্রজন্মের কারও মধ্যেই নেই। তাদের অভিনয় প্রস্তুতি কী তা নিয়ে আমি রীতিমতো সন্দিহান। এখন যারা নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে নিজেদের দাবি করছেন, পর্দা জুড়ে থাকছেন, এদের মধ্যে কাজটা প্রাধান্য পায় না। সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় কীভাবে তারা মুখ দেখিয়ে তারকা হবেন সেটা। অভিনয়গুণে দর্শককে মুগ্ধ করার প্রবণতা এখনকার বেশির ভাগ নতুন এর মধ্যে নেই।’ এটা একজন কো-আর্টিস্টের বিবৃতি। তাহলে দর্শকের কী মনোভাব তা বলাই বাহুল্য। নির্মাণশৈলীর কারণে একটা সাধারণ মানের স্ক্রিপ্টও অসাধারণ নাটক হয়ে উঠতে পারে, যা আমরা বিশেষ দিবসে বিজ্ঞাপন সংস্থা নির্মিত নাটকগুলোতে দেখি। নাটকে বাজেট একটা বড় ভূমিকা রাখে, বোঝাই যায়। প্রতি বছর ঈদে কয়েকশ নাটক বানানো হয়। এর মধ্য থেকে আট, দশটা নাটক ভালো হচ্ছে। তবে প্রাইম টাইমে প্রচারিত না হওয়ায় এই নাটকগুলো হয়তো দর্শকের চোখে পড়ছে না বা পড়লেও বিজ্ঞাপনের কারণে দর্শক দেখা শেষ করতে পারছেন না।

আবার ভালো ভালো নাটক প্রচার হলেও হাতেগোনা দু-একজন নির্মাতা ব্যতিরেকে পত্রিকা বা অন্য মাধ্যমেও তেমন গুরুত্ব পায় না।

যত আস্ফালন চলতে থাকে গুটিকয় নাটক নিয়ে। অনেক ভালো নাটক চ্যানেলে বিক্রি করা যায় না বলে শোনা যায়। বিক্রি হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিক দাম পাওয়া যায় না। ফলে নির্মাতারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। চ্যানেলগুলো কিছু নির্দিষ্ট প্রোডাকশন হাউজের নাটক নিতে আগ্রহী। এর পেছনেও আছে এক ধরনের রাজনীতি। ইদানীং নাটক এজেন্সির হাতে চলে গেছে। দেখা যাচ্ছে, আগে যে নাটক ৫/৬ লাখ টাকা বাজেটে হতো, সেই নাটক এখন বানাতে হচ্ছে দুই/আড়াই লাখ টাকায়। ফলে নাটকের শিল্পমান বজায় থাকছে না। অন্যদিকে এ দেশের বেশির ভাগ নাটকের শব্দ সংযোজন পরিষ্কার নয়। প্রায় ক্ষেত্রে ডায়ালগ বোঝা যায় না।

বাংলাদেশের নাটকের দর্শক এত দিন ছুটেছেন বিদেশি সিরিয়ালের পেছনে। এখন দর্শকের সামনে আছে আরও উন্মুক্ত পৃথিবী। হাত বাড়ালেই ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। বিনোদন মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনের জন্য এটা আসলেই একটা অশনিসংকেত। আগামী দশ বছর পর টেলিভিশন কনসেপ্টটাই হয়তো থাকবে না। তাই যারা টেলিভিশন মিডিয়া নিয়ে কাজ করেন, তাদের আরও সচেতন হতে হবে। যাদের টার্গেট করে ব্যবসা, সেই দর্শকদের যদি ধরে রাখা না যায় তাহলে আর বিজ্ঞাপন প্রচার করে কি লাভ! চ্যানেল এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের এ বিষয়ে ভেবে দেখতে হবে। বিষয়টি এ দেশের বিনোদন ঐতিহ্যের জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত