বরিশাল মেডিকেল কলেজে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাকালীন ১৯৭৪ সালে দুর্বৃত্তদের হামলায় দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান শারফুদ্দিন আহমেদ। কিন্তু দমে যাননি। বরিশাল ল কলেজ থেকে আইনে স্নাতক পাস করে বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে বরিশাল আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ষাটোর্ধ্ব শারফুদ্দিন আহমেদ ৩৯ বছর ধরে আইনি পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ বছরের বেশি সময় সরকারি আইন কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন। যোগ্যতা আর মেধার জোরে ১৯৯০ সাল থেকে বরিশাল মহানগর আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শারফুদ্দিন আহমেদ একাই নন। তার মতো প্রায় একই ধরনের জীবন সংগ্রামের গল্প আরও অনেক দৃষ্টিশক্তিহীন আইনজীবীর। বিপদসংকুল জীবনযাত্রা ছিল তাদের। পদে পদে বাধা। কিন্তু মনে দৃঢ় সংকল্প। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল না। স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হবেন। কালো গাউন পরে আদালতে বিচারপ্রার্থীদের জন্য আইনি লড়াইয়ে নামবেন। কঠিন এ পথ পাড়ি দিয়ে দৃঢ়তা, অধ্যবসায় আর মনের জোরে এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত অন্তত ৩০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও দায়রা আদালতে আইনি পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। এছাড়া আরও ১০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন আইন অঙ্গনে। তাদের বেশিরভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইন পেশার সনদ পরীক্ষায় (এনরোলমেন্ট) উত্তীর্ণ হয়েছেন। পড়াশোনা, পরীক্ষা দিয়েছেন ব্রেইল ও শ্রুতিলিখন পদ্ধতিতে। এর বাইরে অনেকেই আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন কলেজে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এমন অগ্রসরতাকে অভূতপূর্ব বলছেন আইন অঙ্গন সংশ্লিষ্টরা।
দৃষ্টিশক্তিহীন আইনজীবী শারফুদ্দিন আহমেদ তার টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা তুলে ধরতে গিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু অধ্যবসায় ও মনের জোরে এ পর্যন্ত এসেছি। আমাদের মতো হাজারো শারীরিক প্রতিবন্ধী আছেন। সুযোগ পেলে তারাও অনেকদূর এগিয়ে যাবেন। আমাদের দাবি সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া হোক।’
সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন বারে (জেলা আইনজীবী সমিতি) নিয়মিত প্র্যাকটিসরত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবীরা হলেন খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বার), শারফুদ্দিন আহমেদ (বরিশাল বার), মোশাররফ হোসেন মজুমদার (সুপ্রিম কোর্ট ও ঢাকা বার), মো. সাখাওয়াত হোসেন (বগুড়া বার), মো. মোসলেহ উদ্দিন (ঢাকা বার), মো. মাহবুবুর রহমান (সুপ্রিম কোর্ট), দীলিপ কুমার ঘোষ (ঢাকা বার), আসাদুজ্জামান (সুপ্রিম কোর্ট), ইমরুল হোসেন মোল্লা (ঢাকা বার), মো. বেলাল হোসেন (ঢাকা বার), মো. জাহাঙ্গীর আলম (নোয়াখালী বার), মো. সুলতান (কুমিল্লা বার), মো. আমীর হোসেন (শরীয়তপুর বার), মো. আল-আমিন (গাজীপুর বার), মো. রাজ্জাক রাফেল (সুপ্রিম কোর্ট), সুবীর কুমার ঘটক (ঢাকা বার), মো. শামসুদ্দিন (সুপ্রিম কোর্ট), নাঈম আহম্মেদ (ঢাকা বার), সিএম ইদ্রিস আলী (ঢাকা বার), মো. জিয়াউল হাসান (ঢাকা বার), জাফর আহমেদ (বরিশাল বার), সাবির আহমেদ (ঢাকা বার), স্বপন চৌকিদার (ঢাকা বার), কামাল হোসেন (ঢাকা বার), মো. জাহিদুল ইসলাম (ঢাকা বার), জহিরুল ইসলাম (ঢাকা বার), জাহিদুর ইসলাম (ঢাকা বার) এবং মো. মুনসুরুল আলম (চট্টগ্রাম বার)। আইনে ডিগ্রি নেওয়া আরও অন্তত ১০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর নাম পাওয়া গেছে যারা বার কাউন্সিলের সনদের জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন কিংবা দিচ্ছেন। আইনি পেশায় রয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তিন নারী। তাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহান চট্টগ্রাম বারে প্র্যাকটিস করেন। আর আইন শিক্ষানবিশ সীমা ইকবাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে এখন ইংল্যান্ডের লন্ডনের ইনল্যান্ড থেকে বার অ্যাট ল করছেন। এছাড়া আইনে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন রেজমিন ইমরোজ তানিশা।
দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইন শিক্ষার্থী ও আইনজীবী মো. খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী (৭৪)। গত ৪৩ বছর ধরে আইন পেশায় আছেন তিনি। শ্রুতিলিখন পদ্ধতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম ল কলেজ থেকে ১৯৭৭ সালে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বার কাউন্সিলের সনদ পান ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে। ২০০১ সালে হাইকোর্টে প্র্যাকটিসের অনুমতি পান। ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ১০ বছর চট্টগ্রাম বারে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হিসেবে সরকারি আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দুঃখ হলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এতদূর এলাম। একজন খেলোয়াড় যখন ভালো করে, একজন লেখক যখন ভালো লেখে তখন তাদের মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু আমরা এখনো তেমনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছি না। এখন নিয়মিতই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইন শিক্ষার্থী পাস করে বেরোচ্ছে। আমরা চাই আমাদের এ পথচলার স্রোত যেন থেমে না যায়।’
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবী মোশাররফ হোসেন মজুমদার (৬৩)। মাত্র চার বছর বয়সে শারীরিক অসুস্থতায় দৃষ্টি শক্তি হারান। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৩ সালে ঢাকা বারে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) পদে দায়িত্ব পেয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন কয়েক বছর। এরপর ১৯৮৯ সালে হাইকোর্টে এবং ২০০২ সালে আপিল বিভাগে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবীদের সংগঠন ব্লাইন্ড ল গ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড অ্যাডভোকেট সোসাইটি বাংলাদেশের (ব্লাস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোশাররফ হোসেন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এই যাত্রা সুখকর ছিল না মোটেই। প্রতি পদে বাধা পেয়েছি। তবে কিছু মানুষের সহযোগিতাও পেয়েছি। পড়াশোনার শুরুতে যখন এ স্বপ্নের কথা বলতাম তখন অনেকেই হাসতেন। এখন আমরা আদালত অঙ্গনে সমানতালে কাজ করছি। আমরা এখানেই থেমে থাকতে চাই না। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধীদের এগিয়ে চলা যেন আরও সহজ হয় সে লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা অব্যাহত থাকবে।’
কীভাবে মামলার শুনানি করেন এমন প্রশ্নে বেশ কয়েকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে জানান, মামলার নথি হাতে আসার পর সেটি চেম্বারে তাদের সহকারী আইনজীবী (জুনিয়র) ও ক্লার্করা (আইনজীবী সহকারী) তাদের পড়ে শোনান। এরপর কী বিষয়ের ওপর শুনানি করবেন, সংশ্লিষ্ট আইনের কোন কোন ধারায় কী কী উল্লেখ আছে, পূর্ববর্তী নজির এসব নিয়ে নিজেরাই খসড়া তৈরি করেন। শুনানির দিন এর ভিত্তিতে তারা শুনানি করেন। বিচারকদের কোনো প্রশ্ন থাকলে জুনিয়র ও ক্লার্করা নথিপত্রের বরাতে তাদের সহযোগিতা করেন এবং সেভাবেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তবে করোনাকালে গত দেড় বছর ধরে এ আইনজীবীদের অনেকেই ভালো নেই বলে জানান।
মোশাররফ হোসেন মজুমদার বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে একপ্রকার অচলাবস্থা চলছে। আমাদের আইনজীবীদের প্রায় সবারই প্রতি কর্মদিবসে মামলার শুনানির ওপর আয় রোজগার হয়। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তাদের অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকের যে সঞ্চয় ছিল তাও ফুরিয়ে গেছে। এ অবস্থা কতদিন চলে তাও অনিশ্চিত।’
পূরণ হচ্ছে না বিচারক হওয়ার স্বপ্ন : আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেশ কয়েকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান, তাদের অনেকেরই বিচারক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হচ্ছে না। আইনিসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে পরীক্ষার ফরমও পূরণ করছেন না অনেকে। অথচ সংবিধানে বলা আছে, কর্মক্ষেত্রে দেশের সব নাগরিক সমান অধিকার পাবেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। ময়মনসিংহের নান্দাইলের চন্ডিপাশা গ্রামের দৃষ্টিহীন সুদীপ দাস (৩০)। শ্রুতিলিখন পদ্ধতিতে ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক (এলএলবি) এবং ২০১৬ সালে স্নাতকোত্তর (এলএলএম) সম্পন্ন করেন কৃতিত্বের সঙ্গে। ২০১৭ সালের বিজেএসের (বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস) প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ) পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রবেশপত্র নিলেও শ্রুতিলিখন পদ্ধতির সুযোগ না থাকায় অভিমানে পরীক্ষাই দেননি সুদীপ। এরপর ২০১৮ সালের পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের সুবিধা না মেলায় খাতায় শুধু স্বাক্ষর করে নীরব প্রতিবাদ জানান তিনি। সুযোগ মেলেনি ২০১৯ সালের নভেম্বরের ১৩তম বিজেএস পরীক্ষাতেও। ওই পরীক্ষায় শ্রুতিলিখন পদ্ধতির সুযোগ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন সুদীপ। ওই বছরের ৭ নভেম্বর আবেদনটি খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। এখন ১৪তম বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সুদীপ দাস এখন একটি বহুজাতিক কোম্পানির অধীনে প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে কাজ করছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বিচারক হওয়ার স্বপ্ন এখনো দেখি। এজন্য আমার লড়াই চলবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এই দৃষ্টান্ত রয়েছে। দেশের সংবিধানে কোথাও বলা নেই যে শারীরিক প্রতিবন্ধীরা বঞ্চিত থাকবে। অথচ আমার মতো অনেককেই এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবীদের টিকে থাকার লড়াই প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম (আবু মোহাম্মদ) আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী অনেকেই আইনি পেশায় এসেছেন। এটি একটি বিশাল ব্যাপার। উনারা যে কারও অনুগ্রহের পাত্র নন, নিজের কাজ নিজেই করতে পারেন এটা তারই প্রমাণ। এ অধ্যবসায়ের কারণে এখন তারা নিজেদের সামর্থ্যইে কাজ করছেন। এটি অবশ্যই বিচার বিভাগের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাক্ষ্য আইনের ৭৩ ধারা অনুযায়ী বিচারক হচ্ছেন সবচেয়ে বড় পরীক্ষক। নথিপত্র দেখা, স্বাক্ষর মেলানো, আসামি পরীক্ষা এসব তাকে করতে হয়। এজন্য কারও সাহায্য নিতে পারেন না। এখন বাস্তবিক কারণেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা বিচারক হতে পারছেন না। তবে আমি আশাবাদী তাদের সুবিধার্থে সামনে হয়তো উন্নত প্রযুক্তি আসবে।’
