সরকারি সহায়তাবঞ্চিত দুই শতাধিক নারী

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ০১:১৪ এএম

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নে তালিকায় নাম থাকার পরও দুই শতাধিক দুস্থ নারী সরকারি সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী বিপ্লব চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে দুই শতাধিক নাম বাদ দিয়ে সেখানে নিজের পছন্দের নাম যুক্ত করে সহায়তার চাল আত্মসাৎ করেছেন। ভুক্তভোগীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর চেয়ারম্যানের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লিখিত আবেদন করলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ভিজিডির কার্ড বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে কয়েকজনের নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ রদবদলের এখতিয়ার আমার রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ বছর শিবনগর ইউনিয়নে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের থেকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়। সে সব আবেদন থেকে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ৪৪০ জনের তালিকা চূড়ান্ত করে চেয়ারম্যানকে দেন। এসব অসহায় উপকারভোগী নারীর জন্য ২৬ দশমিক ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করে গত মে ও জুনে বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী বিপ্লব নানা অজুহাতে সঠিক সময়ে ভিজিডি কার্ড ও চাল বিতরণ করেননি। এমনকি চূড়ান্ত তালিকা থেকে দুই শতাধিক নাম বাদ দিয়ে সেখানে অন্য নাম দেখিয়ে চাল তোলা হয়েছে। যদিও একই উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে ২৫ মে এবং ১৪ জুন মাসের ভিজিডির চাল বিতরণ করা হয়েছে।

চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকলেও ভিজিডি কার্ড না পাওয়ায় গত জুনের প্রথম সপ্তাহে জোসনা খাতুন, নাছিমা বেগম, মরজিনা খাতুন, ছালেহা বেগম, রাশেদা খাতুন, নুরবানু, ইয়াতন বেগম, রেজিয়া ইসলাম, কহিনুর রহমান, রুবিনা বেগম, বিউটি খাতুন, গোলাপী বেগম, সানজিদা বেগম পৃথকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিয়াজ উদ্দিন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য অনলাইন তালিকায় তাদের নাম থাকলেও কার্ড ও চাল দেওয়া হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বিপরীতে চেয়ারম্যান ভিজিডির তালিকায় যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাদের অনেকেই বিষয়টি জানেন না। এমনকি তাদের নামে চালও তোলা হয়েছে। আবার কার্ডধারী অনেকের অভিযোগ, তারা দুই মাসে একবার চাল পেয়েছেন।

উপকারভোগী আদুরী বেগম, রাজিয়া খাতুন ও মঞ্জিলা দেশ রূপান্তরকে জানান, ভিজিডির চাল প্রতি মাসে দেওয়ার কথা। কিন্তু ঈদুল ফিতরের এক সপ্তাহ আগে একবার চাল পান। আর ঈদুল আজহার আগ মুহূর্তে তারা আরেকবার চাল পেয়েছেন।

ভিজিডি কার্ড নিয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ আসার আগেই গত ২৩ মে উপজেলা বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন ইউএনও। তবে কমিটির প্রধান বদলি হলে তদন্ত পিছিয়ে পড়ে। পরে উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন নেয়ামত আলীকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। বর্তমানে কমিটি তদন্তকাজ পরিচালনা করছে।

শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব দীপক চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান বিপ্লব শুরু থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে অনিয়ম করছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে শায়েস্তা করা হয়। গত ৪ জুলাই অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাকে লাঞ্ছিত করা হয়। আমাকে আমার কক্ষ থেকে বের করে তালা লাগিয়ে দেন চেয়ারম্যান। পরে আমি ইউএনওসহ বিভিন্ন দপ্তরে এবং ফুলবাড়ী থানায় একটি অভিযোগ দেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বছর অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ইউএনও এবং উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। এ তালিকা কাটছাঁটের এখতিয়ার চেয়ারম্যানের নেই। কিন্তু তার কথাই যেহেতু ইউপিতে আইন, তিনি ইচ্ছেমতো তালিকা কাটছাঁট করেছেন।’

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকেই চেয়ারম্যান বিপ্লবের বিরুদ্ধে ভিজিডিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তিনি ভিজিডি নিবন্ধনের জন্য প্রথম থেকেই সহযোগিতা করেননি। এরপর আমরা ওই ইউনিয়নে ৪৪০ সুবিধাভোগীর চূড়ান্ত তালিকা করে তাদের নামে ভিজিডি কার্ড দেওয়ার জন্য তাকে বলেছি। কিন্তু তালিকার অনেকে কার্ড পাচ্ছেন না জানার পর তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইনে আবেদনের ভিত্তিতে তালিকাটি উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও আমার নেতৃত্বে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি চেয়ারম্যান কোনোভাবেই কাটছাঁট করতে পারেন না। তিনি তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে অন্যায় করেছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত