বিশ্ব সাঁতারে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্র দ্বৈরথ বহু পুরনো। সেই লড়াইয়ে গতকাল নতুন মাত্রা দিলেন অস্ট্রেলিয়ার আরিয়ার্নে টিটমাস। অলিম্পিকে প্রথম খেলতে নেমেই পুলে ঝড় তুলেছেন কুড়ি বছরের টিটমাস। নাটকীয়ভাবে কাল তিনি হারিয়েছেন পাঁচ অলিম্পিক সোনাজয়ী মার্কিন সাঁতারু কেটি লেডেটস্কিকে। টোকিও অ্যাকুয়াটিক সেন্টারে নারীদের ৪০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে ৩৫০ মিটার এগিয়ে থাকার পরও হারতে হয়েছে তিনটি বিশ্ব রেকর্ডে ফ্রি-স্টাইলের ‘ডমিনেটর’ খ্যাত লেডেটস্কিকে। শেষ ৫০ মিটারে গতির ঝড় তুলে স্বর্ণপদক নিজের করে নেওয়া টিটমাস পেয়ে গেছেন ‘টারমিনেটর’ খেতাব। এর মধ্য দিয়ে লেডেটস্কিকে দারুণ এক লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে রাখলেন টিটমাস। আসছে দিনগুলোতে পুলে এই দুই নারীর জমজমাট লড়াই হবে আরও দুটি ইভেন্টে।
লেডেটস্কির অলিম্পিক অভিষেক সেই ২০১২ লন্ডন গেমসে। সেবার অপ্রত্যাশিতভাবেই জিতে নিয়েছিলেন ৮০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলের স্বর্ণপদক। আর ২০১৬ রিও গেমসে সবচেয়ে সফল নারী ক্রীড়াবিদের খেতাব জিতে নেন চার স্বর্ণ, এক রুপার সঙ্গে দুটি বিশ্বরেকর্ড গড়ে। চেক বংশোদ্ভূত ২৪ বছরের লেডেটস্কির রাজত্বে টিটমাসের হানা অবশ্য টোকিওতে নয়। ২০১৯ বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে প্রিয় ৪০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে টিটমাসের কাছে হেরে হতবাক হয়ে যান মার্কিন জলকন্যা। তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল ফ্রি-স্টাইলের রানীর মুকুটে চোখ পড়েছে অসি কন্যার। দু’বছর পর টোকিওতে এসে সেটাই আংশিক সত্য হলো। হারলেও খুব একটা হতাশ নন শীর্ষ পর্যায়ে ৩৪টি পদকজয়ী লেডেটস্কি। বরং অসি প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রশংসাই করেছেন তিনি, ‘সত্যি ও খুব ভালো সাঁতরেছে। আমি নিজেও খুব স্বতঃস্ফূর্ত ছিলাম। ৩০০ মিটার পেরুনোর পর যখন দেখলাম সে আমার খুব কাছাকাছি আছে, তখনই বুঝেছিলাম শেষটায় জোর লড়াই হবে। তখনো আমি হাল ছাড়িনি বা ভাবিনি হেরে যাব। কিন্তু ও শেষ ৫০ থেকে ৭৫ মিটার গতি অনেক বাড়িয়ে আমার ঠিক আগেই দেয়াল ছুঁয়ে দিয়েছে।’ টিটমাস অবশ্য লড়াইটার ব্যবচ্ছেদের পথে হাঁটেননি। বরং টোকিওতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন, সেটার বাস্তবায়নের কথাই বলেছেন, ‘আমি সবসময়ই নিজের আবেগকে সংবরণের চেষ্টা করি। এখানে এসেছি যে কাজে সেটা ঠিকঠাক হলেই আমি খুশি। আমি তাকে (লেডেটস্কি) ধন্যবাদ জানাই কারণ তিনি না থাকলে হয়তো আমি এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। সাঁতারটাকে যে পর্যায়ে তিনি নিয়ে এসেছেন তার সব কৃতিত্বই তাকে দিতে হবে।’
টিটমাসের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার কোচ ডিন বক্সালকে দেখা যায় বুনো উল্লাসে মেতে উঠতে। যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয় অন্তরজালে। ভাইরাল ভিডিও নিয়ে মেমে করতেও ছাড়েনি অনেকে। কোচের প্রতি অবশ্য কৃতজ্ঞতার শেষ নেই টিটমাসের, ‘সেই আসলে আমার এখানে আসার পেছনে সব। আমরা দুজনই জানতাম আমাদের কাজটা কী। পুলে আসার আগে এই লড়াই নিয়ে আমাদের কথা হয়নি। শুধুই উপভোগের মধ্য দিয়ে নিজেকে ঝালিয়ে নিয়েছি। কারণ আমি জানতাম আমাকে কী করতে হবে।’
৪০০ মিটারে শ্রেষ্ঠত্ব হারালেও দমছেন না লেডেটস্কি। কারণ ৮০০ মিটারে এখনো তিনিই সেরা। এই ইভেন্টে সেরা হয়ে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক সংখ্যা ছয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগটা কাজে লাগাতে চান তিনি। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন টিটমাসের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ তাকে আরও বেশি উজ্জীবিত করে তুলবে সামনের লড়াইগুলোতে, ‘আমার ধারণা এই দ্বৈরথে আমরা একে অপরকে উল্টো সাহায্য করছি পুলে আরও ভালো করার জন্য। প্রতিটি ইভেন্টই কঠিন। আর আপনি যখন ওর (টিটমাস) মতো প্রতিপক্ষ পাবেন, তখন লড়াইয়ের তাগিদটাও বেড়ে যাবে। আশা করছি আসছে সপ্তাহের প্রায় প্রতিটি ফ্রি-স্টাইলে ইভেন্টে এ রকম রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের উপলক্ষ পাব।’ বুধবার ২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলের পর শনিবার লেডেটস্কি-টিটমাস লড়বেন ৮০০ মিটারের শ্রেষ্ঠত্ব পেতে। লেডেটস্কি ১৫শ মিটার ফ্রি-স্টাইল ছাড়াও একটি রিলেতে অংশ নেবেন। আর তিনটি স্বর্ণ তাকে স্বদেশি কিংবদন্তি জেনি টমসনের ৮ স্বর্ণের পাশে বসাবে। রিওতে তিনি ২০০, ৪০০, ৮০০ এবং ৪ গুণিতক ২০০ মিটার রিলের স্বর্ণ জিতেছিলেন।
সবচেয়ে বেশি ১৮টি পদক জিতে সফল অলিম্পিয়ান হিসেবে ইতিহাস হয়ে আছেন সাবেক সোভিয়েত জিমন্যাস্ট লারিসা লাতিনিনা। ১৮টির মধ্যে ৯টি স্বর্ণপদক। সেদিকেই চোখ লেডেটস্কির।
