সায়মনের চোখ দেখা যাচ্ছে না। মাথাটা নিচু। কলমের দিকে চোখ। আমাদের চোখ সায়মনের দিকে। দরজার বাইরে থেকে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুমের বাইরে দেয়ালে মাথা এলিয়ে দিয়ে দেখছিলাম সায়মন ড্রিংকে। চোখটা মনে হচ্ছিল লাল, নাক টানছেন বারবার, টিস্যু দিয়ে নাক মুছছেন, ঝাপসা হয়ে যাওয়া চশমাটাও বারবার মুছছেন। কী সব কাগজপত্রে সাইন করছেন... দূর থেকে মনে হচ্ছিল সায়মন কাঁদছেন। কিন্তু হিসেবে মেলে না... ধুর! বিদেশিরা কি আমাদের মতো ফ্যাৎ ফ্যাৎ করে কাঁদে? তাও আবার সায়মন! আমাদের কাছে যিনি ‘সায়মন ড্রিম’!
স্বপ্নের মতো চমকে দেওয়া সব ঘটনা সায়মনের সঙ্গে আমার তো বটেই... আমাদের অনেকের, যারা তার কাছে শিখেছি, কাজ করেছি তার সঙ্গে। তখনো একুশে টিভি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। ২০০০ সালের কথা। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে প্রতিদিন বুলেটিনের ড্রাই রান। সেদিন আমি স্টোরি করলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে টর্চ জ্বালিয়ে অপারেশনের। স্টোরিটা দিয়ে, নিয়মিত সান্ধ্য মিটিং ফাঁকি দিয়ে একটা দাওয়াতে গেছি। মাত্র স্যুপে চুমুক দিয়েছি... আর মোবাইল স্ক্রিনে উঠছে SD calling, SD calling... সায়মনের নামটা SD নামে সেইভ করা। ভয়ে আমি ফোনটা তুলিনি। ১২টা মিসড কল। আমার রাতের ঘুম হারাম... চাকরিটা গেল বুঝি, হয়তো বিরাট কিছু ভুল করেছি, অপরাধ করেছি... তা না হলে খোদ MD আমার মতো একজন রিপোর্টারকে কল করবেন? নির্ঘুম-দুশ্চিন্তার রাত পোহায় না। সকালে, ভয়ে ভয়ে ইটিভির নিউজ রুমে ঢুকি। সবারই স্বাভাবিক আচরণ। আমার নামে অ্যাসাইনমেন্টও লেখা। শেষ দিনের শেষ কাজ ধরে নিয়ে চলে গেলাম সংসদে নারী আসন বাড়ানো নিয়ে স্পেশাল রিপোর্টের কাজে। আবারও ফোন... SD calling ফোনটা রিসিভ করতেই, স্বপ্নকণ্ঠ... Why don’t you pick my call Muni? Very bad...Where are you now? উত্তরে আমি আমতা আমতা...” Yeaaa... Simon, Yeaaa I am at...”, আমাকে বাক্যটা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, “Don’t eat... We will have lunch together... ok?” আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে কিছু ঠাহর করতে পারলাম না! হুম, হয়তো নিউজে কিছু ভুল করেছি... অথবা মিটিং অ্যাটেন্ড না করে আগে বেরিয়েছি... এই অপরাধে ফেয়ারওয়েল লাঞ্চ! আর সেটা MD-কেই কেন করতে হবে? যিনি আমার কাছে Dring নন, Dream..., তাকেই করতে হবে! সায়মনের আদেশ মেনে বেলা আড়াইটা অব্দি না খেয়ে, কাজ শেষ করে MD এর দরজায় দাঁড়াতেই চেয়ার ছেড়ে সায়মন সামনে এসে আমাকে হাত ধরে বসালেন। তার প্রিয় নানরুটি আর ডাল-খাশি (স্টার রেস্তোরাঁর) দুটো প্লেটে বেড়ে রাখা। আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরে বললেন, You are amazing Muni.... (মুন্নী বলতে পারতেন না), You are such a talented reporter...Proud of you! Watched your report yesterday... I am thrilled... নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না... কী শুনছি। স্বয়ং বস এমন প্রশংসা করছে আমার মতো একজন ছোট্ট রিপোর্টারকে? ভালো রিপোর্টের পুরস্কার সায়মনের ঠান্ডা, শক্ত নানরুটি, ডাল-খাশি চিবানো এবং তার সঙ্গে আমার ভুলভাল ইংরেজিতে এক ঘণ্টা গল্প করা। গল্প করতে করতে বলেই ফেললাম, ৯ বছর কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতায় কখনোই সম্পাদক বা হোমড়া চোমড়া কারও কাছ থেকে প্রশংসা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে চাকরি হারানোর ভয়, ফোন না ধরা... সব সব গল্প।
সায়মন মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে আমার হাতে একটা চিঠি দিলেন Letter of appreciation। অন এয়ারে আসার আগে এমন একটা চিঠি পাওয়ার পর সেই সময়ে আবেগে ঝাপসা চোখের অনুভূতিটা মিলিয়ে দেখছিলাম, সরকারি রোষে বন্ধ করে দেওয়া একুশে টিভির বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভে ঝাপসা চোখের অনুভূতি নিয়ে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। দলিলপত্র, নানান কাগজে সাইন করতে করতে একবার মুখ তুলে দরজার বাইরে তাকালেন সায়মন। চশমাটা মুছতে মুছতে সবাইকে দেখে নিলেন হয়তো... আমি, মামুন, কাওসার, নাসরিন, রাশিদা আপা, সুপন, শাম্মী, রুমি... সবাই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে। সায়মনকে বিদায় দিতে। চলে যেতে হচ্ছে তাকে। বিএনপি-জামাত সরকার একুশে টিভি বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করেছে তার! আর ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছে বেরিয়ে যাওয়ার! সায়মন চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে শেষবারের মতো একুশে-তে, সই করছেন প্রয়োজনীয় কাগজে। সায়মনকে কীভাবে বিদায় দেব আমরা? সুপন গুন গুন করছে ‘জীবনেরই কথা জীবনেরই গানভেদাভেদ ভুলে ভাঙে অভিমান, এই যাত্রার শুরু নব জীবনের... একুশের পাল তুলে’। একুশের উদ্বোধনীর গান। সায়মন মুখস্থ করেছিল লাইন কটা, সুপনের সঙ্গে হাত নাড়া-পা নাড়া মিলিয়ে, ঠোঁট মিলিয়েছে। সুপনের গুন গুনে করুণ সুর... চোখের ঝাপসা পর্দায় ভাসে, ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতার এই স্বপ্নগুরুর যুদ্ধ সাংবাদিকতার পিটিসি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে সায়মন। কাজ করতে করতে পায়ের কাছে মাইন বিস্ফোরণ হয়। ডান পায়ে ইনজুরি। রক্তমাখা পা-টা চেপে ধরে চলন্ত ট্রাকে সায়মন বলে যাচ্ছেন, কী ঘটনা...কীভাবে কোথায় হলো। ইটিভির বার্তা কক্ষে নানান কিছু শেখাতে গিয়ে সায়মন কতবার যে এ ভিডিওটা দেখিয়েছেন। আমরা অবশ্য আগ্রহী ছিলাম, তার ৭১-এর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা শুনতে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের কোনো এক বাবুর্চি তাকে সাহায্য করল রান্নাঘরে লুকিয়ে থাকতে... ২৫ মার্চের পরের ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলা, মোজার ভেতর রিল লুকানো...কত গল্প। যুদ্ধের নয় মাসে তার কাজ পোস্টিং...আবারও ৭২-এ বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার আগের মুহূর্ত বাংলাদেশের জন্মের, বাংলাদেশের কত কিছুর সাক্ষী এই দশাসই মানুষটা। একুশে টিভির নাম নিয়ে সায়মনের দারুণ গর্ব! একুশ...শুধুই কি একটা সংখ্যা? একটা তারিখ? বাংলা ভাষা নিয়ে লড়াই শুরুর মাইলস্টোন কি শুধু... তার ভাষায়, ২১ মানে মানব জীবনের পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। উচ্ছলতা আর বাস্তবতার মেলবন্ধনে জীবন সাজিয়ে নেওয়ার মাহেন্দ্র সময়। সেটাই বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে স্পিরিচুয়ালি মিলে গেছে এই লালন, হাছন, নজরুলের দেশে। একটি টিভি চ্যানেলের নাম একুশে রাখার মানে হলো, টগবগে তারুণ্যে পরিবর্তনের অঙ্গীকার। আর একুশ শতকে বাংলাদেশ... ভিশন ২০২১ এসব তো আছেই। আমরা একুশে মানে তারুণ্য-পরিবর্তন-নতুন কিছু গড়ার বয়েসী হিসেবেই নিজেদের ভাবতাম। যদিও একুশিরা কেউ কেউ, আমরা বায়োলজিক্যাল এইজে ২০, ২২, ২৪, ৩৮, ৪২, ৫৭-এর ছিলাম। তবে সায়মন পাক্কা একুশ বছরের তারুণ্যের মনটায় বাস করতেন, তার ৫৩-এর দেহে। সেটা কেমন? মিডিয়া কাপ টুর্নামেন্টে পার্থদার নেতৃত্বে ইটিভির সাংবাদিকরা খেলছে। আমি কোচ (যেহেতু খেলতে পারি না, তাই সবাইকে জাগিয়ে তুলে প্র্যাকটিসে পাঠানোর জন্য আমাকে কোচ বানানো হয়)। এবং আমি ঘুমকাতুরে। তো আমাদের MD, যাকে Standard Definition বা সংক্ষেপে SD বলতাম, প্রতিদিন ভোরে গিয়ে হাজির, পাল্টা কোচগিরি করতে। আর আমাকে তিরস্কার... You lazy girl...
মাত্র দু’বছরেরও কম, একুশে অন এয়ারে ছিল। মানুষের মনে একটা ছাপ ফেলার জন্য যে পরিশ্রমটা আমাদের পুরো দলের প্রতিটি সদস্যকে করতে হয়েছে, তাদের নেপথ্যে থেকে উসকে দেওয়া, টোকা দেওয়া... ধাক্কা দেওয়ার একজনই ‘একুশি’! তিনি যে সায়মনই ছিলেন, সেই সত্যটা আমরা সবাই মিলে প্রতিদিনের গল্প মেলাতে বসলে জ্বলজ্বল করত। বাইরে থেকে অনেক বন্ধুই বলেছেন, ব্রিটিশ বলে, বিলেতি বলে আমাদের তার প্রতি আনুগত্য...২০০ বছর ব্রিটিশ গোলামি খাটার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। দূর থেকে তেমনই শোনায় হয়তো। কিন্তু এই আমিই তো তার কাছে শুনেছি রিপোর্টারের ‘ট্রমা সিনড্রোম’ শব্দটি। রমনা বটমূলে বোমা হামলার সামনে পড়ে...আবার কাভার করে নিউজ রুমে ফেরত আসা কর্মীটিকে তিনিই বুকে জড়িয়ে ওম্ দিয়েছেন, ট্রমা কাটাবার জন্য। আবার টিপিক্যাল বাঙালি বাবার মতো রাত-দিন ফোনে খবর রেখেছেন, আমি যখন একা মালয়েশিয়ায়। হ্যালো বাংলাদেশ-এর কাজে। বান্দরবানের অং থুই খয়-এর নামে UNDP-এর ফান্ডে জলবিদ্যুৎ প্রজেক্টের নাম হওয়া চাই... এ চ্যালেঞ্জ দিয়েই আমাকে নামিয়েছেন, আমারই করা রিপোর্টের ফলো আপ-এ। ছেলেদের শার্টের কলার ঠিক করা থেকে জুতোর ধরন নিয়ে আড্ডাচ্ছলে সায়মনের টিচিং-এর চেহারা সবারই জানা। সেই মানুষটি একুশের নিউজ রুমে হাঁটবেন না, গড় বাঙালির এক কব্জি সমান লম্বা পা নিয়ে! আবার কি একুশে চালু হবে? ২০০২-এর ২৯ আগস্ট ইটিভি বন্ধ করে দেওয়ার পরের ক্ষণ থেকে যিনি প্রিয় মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া পরাজিত সৈনিকদের চোখ মুছে দিচ্ছিলেন। আশ্বাস দিচ্ছিলেন, আমরা আইনি লড়াইয়ে জিতব। মানুষের মনের আদালতে আমরা জয়ী...বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতির সাময়িক শিকার কেবল একুশে টিভি বা বাংলাদেশের ভালোবাসা।
একুশে বন্ধ হওয়ার পর থেকে যার দিকে তাকিয়ে একুশের কর্মীরা সাহস ফিরে পায় তাকে দেশ ছাড়তে হবে। এদেশ তো তার নয়, তাই... ভাগাও! দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আমার ঝাপসা পর্দায় কত শত এক্সার্প ভাসল... নিজেকে চিমটি কাটি, সত্যি কি সায়মন চলে যাবে। চোখ মেলে দূরের রুমটাতে ব্যস্ত সায়মন। শান্তিপ্রিয় চাকমা, ফরহাদ মাহমুদ, সাইদ ভাই, নওয়াজেশ আলী খান, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, জামান, আব্দুস সোবহান আরও কে কে যাচ্ছেন, আসছেন। দেখা করতে, কাগজ সাইন করতে, বাই সায়মন বলে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
এক সময়, সায়মনের ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এলো। সায়মন দড়াম করে চেয়ার থেকে উঠে একুশের নোটবুক আর একটা ছোট্ট পাউচ হাতে নিয়ে আমাদের সবার সামনে দিয়ে হেঁটে দরজার বাইরে গেলেন। আমরা হতভম্ব... কিচ্ছু বললেন না। মামুন, সুপন, কাওসার, জামান, ডালিম সায়মনের পিছু নিল। কী মনে করে আবার অ্যাডমিন ফ্লোরে ঢুকে, আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সবাই আবার তার পিছু। দরাজ গলায় বললেন... হ্যালো একুশে...গুড বাই! কাঁদছিলাম আমি মাথা নিচু করে, বাংলাদেশের এই বন্ধুর জন্য, তাকে অপমান করার লজ্জায়। আমাদের SD আমাদের ‘সায়মন ড্রিম’, কাছে এসে চেনা দুষ্টুমির চেহারা বানিয়ে মুনি আপা... Don’t cry, I’ll come again to Bangladesh. May be my third time will be best time... If i could not... I would love to be born again in this beautiful land.
কথাটা বলতে বলতে আমার দুই চোখের জলে দুটো চুমু দিয়ে দ্রুত চলে গেলেন। শাম্মী দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল মুন্নী আপা, চুমাটা মুইছো না...সায়মন ফিরে না আসা পর্যন্ত। আমার কানে বাজছে “I would love to be born again in this beautiful land...!” এই জন্মে সায়মন চলে গেলেন। আরেক জন্মে কি সায়মন ফিরে আসবেন প্রিয় বাংলাদেশে!
লেখক : প্রধান নির্বাহী সম্পাদক, এটিএন নিউজ
