করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত বিচারাঙ্গন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ০৪:২৩ এএম

গত বছর মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর দেশের উচ্চ ও বিচারিক আদালতে একপ্রকার অচলাবস্থা চলছে। সংগত কারণেই প্রায় ১৭ মাস ধরে বিচারপ্রার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি অসংখ্য আইনজীবী পেশাগত অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই বিচারক, আইনজীবীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর খবর ভাবিয়ে তুলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, মহামারীর কারণে সৃষ্ট বিচারাঙ্গনের এমন দিন তারা দীর্ঘ আইনি জীবনে দেখেননি। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আদালতগুলো মামলার ভারে ভারাক্রান্ত। মামলাজট কমিয়ে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি, বিচারিক ব্যবস্থা আধুনিক ও যুগোপযোগী হয়নি। এখন সে সমস্যা আরও বেড়েছে। আইন করে ভার্চুয়াল আদালত চালু হলেও সীমিত পরিসরে বিচারকাজ হওয়ায় এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে সহসাই আদালতগুলো আগের মতো সচল হবে সেটিও অনিশ্চিত। এখন বিচারাঙ্গনের এ ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায় সে লক্ষ্যে এখন থেকেই পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা দুর্যোগের কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এরকম তো আগে কখনো হয়নি। দুর্যোগের এ প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। এখন সেটাকে মোকাবিলা করতে সবাইকে একটু সতর্ক থাকতে হচ্ছে। বিচার বিভাগেও সেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এটি বাস্তবতা। যে কারণে ভার্চুয়াল আদালতের ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই মামলাজট ও বিচার পেতে বিলম্ব হওয়া আমাদের দেশে শুধু পুরনো সমস্যাই নয়, সাংঘাতিক সমস্যা। এখন মহামারীতেও মামলা থেমে নেই। প্রকৃত মামলা যেমন হচ্ছে, তেমনি অন্যকে ঘায়েল করতেও অনেকে মামলার আশ্রয় নিচ্ছে। যে পরিস্থিতি তাতে আগামী দুয়েক বছর পর মামলাজট ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাবে। তাই এ নিয়ে পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা আইনজীবীরাই হয়তো প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে বলতে পারি জনগণ ও দেশের স্বার্থে এ সমস্যার সমাধান হোক। পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে মামলাজট নিরসনে গুরুত্ব দিতে হবে।’

করোনা সংক্রমণ শুরু হলে গত বছর মার্চের শেষদিকে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের সব বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুধু ভার্চুয়ালি জামিন শুনানি শুরু হয়। চার মাস বন্ধ থাকার পর বিচারিক আদালতের কার্যক্রম আবার শুরু হয়। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতেও ভার্চুয়ালি বিচারকাজ শুরু হয়। গত বছরের শেষ এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে নিয়মিত আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বিচারাঙ্গনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আগেই গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফের বন্ধ হয়ে যায় বিচারিক আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম। এরপর ১২ এপ্রিল থেকে শুধু ভার্চুয়ালি জামিন শুনানি চলে। আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর গত ২০ জুন সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক আদালতের নিয়মিত বিচার কার্যক্রম চলার অনুমতি দিলেও সংক্রমণ আবারও বেড়ে যাওয়ায় ১০ দিনের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে যায়। মধ্য জুলাইতে কয়েক দিনের জন্য বিচারিক আদালতে শুধু সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়া কিছু বিষয়ে বিচারকাজ শুরু হলেও নিয়মিত বিচার ফের বন্ধ হয়ে যায়। উচ্চ আদালতে এখন অল্প কয়েকটি বেঞ্চে সীমিত পরিসরে বিচারকাজ চলছে। এদিকে প্রতিনিয়ত বিচারক, আইনজীবীদের আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর খবর আসছে। সব মিলিয়ে বিচার বিভাগের ওপর করোনার বড় অভিঘাত এসেছে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস’র (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতের এমন দিন দেখিনি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন এমন দিন না দেখে। দেড় বছরে বিচার বিভাগের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। করোনা যেহেতু এখনো শেষ হয়নি তাই ক্ষতির মূল্যায়ন করা এখন অসম্ভব। আরও ছয় মাস পিছিয়ে যাওয়া মানে আরও অনেক পিছিয়ে যাওয়া। সহসাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই নিকট ভবিষ্যতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি যেমন কমছে না, আইনজীবীদের কষ্টও লাঘব হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘ভার্চুয়ালি মামলা চললেও এটা হচ্ছে খুব সীমিত আকারে। আমরা মনে হয় না ভার্চুয়াল কোর্ট নিয়মিত আদালতের বিকল্প হতে পারবে। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিভাইসের সমস্যা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব সমস্যার সমাধান কিছুটা দুরূহ।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রভাবে সংগত কারণেই আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে একেবারেই যে বিচারকাজ হচ্ছে না তা নয়। ভার্চুয়ালি কিছু বিচারকাজ হচ্ছে। অনেক মামলা রয়েছে যেগুলো চূড়ান্ত শুনানি হলে নিষ্পত্তির পথে যেত, এগুলো আটকে যাচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে আদালতের কার্যক্রম মাঝেমধ্যে বন্ধ ছিল। আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আইনজীবীরাও নানা সময়ে আন্দোলন করেছেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় আদালতের কার্যক্রমে কখনো স্থবিরতা আসেনি। এতে করে বিচারপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিচার পাওয়া থেকে। আর আইনজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জীবনের অধিকার থেকে।’ তিনি বলেন, ‘মহামারী ছাড়াও তো আমাদের মামলার জট ছিল। সে ব্যাপারে তো পরিকল্পনার দরকার ছিল। কিন্তু কোনো মহাপরিকল্পনা আগে দেখিনি। এখন যে জট তৈরি হচ্ছে সেটা আরও এগিয়ে গেছে। এটাকে দূর করতে আগে যে পরিকল্পনার দরকার ছিল তার চেয়ে আরও জোরে মহাপরিকল্পনা নিতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈশি^ক এ সমস্যায় আইন-আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের অনেক আইনজীবী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যারা ডিফেন্স ল ইয়ার (অভিযুক্ত কিংবা বিবাদীপক্ষের আইনজীবী) যাদের আয় এবং সংসার চালানো নির্ভর করে মূলত আদালত খোলা রাখার ওপর। তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ন্যায়বিচার প্রার্থী মানুষ। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিন্তু বসে নেই। তাদের কার্যক্রম চলছে। অনেকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রম যখন একই সঙ্গে না চলে তখন কিন্তু অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি হয়।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই মামলাজট দীর্ঘদিনের সমস্যা। তার ওপর দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকার কারণে মামলার জট বাড়তে থাকবে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় আছি।’

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর গত ২৮ জুলাই পর্যন্ত বিচারিক আদালতের ৩২৫ জন বিচারক ও ৬৪০ জন কর্মচারী আক্রান্ত হয়েছেন। দুজন বিচারক ও বিভিন্ন আদালতের আটজন কর্মচারী মারা গেছেন। আক্রান্ত বিচারকদের মধ্যে এখনো ৫৯ জন বিচারক এবং ১৪৩ জন কর্মচারী হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে চিকিৎসাধীন। ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল বাতেন দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ১৭ মাসে ঢাকা বারের প্রায় ২০০ আইনজীবী মারা গেছেন যাদের বেশিরভাগ করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘করোনায় যে আঘাতটি এসেছে সেটি আমাদের আইনি জীবনে আর দেখিনি। করোনার প্রভাব বেশি পড়েছে বিচারপ্রার্থী এবং আইনজীবীদের মধ্যে। কেননা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কমবেশি খোলা থাকলেও দীর্ঘ সময় আদালতের বিচারকাজ বন্ধ থাকছে। এতে করে বিচারপ্রার্থীরা যেমন তার বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি মামলার জটও বাড়ছে। বেশিরভাগ আইনজীবীর আয়-রোজগার প্রতিদিনের মামলার ওপর নির্ভর হলেও তারা আর্থিকভবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখন কত দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান হবে সেই অপেক্ষায় আছি আমরা।’

ঢাকা বারের তরুণ আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু আমরা তরুণ আইনজীবীরা নই, যারা দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় তারা অতীতে এ ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হননি। বিচারপ্রার্থী বলেন, আইনজীবী বলেন সবাই গত দেড় বছর ধরে একটা দুঃসহ সময় পার করছি। বিচারপ্রার্থীরা শুধু মামলার খবর নেন। কিন্তু তাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো পরামর্শ বা আইনি সহায়তা দিতে পারছি না। মহামারী শেষ হওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখছি না। দুর্যোগকালীন তো ভার্চুয়াল আদালত চালু হয়েছে। কিন্তু সেটার ব্যবহারও এখনো ব্যাপকভাবে হচ্ছে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত