দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে প্লাবনের বড় ক্ষত

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ০৪:২৭ এএম

লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণ ও পূর্ণিমার কারণে অধিক উচ্চতার জোয়ারের কারণে গত কয়েক দিনে প্লাবিত হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক এলাকা। ফসলি জমির পাশাপাশি নদীতীরবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটেরও ব্যপাক ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে হাজার হাজার মাছের ঘের। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় ঘটেছে বহু হতাহত। সব মিলিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে উপকূলজুড়েই। কিছু এলাকার পানি নেমে যাওয়ার পর জেগে উঠেছে প্লাবনের ক্ষত। কৃষি ও মৎস্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো থেকে পাওয়া হিসাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ইতিমধ্যে। এর মধ্যে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। আর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে উপকূলের বেশিরভাগ এলাকায় রয়েছে প্লাবনের শঙ্কা। 

দেশ রূপান্তরের ব্যুরো অফিস ও বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধির পাঠানো খবরে বিস্তারিত

কক্সবাজারে নেমে যাচ্ছে বন্যার পানি, ভেসে উঠছে ক্ষত : টানা কয়েক দিন ধরে ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে সৃষ্ট বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে। এতে ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। ফসলি জমির পাশাপাশি গ্রামীণ সড়কগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বসবাসরত মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাব। অবশ্য এসব বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা।

কক্সবাজার জেলায় কয়েক দিন ধরে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, রামু, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ এবং উখিয়ার ৫১টি ইউনিয়নের আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি। পানিতে ডুবে আছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের কয়েকটি স্থান। এসব এলাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছে বন্যার্ত মানুষরা। চলছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট। ফলে বন্যাদুর্গত এই মানুষগুলো পড়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, জেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার মধ্যে ৫১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৫২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৭৬ হাজার ৫০০ পরিবারের আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৩২ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্লাবিত এলাকার জন্য ইতিমধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ১৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

এদিকে গত তিন দিন ধরে ভারী বর্ষণে পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ভেসে জেলায় ২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

চকরিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, টানা চার দিনে ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অধিকাংশ গ্রামাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একাধিক বেড়িবাঁধ ভেঙে নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট। সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া চাল, চিড়া, গুড় প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

সাহারবিল ইউপি চেয়ারম্যান মহসিন বাবুল জানান, বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। তার ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় গ্রামীণ সড়ক ভেঙে পড়েছে।

চিরিংগা ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানান, চিংড়ি জোন খ্যাত তার ইউনিয়নে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বানের পানির সঙ্গে হাজার হাজার একর চিংড়ি ঘের ভেঙে একাকার হয়ে গেছে। চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী জানান, পৌরসভার পাশাপাশি ১৮টি ইউনিয়নে রান্না করা ও শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

মহেশখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পাহাড়ি পানের বরজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে হাজারখানেক পানের বরজ। এতে চাষিরা কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মহেশখালীতে ১৩ হাজার পানচাষি রয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আরও লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু অব্যাহত বর্ষণের ফলে পাহাড়ধসে তাদের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম নষ্ট হয়ে গেছে।

হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

মহেশখালী উপজেলা কৃষি অফিসার মমিনুল হক জানান, মহেশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে পাহাড়ধস ও ঢলে পানের বরজসহ ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা চাষিদের খোঁজখবর নিচ্ছি বলে জানান।

পেকুয়া-কুতুবদিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাউবো নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ ভেঙে মাতামুহুরী নদীর পানি ঢুকে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পেকুয়া উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ গত তিন দিন ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একইভাবে গত তিন দিন ধরে পেকুয়ার বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের দেখা নেই। বন্যাকবলিত এলাকায় শত শত নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে বন্যাকবলিত এলাকাসমূহে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার তিনটি পয়েন্টে পাউবো নিয়ন্ত্রণাধীন বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কমপক্ষে ৫০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবোর পেকুয়া উপজেলার দায়িত্বে থাকা সেকশন অফিসার (এসও) প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিনি পেকুয়ার বিভিন্ন বেড়িবাঁধ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। মগনামায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ায় এবার সেখানে কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। উজানটিয়া ইউনিয়নে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ জরুরি মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের অংশ পুনঃ মেরামত করেছেন। তিনি আরও বলেন, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়নি। বন্যার পানি লোকালয় থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য স্থানীয়রা পেকুয়া সদরের পূর্ব মেহেরনামা এলাকার দুটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ কেটে দিয়েছেন।

শঙ্খের ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে পুকুরিয়ার বাড়িঘর : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়দিনের প্রবল বর্ষণের ফলে ও পাহাড়ি ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও পুকুর-ডোবা। অপরদিকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে কাঁচা রাস্তাগুলো ভেঙে পড়ায় সাধারণ জনগণকে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এদিকে শঙ্খ নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে পুকুরিয়া ইউনিয়নের তেচ্ছিপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বাড়িঘর বিলীনের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে। কয়দিনের প্রবল বর্ষণের ফলে বাঁশখালীর শেখেরখীল, সরল, পুকুরিয়া, সাধনপুর, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, পৌরসভার জলদী, শীলকূপ, গন্ডামারা, কাথরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পানি জমাট বেঁধে মৎস্য ঘের ও পুকুরের মাছ পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বলে জানান মৎস্যচাষিরা।

বাগেরহাটে ১৬ হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে : উপকূলীয় বাগেরহাটে টানা বৃষ্টির পানিতে ৯ হাজার চিংড়ি ঘের ও  ৭ হাজার পুকুর ভেসে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ। গত তিন দিনের টানা বর্ষণে জেলার রামপাল, মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও বাগেরহাট সদর উপজেলাতে সবচেয়ে বেশি মাছের ঘের ভেসে গেছে। গত মে বাগেরহাটে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের জোয়ারের পানিতে ৬ হাজারের অধিক মাছের ঘের ভেসে যায়। সে সময় চাষিদের ক্ষতি হয় অন্তত ৯ কোটি টাকার। বাগেরহাট জেলায় ছোট-বড় ৬৭ হাজার মাছের ঘের রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বাগেরহাট মৎস্য বিভাগের বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) এ এস এম রাসেল বলেন, গত দুই দিনের অতি বৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারের পানিতে জেলার ৪৭টি ইউনিয়নে মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। এর মধ্যে ৭ হাজার পুকুর, ৯ হাজার চিংড়ির ঘের রয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ সাদা মাছ আড়াই কোটি টাকা, চিংড়ি সাত কোটি টাকা। কাঁকড়া, সাদা মাছ ও চিংড়ির পোনার ক্ষতির পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া অবকাঠামোতে ক্ষতি হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মাছের ঘের ভেসে প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পেয়েছি। বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত