এনজিওর মাধ্যমে ৮ হাজার ডে কেয়ার সেন্টারের চিন্তা

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ০২:১৭ এএম

কর্মজীবী নারীদের শিশু-সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও যতœ সহকারে লালন-পালনের জন্য ৮ হাজার ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন করবে সরকার। এজন্য প্রাথমিক ভাবে দেশের ৪৫টি উপজেলায় চাইল্ড কেয়ার ইনস্টিটিউট করা হবে। এসব ইনস্টিটিউটের অধীনে এসব সেন্টার পরিচালনা করা হবে। আর সার্বিকভাবে সহায়তা করবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। ডে কেয়ারের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৫৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এনজিওগুলোর জন্য। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এর আগে এনজিওর মাধ্যমে শিশুদের দুপুরের খাবার পরিবেশন সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন না করে ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচিত এনজিওকে অর্থ প্রদানে ‘হায়ারিং চার্জ’ খাতের নামে ২৫৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কেন্দ্র পরিচালনায় এনজিও সার্ভিস গ্রহণের খাতটি যথোপযুক্ত কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া এ খাতে ব্যয় প্রক্কলন যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উক্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কারা হবেন তা ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। যদিও প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কিছুই জানে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের শিশু একাডেমির অধীনে কেয়ার সেন্টার রয়েছে। এসব ডে কেয়ার সেন্টারে সবাই শিশু রেখে যেতে পারেন । কিন্তু ওইসব নারীকে অবশ্যই কর্মজীবী হতে হবে।’

প্রকল্প প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের বিষয়ে জানি না। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প প্রস্তাব করে থাকলে দু-তিন দিনের মধ্যে ফাইল চলে আসবে। তখন বিস্তারিত বলতে পারব।’ তিনি সহকারী পরিচালক আমির হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। আমির হোসেন খানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি ধরেননি। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু অনেক কর্মজীবী নারীর সংসারে ছোট্ট বাচ্চা দেখাশোনা করার মতো কেউ থাকে না। ফলে অনেকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। অনেকে আবার গৃহপরিচারিকার অধীনে বাচ্চা রেখে কর্ম চালিয়ে যান। অনেক সময় এসব শিশু নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যাওয়া অন্যতম। তাই কর্মজীবী নারীর শিশুসন্তানের দেখভাল করার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে এসব সেন্টারে শিশুকে সাঁতার কাটাও শেখানো হবে। যেন পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার কমানো যায়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের, ‘ইনাগুরেট কমিউনিটি বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেইফ ফেসিলিটিজ’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ডে কেয়ার সেন্টারগুলোতে দিনের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়াসহ সব ধরনের আঘাত থেকে সুরক্ষা করা হবে।

শিশুর যতœ কেন্দ্রগুলাতে ১-৫ বছর বয়সী বিভিন্ন সুবিধা যেমন বুদ্ধিভিত্তিক, স্বাস্থ্যগত, পুষ্টিগত উন্নয়ন বিষয়গুলো নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা থাকবে। ৬-১০ বছর শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। জাতীয় পর্যায় এবং তৃণমূল পর্যায়ে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়াসহ বিভিন্ন আঘাত থেকে সুরক্ষা প্রদান এবং শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত (ইসিসিডি) সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।  এছাড়া শৈশবকালীন আঘাত রোগ এবং সমন্বিত ইসিসিডি সেবা অনুশীলনের মাধ্যমে সর্বোত্তম ফলাফল পেতে পরিবারের সঙ্গে সামাজিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ এবং শৈশবকালীন আঘাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য ইতিবাচক প্যারেন্টিং বিষয়ে অধিকতর শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে মহিলাদের উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা থাকবে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্প প্রস্তাবে অর্থ বিভাগের সুপারিশকৃত জনবল কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রাক্কলন করা হয়নি। অর্থ বিভাগ কর্র্তৃক প্রকল্প পরিচালক, উপপ্রকল্প পরিচালক এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালকের পদ প্রেষণ/অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পর্যায়ে প্রেষণ অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব যেকোনো একটি ধরন নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী বেতনভাতা প্রদান করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিশন।

প্রকল্পের অধীনে ১টি মাইক্রোবাস এবং ২০টি মোটরসাইকেল ক্রয় ছাড়াও ১টি গাড়ি ভাড়ার জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে ২০টি মোটরসাইকেল ক্রয় এবং ১টি গাড়ি ভাড়া করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। প্রকল্পের পরামর্শক খাতে ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কিন্তু পরামর্শকের কোনো টিওআর সংযুক্তকরণ

হয়নি। প্রকল্পের অন্যান্য খাতের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন ফি, অপ্রত্যাশিত খাতে ব্যয় প্রাক্কলনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে আপ্যায়ন ব্যয় খাতে ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, বইপত্র ও সাময়িকী খাতে ৩৭ লাখ এবং গবেষণা খাতে ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা অত্যধিক প্রতীয়মান হয়। উক্ত খাতসমূহসহ অন্যান্য খাতের ব্যয় প্রাক্কলন নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।

অন্যদিকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উক্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কারা হবেন তা ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, চলতি বছর থেকে ২০২৪ সালের জুন নাগাদ এর বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে। দেশের ৪৫টি উপজেলার মধ্যে বরিশাল বিভাগের বরগুনা, ভোলা এবং পটুয়াখালী জেলায় হবে ১০টি।

চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর এবং লক্ষ্মীপুরে হবে ৯টি।

ঢাকা বিভাগের নরসিংদীর মনোহরদীতে হবে একটি। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা জেলায় হবে ৫টি। ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং শেরপুর জেলায় হবে ৯টি। রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলায় হবে ৩টি। রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে হবে ৩টি। এছাড়া সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলায় হবে ৭টি।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যার মধ্যে ১-৪ বছর বয়সী শিশুর সংখা ১০ হাজার অর্থাৎ প্রতিদিন ১-৪ বছর বয়সী ৩০ জনেরও অধিক শিশু শুধুমাত্র পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে।

২০১৬ সালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, ১-৯ বছরের শিশুর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মারা যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে সাধারণত বসতবাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে অবাঞ্ছিত জলাধারে এবং দিনের প্রথম ভাগে। গ্রামাঞ্চলে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার হার শহরের চেয়ে বেশি, যার কারণ গ্রামে পুকুর আর ডোবার মতো ছোট ছোট জলাধারের সংখ্যা বেশি।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যুরোধে ৩টি কৌশল সবচেয়ে কার্যকরী। এগুলো হচ্ছে কম বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শিশু সেন্টার বা দিবাযতœ কেন্দ্র তৈরি করা। পানিতে ডুবে মরা থেকে বাঁচাতে ১০ বছরের শিশুর সাঁতার শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং শিশুমৃত্যু কমাতে জনগণ ও বাবা-মাকে সচেতন করা।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত