‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশে’র সুবর্ণজয়ন্তী স্মরণ করলেন আয়োজকদের উত্তরসূরিরা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ০১:৫৩ এএম

নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট হয়েছিল  ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এই কনসার্টের সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তকে স্মরণ করেছেন সেই আয়োজনের মূল দুই উদ্যোক্তা সংগীত তারকা রবি শঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের উত্তরসূরিরা। হ্যারিসনের আমন্ত্রণে সেই কনসার্টে অংশ নেন বব ডিলান, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল ও গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটনসহ আরও অনেকে। সেই কনসার্ট থেকেই বাংলাদেশের নাম রাতারাতি পৌঁছে যায় পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে।

সেই কনসার্টের একটি ভিডিওর অংশ টুইটারে পোস্ট করে রবি শঙ্করের মেয়ে সুরকার ও সেতারবাদক আনুশকা শঙ্কর এক টুইটে লিখেছেন, “৫০ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলাদেশের জরুরি ত্রাণ সহায়তার জন্য বাবা ও জর্জ হ্যারিসন কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করেছিলেন। বেনিফিট কনসার্টের যে ধারণা আজ আমাদের মধ্যে রয়েছে, সেই সময় তার মানদণ্ড তারা তৈরি করে দিয়েছিলেন।”

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’র সাত বছর পর জর্জ হ্যারিসন ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী ওলিভিয়া হ্যারিসনের সংসারে জন্ম নেওয়া ধানিও বাবার পথ ধরে সংগীতে মনোনিবেশ করেছেন। যুক্তরাজ্যের পরিচিত গায়ক, সুরকারদের একজন তিনি। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে মারা গেছেন জর্জ হ্যারিসন। ২০১০ সাল থেকে তার উত্তরাধিকারদের পক্ষ থেকে তার নামে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট সচল রাখা হয়েছে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে সেই অ্যাকাউন্ট থেকেও বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করা হয়েছে।

রোববার এক টুইটে লেখা হয়, “৫০ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলাদেশের জরুরি ত্রাণ সহায়তায় অর্থ সংগ্রহের জন্য জর্জ হ্যারিসন ও রবি শঙ্কর কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করেছিলেন। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সঙ্গে সেই লিগ্যাসি আজও অব্যাহত আছে।”

সেই বেনিফিট কনসার্ট থেকে পাওয়া অর্থ একটি চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয় জাতিসংঘ শিশু তহবিলে (ইউনিসেফ)। দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ ডলার ৫০ সেন্টের ওই চেকের একটি অংশে লেখা ছিল ‘বাংলাদেশের শরণার্থী শিশুদের ত্রাণের জন্য’।

এ ছাড়া ক্যাপিটাল রেকর্ডস কনসার্ট ফর বাংলাদেশ লাইভ অ্যালবামের আগাম বিক্রি বাবদ ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের আরেকটি চেক অ্যাপলকে দেয়। পরে অ্যালবাম বিক্রি থেকে আরও অর্থ আসে।

কিন্তু ওই কনসার্ট যে দাতব্য উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তা আগে থেকে নিবন্ধন না করায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর অব্যাহতি দিতে অস্বীকার করে। ফলে ওই টাকার একটি বড় অংশ ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকে।

১৯৭২ সালে ইউনিসেফের মাধ্যমে ২০ লাখ ডলার শরণার্থীদের কাছে পৌঁছায়। আর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের মত বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল।

সত্তরের দশকের শুরুতে বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের ওই সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের অংশগ্রহণে সেই কনসার্ট বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজনে একাত্তরের পুরো জুন আর জুলাইয়ের অর্ধেক সময় বিভিন্ন শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাটান জর্জ হ্যারিসন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পীদের একজন বব ডিলান কনসার্টে অংশ নিতে সম্মত হন। প্রাক্তন বিটলস সদস্য রিঙ্গো স্টারও রাজি হন কনসার্টে অংশ নিতে। এগিয়ে আসেন আরও দুই বিখ্যাত মার্কিন গায়ক বিলি প্রেস্টন ও লিওন রাসেল এবং তখনকার দিনের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটন। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ব্যাডফিঙ্গার, জার্মান মিউজিশিয়ান ক্লাউস ভুরম্যান, মার্কিন ড্রামার জিম কেল্টনার, জিম হর্নসের নেতৃত্বে ‘হলিউড হর্নস’ দলের সদস্যরা, গিটারিস্ট জেসি এড ডেভিস, কার্ল রেডল এবং আরও অনেক শিল্পী অংশ নেন বাংলাদেশের জন্য কনসার্টে। আর কনসার্টের প্রথম অংশে ভারতীয় সংগীতপর্বে রবি শঙ্করের সঙ্গে অংশ নেন বিখ্যাত দুই ভারতীয় শিল্পী, ওস্তাদ আলী আকবর খান আর আল্লাহ রাখা। কনসার্টের বিকেলের ভাগের শেষ গানটি ছিল জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’। ওই গানের শুরুর কথায় পণ্ডিত রবি শঙ্করের সঙ্গে তার কথোপকথনটিই যেন ফুটে ওঠে। ৪০ হাজার দর্শকের সামনে জর্জ হ্যারিসন গেয়ে ওঠেন-“মাই ফ্রেন্ড কেইম টু মি, উইদ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ;/টোল্ড মি দ্যাট হি ওয়ান্টেড হেল্প, বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাইজ।/অলদো আই কুডন্ট ফিল দ্য পেইন, আই নিউ আই হ্যাড টু ট্রাই;/ নাউ আই অ্যাম আসকিং অল অব ইউ টু হেল্প আস সেইভ সাম লাইভস।/বাংলাদেশ বাংলাদেশ...”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত