করোনা মহামারীর মধ্যেই নিও-নরমাল বা ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি মেনে নিয়ে গত বছরের শেষ দিকে অর্থনীতির চাকা আবার সচল হতে শুরু করেছিল বলে বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ পণ্য আমদানি হয়। রপ্তানিও বেড়েছে, তবে করোনাপূর্ববর্তী অবস্থানে এখনো ফেরেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই অর্থবছরটিতে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। এই ঘাটতি অতীতের যে কোনো সময়ের থেকে বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ লেনদেন ভারসাম্য সারণির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ২ হাজার ২৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। এত বড় ঘাটতি আর কখনো দেখা যায়নি। এর আগে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১৭-১৮ অর্থবছরে, ১ হাজার ৮১৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
এত বড় ঘাটতির কারণ, আলোচিত অর্থবছরে পণ্য আমদানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৮ কোটি ডলার। এত বেশি আমদানি এর আগে কখনো হয়নি। অন্যদিকে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ আয় করে ৩ হাজার ৭৮৮ কোটি ডলার।
২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি খাত থেকে আয় হয় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি ডলার। আমদানি ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬৯ কোটি ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ডলার। সেই হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে করোনাভাইরাস নামে নতুন ধরনের একটি ভাইরাসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, যা বিশ্বব্যপী দ্রুত মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা করা হয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়লেও বিশ্ববাণিজ্য স্তিমিত হয়ে আসতে শুরু করে আরও ১-২ মাস আগে থেকে। ফলে ওই বছর ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নামে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা মহামারীর শুরুর সময়টা নিয়ে মানুষ যতটা আতঙ্কিত ছিল, এখন ততটা নেই। যে কারণে করোনার মধ্যেও কারখানা খোলা রাখা হচ্ছে। তাছাড়া ভ্যাকসিনও ব্যাপকহারে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতির চাকা আগের মতো স্তিমিত হয়ে পড়ছে না। এবারের আমদানি-রপ্তানি উভয় খাতেই ভালো প্রবৃদ্ধি সে কথাই বলছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫.৩৮ শতাংশ এবং আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৭১ শতাংশ। এ সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহও চাঙ্গা ছিল। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৬.১১ শতাংশ।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও আমদানি বৃদ্ধিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানির পেছনে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে সেই অনুযায়ী দেশে পণ্য এসে থাকলে তা অবশ্যই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। কেননা, এসব পণ্য শেষ পর্যন্ত মানুষের ভোগে কাজে লাগবে। জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নে কাজে লাগবে।’
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। বীমা, ভ্রমণ প্রভৃতি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। করোনাকালে মানুষ ভ্রমণ কম করেছে। তবে অনলাইনে বিদেশে লেখাপড়ার ফি, ভিডিও স্ট্রিমিং সেবার ফিসহ যাবতীয় সেবা খাতের ব্যয় বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের এই ঘাটতি ছিল ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
মহামারীর মধ্যেও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ বেড়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে ৩৫০ কোটি ১০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। এর আগের অর্থবছরে এফডিআই ছিল ৩২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। সরাসরি আলোচিত সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগও আগের বছরের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৭ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ১২৭ কোটি ডলার।
করোনায় বৈশ্বিক অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) টান পড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথম ৯ মাস অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচক উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু এপ্রিল থেকে ঘাটতি (ঋণাত্মক) দেখা দেয়। অর্থবছর শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩৮০ কোটি ডলার।
এদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে সার্বিক ব্যালেন্স ৯২৭ কোটি ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত ধরে রাখে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১৭ কোটি ডলার। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না।
দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) ঋণাত্মক অবস্থায় অর্থবছর শেষ হয়েছে। গত অর্থবছর শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২৭ কোটি ডলার। তার আগের অর্থবছরের শেয়ারবাজারে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
