চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১২ জন। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে পাকা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তেলিখাড়ি ঘাট এলাকায় বজ্রপাতে এ ঘটনা ঘটে।
বিয়ের তিন দিন পর উত্তাল পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে বরপক্ষের লোকজন কনের বাড়ি থেকে বর ও কনেকে আনতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতের শিকার হন। এ ঘটনার পর বরের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সূর্যনারায়ণপুর গ্রামজুড়ে চলছে শোকের মাতম।
এদিকে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে দুই জেলে নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুই জেলে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কারপাশা ইউনিয়নের শহরমূল গ্রামসংলগ্ন বড় হাওরে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাকিব আল রাব্বী ও নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল সকালে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের শরিফুল ইসলাম পাচু তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে নৌকায় চড়ে নতুন বউসহ ছেলেকে আনতে যাচ্ছিলেন শিবগঞ্জের পাকা ইউনিয়নের তেররশিয়া গ্রামে। দুর্গম চরাঞ্চলের সূর্যনারায়ণপুর থেকে প্রায় ৪০ জন যাত্রীবাহী নৌকাটি উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে তেররশিয়া যাওয়ার পথে পাকা ইউনিয়নের তেলিখাড়ি ঘাটের কাছে পৌঁছালে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। দ্রুত নৌকাটি তীরে ভিড়িয়ে যাত্রীরা আশ্রয় নেন ঘাটের ওপরে একটি ঘরের মধ্যে। সেখানে বজ্রপাত হলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নৌকাটির যাত্রীদের ৩০ থেকে ৩২ জন। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৬ জন।
নিহতরা হলেন পাকা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাকা তেররশিয়া গ্রামের প্রয়াত সোহবুল হকের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৬০), সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের ডালপাড়ার সৈয়দ আলীর ছেলে তোবজুল (৭০), তোবজুলের স্ত্রী জমিলা (৫৮), ছেলে সাদল আলী (৩৫), জামালের মেয়ে লেচন (৫০), রফিকুলের ছেলে বাবলু (২৬), বাদলের ছেলে বাবু (২০), একই উপজেলার সূর্যনারায়ণপুরের ধুলু মিয়ার ছেলে সজীব (২২), সাহালাল বাবুর স্ত্রী মৌসুমী (২৫), কালুর ছেলে আলম (৪৮), মোস্তফার ছেলে পাতু (৪০), চর সূর্যনারায়ণপুরের টিপুর স্ত্রী বেবি (৩২), ফাটাপাড়া গ্রামের সাদিকুলের স্ত্রী টকি বেগম (৩০), চর বাগডাঙ্গা গোঠাপাড়ার সাত্তারের ছেলে সহবুল (৩০), বাবুডাইং এলাকার মকবুলের ছেলে টিপু সুলতান (৪৫) ও সুন্দরপুর এলাকার সেরাজুলের ছেলে অসিকুল ইসলাম ডাকু (২৪)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক সাহেব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝে নৌকার যাত্রীরা দুর্ঘটনার শিকার হলে আমাদের খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে শিবগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মিলে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি। সেখান থেকে ১৪ থেকে ১৫ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসাপাতালে পাঠাই, আর ১৬ জনকে নিহত অবস্থায় উদ্ধার করি। নিহতদের কয়েকজনের মরদেহ তাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে যায়, বাকিগুলো হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মমিনুর হক জানান, ফায়ার সার্ভিস সদস্য ও স্থানীয় লোকজন মিলে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তারা হাসপাতালে ৭ জনের মরদেহ ও আহত ১২ জনকে নিয়ে আসেন। এর মধ্যে ১১ জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাকি একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বজ্রপাতে একসঙ্গে ১৬ জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে পাকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেররশিয়া গ্রামের হোসেন আলীর মেয়ে সেমি আরা খাতুনের সঙ্গে সূর্যনারায়ণপুরের শরিফুল ইসলাম পাচুর ছেলে মামুনের বিয়ে হয় ১ আগস্ট। বিয়ের পর নতুন জামাই ও মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন হোসেন আলী। আজ (গতকাল বুধবার) আবার তাদের ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সেমি আরার আর যাওয়া হলো না।’
একসঙ্গে ১৬ জনের মৃত্যুর পর সূর্যনারায়ণপুর গ্রামজুড়ে শোকের মাতম চলছে জানিয়ে নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোমিন শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা। একসঙ্গে এত লাশ! সূর্যনারায়ণপুরজুড়ে চলছে শোকের মাতম।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র চার দিন আগে মামুনের বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ ও ছেলেকে আনতে আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন শরিফুল ইসলাম পাচু। কিন্তু বাড়ি ফিরলেন আপন ভাই, শ্বশুর, শ্যালক, জামাইসহ অনেকের সঙ্গে লাশ হয়ে। ঘটনাটি বড়ই মর্মান্তিক।’
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় সাংসদ ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুল ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সব দায়িত্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন নিয়েছে।
শিবগঞ্জের ইউএনও সাবিক আল রাব্বী জানান, তেররশিয়া গ্রামের মাঝি রফিকুল ইসলামের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আর সদর উপজেলার ইউএনও ইফফাত জাহান জানান, প্রাথমিকভাবে নারায়ণপুরের নিহত দুজনের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকিদেরও অর্থ সহায়তা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বজ্রপাতে আহত ১২ জনের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় জেলা প্রশসানের পক্ষ থেকে বহন করা হবে। নিহতদের পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’
নিকলীতে বজ্রপাতে দুজন নিহত: কিশোরগঞ্জের নিকলীতে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত দুই জেলে হলেন জলহু মিয়া (৫০) ও শফিকুল (৩৫)। আর আহত দুজন হলেন কামরুল (৩৫) ও মোতালেব (৪৫)।
নিহত দুজনের মধ্যে জলহু মিয়া নিকলীর কারপাশা ইউনিয়নের শহরমূল আউলিয়াভিটা গ্রামের প্রয়াত আসলাম উদ্দিনের ছেলে এবং শফিকুল একই ইউনিয়নের শহরমূল গাছগড়িয়া হাটির খেলু মিয়ার ছেলে।
গ্রামবাসী জানান, গত মঙ্গলবার রাতে ১০ জন জেলের একটি দল নৌকা নিয়ে নিকলী ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বড় হাওরে বেড়জাল দিয়ে মাছ ধরতে যায়। রাত ১টার দিকে বৃষ্টিপাতের মধ্যে দলটির কেউ নৌকায় আবার কেউ হাওরের পানি থেকে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক জলহু মিয়া ও শফিকুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
