অলস টাকা তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১১:১৯ পিএম

বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বিল’ নিলামের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী সোমবার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে এই নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন ৭ ও ১৪ দিন মেয়াদের বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলাম হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের এই নিলামের তথ্য অবগত করে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিলামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বাংলাদেশ নিবাসী সব ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিড দাখিল করতে পারবেন।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাব পরিচালনাকারী যেকোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বা তাদের ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গ্রাহকদের পক্ষে বিড দাখিল করতে পারবেন। প্রতি ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের (ফেসভ্যালু) জন্য ডিসকাউন্টে বিলের প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য উল্লেখসহ মোট অভিহিত মূল্য উদ্ধৃত করে ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় নিলামের দিন দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত এমআই মডিউলয়ের মাধ্যমে বিড দাখিল করতে হবে। একই দিনে নিলাম অনুষ্ঠিত হবে এবং নিলাম ফলাফল দুপুর ২টার মধ্যে ঘোষিত হবে। নিলামে অংশগ্রহণের বিশদ পদ্ধতিগত নির্দেশনা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জানতে পারবেন আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা।

এরপর ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিল নিলামেরও লক্ষ্য রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ১১ আগস্ট বুধবার ৩০ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলামের দিন ধার্য রয়েছে। এ ছাড়া, ১৬ আগস্ট ৭ ও ১৪ দিন মেয়াদি, ২৩ আগস্ট ৩০ দিন মেয়াদি, ২৫ আগস্ট ৭ ও ১৪ দিন মেয়াদি ও ৩১ আগস্ট ৩০ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলামের দিন ধার্য করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত তারল্য আর্থিক খাতে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিল নিলামের মাধ্যমে এই টাকা তুলে নিলে এ সমস্যা লাঘব হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ঠিক কত টাকা তুলে নেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারণ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ সর্বশেষ ব্যাংকগুলো থেকে এভাবে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল।

গত ২৯ জুলাই চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, অতিরিক্ত তারল্য আর্থিক খাতে বুদ্বুদ তৈরি করলে তা তুলে নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। অতিরিক্ত তারল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি বা সম্পদের দাম বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নীতি গ্রহণ করে; যা তাদের নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার মধ্যে প্রবাসী আয় যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত আছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার কোটি টাকা একেবারেই অলস টাকা। বাকি টাকায় কেনা হয়েছে বিভিন্ন বিল ও বন্ড। অনেক ব্যাংক এই অলস টাকা ব্যবহারের উপায় খুঁজছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে এই বিল বিক্রি করে বাজার থেকে অতিরিক্ত টাকা তুলে নেবে এবং এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো মুনাফা পাবে।

নিলামে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া হার অনুযায়ী বিলের মুনাফা নির্ধারণ হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, যে ব্যাংকের কাছে বেশি অলস টাকা আছে, সেই ব্যাংক চাইবে তুলনামূলক কম মুনাফা পেলেও বিল কিনে কিছু টাকা মুনাফা পেতে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য (সিআরআর) সংরক্ষণের পর গত জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর অলস পড়ে আছে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অলস এ অর্থের বিপরীতে কোনো সুদ পায় না ব্যাংক। জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর বাজারে তারল্য বাড়াতে নানা নীতিসহায়তা দিলেও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। যে কারণে ব্যাংকে অলস টাকা বাড়ছে। সাধারণভাবে সিআরআর সংরক্ষণের পর ব্যাংকগুলোর ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা অলস থাকে। গত বছরের জুন শেষে তা ২৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা হয়। সম্প্রতি ঘোষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সিআরআরের অতিরিক্ত রিজার্ভ গত এক বছরে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের মোট দায়ের একটি অংশ বিধিবদ্ধ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। এর মধ্যে বর্তমানে নগদে রাখতে হয় সাড়ে ৪ শতাংশ, যা সিআরআর হিসেবে বিবেচিত। করোনা শুরুর আগে গত বছরও সাড়ে ৫ শতাংশ সিআরআর রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বিভিন্ন বিল ও বন্ডের বিপরীতে বিধিবদ্ধ তারল্য বা এসএলআর রাখতে হচ্ছে আগের মতোই ১৩ শতাংশ।

উদ্বৃত্ত তারল্যের মধ্যে সিআরআরে থাকা অলস অংশ বাদে বাকি অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হিসেবে থাকে। এ টাকা সরকারকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অর্থ থাকায় সুদহার অনেক কমেছে। আন্তঃব্যাংক কলমানিতে গড় সুদহার এক বছর আগের ৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে গত জুনে ২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে। ব্যাংক খাতের আমানতের গড় সুদহার নেমেছে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশে। ঋণের গড় সুদহার ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত