চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) মশক নিধনে ফগার মেশিন দিয়ে যে লিকুইড এডালটিসাইড (ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন ও ডেল্টামোথ্রিনের মিকশ্চার) কীটনাশক ও মশার লার্ভা নিধনে স্প্রে দিয়ে যে লার্ভিসাইড (এম ফস ২০ ইসি-ক্লোরপাইরিফস) ব্যবহার করে সেটি অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এমনকি নগরীতে ১৫টি এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিশ মশার বিস্তারেরও প্রমাণ পায়। চসিক কর্তৃপক্ষের অনুরোধে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের গঠিত একটি টেকনিক্যাল টিমের গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে।
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের এ গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক দিন পরই খোদ সিটি করপোরেশনই গত বুধবার এ ‘অকার্যকর’ ওষুধ দিয়েই মশক নিধনে নগরীতে মাসব্যাপী বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে। চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী নগরীর শুলকবহর ওয়ার্ডে এই ক্রাশ প্রোগ্রামের উদ্বোধন করেছেন।
‘অকার্যকর’ ওষুধ দিয়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম উদ্বোধন করা প্রসঙ্গে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণাপত্রটি আমাদের জমা দিয়েছেন। সেখানে নগরীর ১৫টি এলাকায় এডিস মশার বিস্তার পাওয়া গেছে। তাছাড়া নগরীতে মশার উপদ্রব বেশি। তাই মশার ওষুধ ছিটানো জরুরি। মশার লার্ভা নিধনে এখন লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হবে। ইতিমধ্যে কার্যকরী লিকুইড এডালটিসাইড ওষুধ অর্ডার দেওয়া হয়েছে। সেগুলো দুই-তিন দিনের মধ্যে আসবে। নতুন ফগার মেশিনও কেনা হয়েছে। মশক নিধনে দেড় হাজার সেবককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রোস্টার অনুসারে পুরো নগরীর ৪১ ওয়ার্ড জুড়ে মশার ওষুধ ছিটানো হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধে নগরবাসীকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। জমাট পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গুর লার্ভা ছড়ায়। তাই নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় যেখানে জমাট পানি আছে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নগরীতে ফগার মেশিন দিয়ে যে লিকুইড এডালটিসাইড প্রয়োগ করা হয়, তা প্রয়োগের দুই ঘণ্টা পর মাত্র ১৯ শতাংশ মশা মারা যায়। একইভাবে স্প্রে দিয়ে লার্ভিসাইড ছিটানোর দুই ঘণ্টা পর লার্ভার মৃত্যুহার মাত্র ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মশক নিধনে চসিক দীর্ঘদিন ধরে যেসব কীটনাশক প্রয়োগ করে আসছে তা অনেকটা অকার্যকর।
এদিকে চসিকের নবনির্বাচিত মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর মশক নিধন কার্যক্রমের উদ্যোগ নেন। পরে মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সিটি মেয়র ব্যবহৃত এই কীটনাশক পরীক্ষা করার জন্য চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরিন আখতারকে অনুরোধ করেন। পরে চবির পক্ষ থেকে গবেষণার জন্য গত ১৩ এপ্রিল চসিকের কাছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার বাজেট দেওয়া হয়। গত ২২ জুন বাজেটের অর্থ পরিশোধ করে চসিক। এরপর ৫ জুলাই থেকে গবেষণা শুরু করে চবির গবেষক দল। পরবর্তীকালে টানা ২৫ দিন নগরীর ৯৯টি এলাকা পরিদর্শন করে নগরীর ৫১টি এবং চবির ৬টি স্থান থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদনেই নগরীর ১৫টি এলাকায় এডিসের মশার বিস্তার পাওয়া যায়।
গবেষণা প্রতিবেদনে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প হিসেবে জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে নালা-নর্দমায় মাছ চাষের মাধ্যমে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, অণুজীব ও উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করে লার্ভা ধ্বংস করারও সুপারিশ করা হয়।
নগরীর যে ১৫ এলাকায় এডিস মশার বিস্তার বেশি সে এলাকাগুলো হচ্ছে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা (মসজিদের পাশে), ফরিদারপাড়া, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, ডিসি রোড বাদশা সওদাগর বাড়ি, ডিসি রোড তুষার কলোনি, রেলওয়ে কলোনি কাস্টম সদরঘাট, পশ্চিম মাদারবাড়ী মাঝিরঘাট রোড, আমবাগান বাস্তুহারা কলোনি, সেগুনবাগান রেলওয়ে কলোনি, পাহাড়তলী দুলালাবাদ সিডিএ মার্কেট, সাগরিকা স্টেডিয়াম রোডসংলগ্ন জেলেপাড়া, দক্ষিণ কাট্টলী রূপালী আবাসিক এলাকা, হালিশহর এ-ব্লক এবং দক্ষিণ কাট্টলী ফইল্যাতলী বাজার।
