পরীমণির ৬ সহযোগীর খোঁজে গোয়েন্দারা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২১, ০১:৫৫ এএম

আলোচিত-সমালোচিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শামসুন নাহার ওরফে পরীমণিকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুই নারীসহ তার ছয় সহযোগীকে খুঁজছে গোয়েন্দারা। তারা ‘প্লেজার ট্যুর’-এর ক্লায়েন্ট জোগাড় ও ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইলিংসহ পরীমণির বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের সহযোগী ছিল বলে ভাষ্য তদন্তকারীদের। একই সঙ্গে পরীমণির আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা। যারা ইতিমধ্যে নজরদারির আওতায় রয়েছেন। সবুজ সংকেত মিললেই যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে তাদের।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পরীমণির দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে অন্তত তিনজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর বাইরে পরীমণিকে এলএসডি ও আইসের মতো ভয়ংকর সব মাদক সরবরাহকারী একাধিক চক্রকে চিহ্নিত করতে গোয়েন্দারা নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে পরীমণি, কথিত মডেল ফারিহা মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌ এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের পর রাজধানীর অপরাধজগতে চলছে তোলপাড়। কারণ গ্রেপ্তার এসব ব্যক্তির সঙ্গে ইতিমধ্যে রাজধানীর অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রকদের ঘনিষ্ঠতার তথ্য মিলেছে। তদন্তকারীদের সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে সন্ত্রাসীদের নাম বলে দিয়েছেন গ্রেপ্তাররা। এমন পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার হতে পারেন আতঙ্কে তারা নিজেদের গুটিয়ে ফেলছেন। পিয়াসার পাশাপাশি পরীমণির সঙ্গে অন্তত ডজনখানেক সন্ত্রাসীর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

পরীমণি ও রাজসহ চারজনকে রিমান্ডে নেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকাজ গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দেওয়া হয়। হঠাৎ করে গতকাল শুক্রবার বিকেলে এসব মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশে চলছে কানাঘুষা।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, পরীমণি, প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ, কথিত মডেল মৌ-পিয়াসা এবং মিশুক ও জিসান গ্রেপ্তারের পর রাজধানীর অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িতরা গা-ঢাকা দিতে শুরু করেছেন। থমকে গেছে আলো-আধারিতে ডিজে পার্টি এবং মদ-সিসার জমজমাট আসর। প্রভাবশালী যেসব ব্যক্তি এতদিন পরীমণিসহ তাদের চক্রের অন্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন তারা এখন নিজেদের আড়াল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ডিবি ও র‌্যাবের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পরীমণি সিন্ডিকেটের অপরাধজগতের একাধিক গডফাদারের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। কোনো ঘটনায় তারা বিপাকে পড়লে ওই গডফাদারদের ব্যবহার করত। ব্ল্যাকমেইলের শিকার কেউ জাল থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে এই গডফাদারদের মাধ্যমে হুমকিধমকি দেওয়া হতো। এ কাজ থেকে আদায় করা অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিত।

তদন্তকারীরা জানান, উঠতি বয়সী তরুণীদের দিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত ৩ আগস্ট মিশুক ও জিসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরীমণি ও রাজকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ পরিস্থিতিতে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় আবার নতুন করে কাদের গ্রেপ্তার করা হয়Ñ এমন আতঙ্কে সংশ্লিষ্ট সবাই এখন সতর্ক। এরই মধ্যে অনেকে বাসাবাড়ি ও আড্ডাস্থল ছেড়ে অন্যত্র গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ডিবি-উত্তর) হারুন অর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীমণির অন্যতম সহযোগী জিমির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া আরও কয়েকজনকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পিয়াসা ও মৌকে আবারও চার দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরীমণিকে আমরা কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তার কাছ থেকেও বেশকিছু তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। পিয়াসা ও মৌয়ের কাছ থেকে প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পরীমণি যেসব অবৈধ কাজ ও ব্যবসা করতেন, সেগুলো কাদের নিয়ে করতেন, কাদের সহযোগিতায় করতেন, কারা তার নেপথ্যে রয়েছে, আমরা তাদের নাম পেয়েছি। তার বক্তব্য নোট করছি। যারাই তার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদেরই গ্রেপ্তার করা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সমাজে যারা অবৈধভাবে টাকা আয় করে বিত্তশালী হয়েছেন, তাদের সন্তানরা এসব অবৈধ পার্টিতে যাচ্ছেন এবং নীতিবহির্ভূত কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। সমাজের তথাকথিত বিত্তশালী, যারা মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

ডিবি থেকে তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিতে : পরীমণির বিরুদ্ধে মাদক মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তা সিআইডিতে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, কৌশলগত কারণে শুধু এ মামলাটিই নয়, পরীমণি ও রাজসহ অন্যদের বিরুদ্ধে করা সাতটি মামলাই সিআইডি তদন্ত করবে। অথচ গতকাল সকালে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আযম মিয়া জানিয়েছিলেন, পরীমণি ও রাজসহ অন্যদের বিরুদ্ধে করা মাদক মামলা ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসামি ও মামলার ডকেট ডিবি পুলিশকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে রাজের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনের মামলাটি বনানী থানা পুলিশ তদন্ত করবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডে ডিবি হেফাজতে পরীমণি বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন। তাকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা কে কখন কতদিনের ‘প্লেজার ট্যুর’-এ গেছেন সে সম্পর্কেও যথেষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। তবে চতুর পরীমণি সাধারণ সব প্রশ্নের জবাব দিলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এসব ব্যাপারে তিনি কখনো নিরুত্তর থেকেছেন, আবার কখনো ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আলোচনার ইস্যু পরিবর্তন করার চেষ্টা চালিয়েছেন। কখনো আবার কান্নাকাটি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলেছেন। তবে গোয়েন্দারা সবকিছু সামাল দিয়েই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কৌশলী প্রশ্ন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করে নিচ্ছে। এছাড়া তদন্তের ক্ষেত্রে নানা প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা এসব বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে চাননি।

পরীমণির অন্ধকার জগতে পা দেওয়ার পেছনে দুই নারীর সহযোগিতা রয়েছে দাবি করে ডিবির অন্য এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। সেই নারীকে খোঁজা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমণির সঙ্গে জিমি নামের এক তরুণ গিয়েছিলেন। তার বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। আশা করি, দ্রুত সবাইকে আমরা আইনের আওতায় আনতে পারব। ওই নারীদের মধ্যে একজন বেসরকারি টেলিভিশনে চাকরি করেন।’

পরীমণি ও রাজের ঘরোয়া পার্টিতে কারা কারা আসতেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ডিবি কর্মকর্তা বলেন, ‘নজরুল ইসলাম রাজ তথাকথিত কয়েকজন মডেল দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নজনকে মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতেন। তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি মূলত একজন মূর্খ, পড়ালেখা জানেন না। ঢাকায় এসে তিনি প্রথমে একটি ছোট চাকরি করতেন। পরে যোগাযোগ বাড়িয়ে সমাজের বিত্তশালীদের কাছে তথাকথিত মডেল সাপ্লাই দিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে আমরা অনেক নাম পেয়েছি। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে এ ডিবি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পরীমণি ও পিয়াসাদের বেশি সহায়তা করেছেন। তাদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। গ্রিন সিগন্যাল মিললেই তাদের আনা হবে আইনের আওতায়।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পরীমণির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিয়ে ‘বিশেষ সঙ্গ’ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তার এ কাজে সহযোগিতা করতেন রাজ। রাজই প্রথমে পরীমণিকে কোটিপতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রাজের সঙ্গে মিশু হাসান ও জিসান মিলে ১০ থেকে ১২ জন তরুণী নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তাদের কাজই ছিল উচ্চবিত্ত ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ‘বিশেষ সঙ্গ’ দেওয়া। এর বিনিময়ে তারা অর্থ আয় করতেন। র‌্যাব ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পরীমণি জানিয়েছেন, তার ব্যবহৃত গাড়িটি এক রাজনৈতিক নেতা কিনে দিয়েছিলেন। রাজ তাকে ওই রাজনীতিকের বাসায় নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ওই নেতার সঙ্গে দুবাই ভ্রমণে যান তিনি। এছাড়া বিদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে পরীমণির যোগসূত্র ঘটিয়ে দেওয়ার কাজ করতেন তুহিন সিদ্দিকী অমি। গ্রেপ্তারের পর পরীমণির মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও শিল্পপতির সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং বিশেষ সম্পর্ক থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরীমণির সঙ্গে অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারী সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া অনেক রাজনীতিকের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল তার। অনেক সন্ত্রাসীকেও অর্থের বিনিময়ে ‘বিশেষ সঙ্গ’ দিতেন তিনি। কয়েকজন রাজনীতিক নেতা তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত