মহামারীর বাস্তবতায় ভিন্ন অলিম্পিক

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২১, ১২:২০ এএম

অলিম্পিককে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। শক্তি, বুদ্ধি, প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মোৎসর্গের চূড়ান্ত উৎকর্ষ দেখার সুযোগ ঘটে এই আয়োজনে। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলমান কভিড-১৯ পরিস্থিতি। এ কারণে টোকিও ২০২০ অলিম্পিক অন্য অলিম্পিক থেকে ভিন্ন। লিখেছেন বিপুল জামান

নাম নিয়ে বিতর্ক

টোকিও অলিম্পিক নানান কারণেই এশিয়া মহাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ার কোনো শহর এই প্রথম দ্বিতীয়বারের মতো গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ পেল। শুরু থেকে এই আয়োজনের নামকরণ করা হয় ‘টোকিও ২০২০’। আয়োজনটির সময় নির্ধারিত হয় ২০২০ সালের ২৪ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর উহানে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্তের মাধ্যমে বিশ্ব প্রবেশ করে করোনা পরিস্থিতিতে। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রথম বোঝা যায় এই ভাইরাসের সংক্রমণের গতি ও মারণ ক্ষমতা। একে একে আক্রান্ত হয় চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের অন্যান্য দেশ। স্বভাবতই অলিম্পিক গেমসের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এদিকে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশ তাদের খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে টোকিও ২০২০ অলিম্পিক স্থগিত করার আহ্বান জানায়। ১৮৯৬ সালে শুরু হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এ পর্যন্ত মোট তিনবার স্থগিত হয়েছে। তিনবারই স্থগিত হয়েছে বিশ্বযুদ্ধের কারণে। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি জাপান অলিম্পিক কমিটির সঙ্গে আলোচনা গত বছর টোকিও ২০২০ অলিম্পিক সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এই আয়োজনের সঙ্গে জাপানসহ অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজার ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্থগিত অলিম্পিক গেমস ভিন্ন সময়ে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, আগে যে তিনবার অলিম্পিক গেমস স্থগিত হয়েছিল তা পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়নি। সেদিক থেকে নতুন বাস্তবতার এই অলিম্পিক একটি ইতিহাস সৃষ্টি করল। অলিম্পিক উপলক্ষে বিশাল বিনিয়োগ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেলে রাখা সম্ভবপর নয় জানিয়ে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে, জাপান পরবর্তী (২০২১) গ্রীষ্মকালের পরেও এই স্থগিতাদেশ বহন করে যেতে পারে না।’ ফলে স্থগিত টোকিও ২০২০ অলিম্পিক উপযাপনের সময় নির্ধারিত হয় ২০২১ সালের গ্রীষ্মে। নামকরণ সংক্রান্তের জটিলতার শুরু হয় এখান থেকেই।

সাধারণত যে বছরে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয় সে বছরকে কেন্দ্র করে অলিম্পিকের নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন, সিডনি ২০০০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ইত্যাদি। কিন্তু এবারের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হলেও নামটা কিন্তু টোকিও ২০২০-ই থাকছে। জাপানে টোকিও ২০২০ নাম সংবলিত স্যুভেনির কেনাবেচা শুরু হয়েছে ২০১৫ সাল থেকে।  টোকিও ২০২০ এর পরিবর্তে টোকিও ২০২১ নামকরণ শুধু শূন্য (০) এর পরিবর্তে এক (১) লেখা-ই নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাই এবারের অলিম্পিক যদিও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২১ সালে তবু টোকিও ২০২০ নামটিই অপরিবর্তিত থাকছে।

শরীরী স্পর্শ নেই

খোদ জাপানেই অলিম্পিক উদযাপনের বিরোধিতা হয়েছে। দেশটির নাগরিকদের আশঙ্কা অলিম্পিকের ফলে কভিড-১৯ সংক্রমণের হার আরও বেড়ে যাবে। একদিকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্বিগ্ন জনগণের চাপ দুইয়ে মিলে জাপানি অলিম্পিক কমিটি এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে নতুন বাস্তবতার অলিম্পিকের জন্য কিছু নিয়ম জারি করতে হয়েছে।

যে শহরে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয় তাকে সাধারণত ‘অলিম্পিক ভিলেজ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। অলিম্পিক ভিলেজে সমবেত হন নানা দেশের খেলোয়াড়, দর্শক, অতিথি। তারা শারীরিক কসরত উপভোগের পাশাপাশি স্বাগতিক দেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, খাদ্য গ্রহণ এবং সে দেশের জীবনকে যাপন করে থাকেন। কিন্তু কভিড-১৯ এর জন্য সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন খেলোয়াড়, দর্শক, অতিথিরা। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হলেও থাকছে না গ্যালারিতে কোনো দর্শক। ফলে বিভিন্ন দেশের দর্শক ও অতিথিরা এবারের অলিম্পিকের স্বাগতিক দেশ জাপানকে ঘুরে ফিরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। খেলোয়াড়রাও বের হতে পারছেন না তাদের হোটেল থেকে, অনুশীলনের সময় ছাড়া। কেনাকাটা বা ঘোরাফেরার সুযোগ তাদেরও নেই। খেলা চলাকালীনও বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকছে। ভক্ত, অনুসারীদের সঙ্গে হাত মেলানো বা আলিঙ্গনের বিষয়ে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সহ-খেলোয়াড় বা প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন বা আলিঙ্গনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে খেলা চলাকালে। বিশেষ করে দলীয় খেলাতে এই নিয়ম মেনে চলার চিত্র তেমন দেখা যাচ্ছে না।

পদক প্রদান অনুষ্ঠানেও রয়েছে কভিড-১৯ পরবর্তী নতুন বাস্তবতার ছোঁয়া। আগের অলিম্পিক গেমসের বিজয়ীদের পদক গলায় পরিয়ে দিতেন বিশিষ্ট অতিথিরা। এবারে তার ব্যত্যয় ঘটছে। এবার গ্লাভস পরে প্যাকেটজাত পদক বের করে তা একটি ট্রে-তে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিজয়ী খেলোয়াড়ের কাছে। খেলোয়াড় নিজে পদক ট্রে থেকে তুলে নিয়ে গলায় পরছেন, ট্রে থেকে ফুলের তোড়া তুলে নিচ্ছেন। এ সময় কোনো কোনো খেলোয়াড়কে মাস্ক পরে থাকতে দেখা যাচ্ছে, আবার অনেকেই মাস্কবিহীন মুখে ক্যামেরায় পোজ দিচ্ছেন।

স্বর্ণপদকে কামড় মানা

অলিম্পিক গেমসে বিজয়ীদের স্বর্ণপদকে কামড় দিতে দেখা যায়। শুধু অলিম্পিক গেমসেই না, অন্যান্য প্রতিযোগিতায়ও বিজয়ীকে দেখা যায় স্বর্ণপদকে কামড়াতে। অনেকের মনেই কৌতূহল ‘খেলোয়াড়রা স্বর্ণপদকে কামড় দেয় কেন’। তারা কি মনে করেন পদকের নিচে চকলেট রয়েছে? নাকি এটা একধরনের প্রথা? প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের প্রথা অলিম্পিক কেন, অন্য কোনো প্রতিযোগিতাতেও ছিল বলে জানা যায় না। তবে খেলার সঙ্গে কামড়ের সম্পর্ক না থাকলেও সোনার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে মুদ্রা হিসেবে সোনার প্রচলন ছিল। সোনা নরম হয়ে থাকে। অন্যান্য ধাতব পদার্থের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে স্বর্ণমুদ্রাটিকে শক্ত কাঠামো দেওয়া হতো। কিন্তু ভেজালের পরিমাণ বেশি দিয়ে স্বর্ণমুদ্রাটিকে অবমূল্যায়িত করা হয়েছে কি না তা জানার জন্য স্বর্ণমুদ্রায় কামড় দিয়ে পরীক্ষা করার প্রচলন ছিল। অলিম্পিক গেমসসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত স্বর্ণপদক আকারে বড়সড় স্বর্ণমুদ্রার মতোই দেখতে। সে কারণেই স্বর্ণমুদ্রাকে পরীক্ষা করার ব্যাপারটিকে কৌতুকভরে স্মরণ করতে খেলোয়াড়রা স্বর্ণপদকে কামড় দিয়ে থাকেন। ফটোগ্রাফাররাও তাদের এ ধরনের পোজ দিতে অনুরোধ করে থাকেন।

স্বর্ণপদকে কামড় নিয়েও এবারের অলিম্পিকে ঘটেছে কৌতুককর ঘটনা। নির্দেশনায় বলা হয়েছিল কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে পদকে অন্য কারও স্পর্শ থাকছে না তবু যেন খেলোয়াড়রা পদকে কামড় না দেন। কভিড আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এমন সতর্কতা তা নয়। জাপানি অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছিল যে, এবারের পদকগুলো ধাতব পুনঃব্যবহার পদ্ধতি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে। ফলে সেগুলোতে কামড়ানো খেলোয়াড়দের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সতর্ক হওয়ার কথা বলা হলেও খেলোয়াড়রা কিন্তু বিরত থাকছেন না স্বর্ণপদকে কামড় দেওয়া থেকে। এটি লক্ষ্য করে টোকিও অলিম্পিকের অফিশিয়াল টুইটার পেজে একটা ‘সাবধান বাণী’ পোস্ট করা হয়েছে ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এটা নিশ্চিত করতে চাই যে অলিম্পিকের পদক কোনো খাওয়ার বস্তু নয়।’ বলার অপেক্ষা রাখে না নিতান্ত কৌতুক করেই পোস্টটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে সতর্কতা লক্ষণীয়।

বিশেষ বিছানা

পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে জাপানের সক্রিয়তা অনেক আগে থেকেই। নিজ দেশে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের তারা হাতেকলমে এ সংক্রান্ত শিক্ষা দিয়ে থাকে। সেই জাপানে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হলে সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক কিছু দেখা যাবে সেটাই স্বাভাবিক। ঘটনা ঘটেছেও তাই। অলিম্পিক উপলক্ষে জাপানে আগমন ঘটেছে অগণিত মানুষের। তাদের জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত আবাসনের সুব্যবস্থা। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্রের ব্যবহারকাল খুব অল্পসময়। তারপর এগুলো পরিত্যক্ত হিসেবে পৃথিবীর বোঝা বাড়ায়। এসব বিবেচনা করে জাপানি অলিম্পিক কমিটি অতিথিদের বিছানা, আসবাব তৈরি করে শক্ত কাগজ দিয়ে। এর ফলে অলিম্পিক যজ্ঞ শেষ হলে সহজেই তাকে কাগজের মণ্ডে পরিণত করা যাবে এবং অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে এই উদ্যোগও জন্ম দিয়েছে আলোচনার। প্রথম থেকেই এই ব্যতিক্রমী বিছানার সমালোচনা করা হচ্ছিল এই বলে যে, ‘বিছানা অধিক ভার যেন নিতে না পারে এভাবে তৈরির মাধ্যমে অ্যাথলেটদের মধ্যকার অন্তরঙ্গতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ কিন্তু অলিম্পিক শুরুর আগেই সে গুঞ্জন থামিয়ে দিয়েছেন আইরিশ জিমন্যাস্ট রিস ম্যাকলেনাহান। টুইটারে একটি ভিডিওতে নিজের বিছানায় লাফ দিয়ে দিয়ে ম্যাকলেনাহান জানিয়েছেন, আচমকা নড়াচড়ায় এ বিছানা ভেঙে যায়, এটা ভুয়া খবর। অলিম্পিকের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে এরপর ম্যাকলেনাহানকে ধন্যবাদও দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হননি ইসরায়েলের বেসবল খেলোয়াড় বেন ওয়াঙ্গার। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই বিছানা কতজনের ভার সহ্য করতে পারে তা দেখবেন। আর সেই পরীক্ষা নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশও করেন। ভিডিওর শুরুতে নিজের বিছানায় উঠে লাফ দেন ওয়াঙ্গার। এরপর আরেক অ্যাথলেট এগিয়ে আসেন। দুজন মিলে লাফ দেন বিছানার ওপর। এভাবে ধীরে ধীরে তিন, চার করে অ্যাথলেটরা এসে লাফ দেন বিছানায়। আটজন মিলে লাফ দেওয়ার পর বিছানার পাশে একটু বেঁকে যায়। ওয়াঙ্গাররা তবু থামেননি। নবম সদস্য এসে যোগ দেন। এবার বিছানার চার পাশই নিচু হয়ে যায়। এই পরীক্ষার ফলে প্রমাণ হয়, কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য কাগজের বিছানা তৈরি করেছে অলিম্পিক কমিটি। অন্য কোনো দুরভিসন্ধি তাদের ছিল না।

চারটি নতুন খেলা

এবারের অলিম্পিকের অন্যতম আকর্ষণ হলো চারটি নতুন খেলার শুভ উদ্বোধন। খেলাগুলো হলো কারাতে, স্কেটবোর্ডিং, স্পোর্টস ক্লাইম্বিং এবং সার্ফিং। তরুণদের মধ্যে খেলাগুলোর বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা লক্ষ করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এ সিদ্ধান্ত নেয়। এই পাঁচটি খেলা সংযুক্ত হওয়ার ফলে টোকিও ২০২০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের খেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩।

প্রথমবারের মতো যৌথ স্বর্ণপদক

নতুন বাস্তবতার টোকিও ২০২০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ঘটল অভূতপূর্ব ঘটনা। টোকিও অলিম্পিকে ব্যতিক্রম এক নজির গড়লেন কাতারের মুতাজ ঈসা বারসিম আর ইতালির জিয়ানমার্কো তামবেরি। ১৯১২ অলিম্পিকের ১১৩ বছর পর রবিবার (১ আগস্ট) ফের স্বর্ণপদক ভাগাভাগি দেখল বিশ্ব। উচ্চলাফে তারা ২ দশমিক ৩৭ মিটার উঁচুতে লাফ দিয়েছিলেন। পরবর্তী ধাপ ২ দশমিক ৩৯ মিটার। ঈসা বারশিম ও তামবেরি ২ দশমিক ৩৭ মিটার উঁচুতে লাফ দিলেও আটকে যান ২ দশমিক ৩৯ মিটার লাফ দিতে গিয়ে। তাও আবার দু’জনই আটকে গেছেন তিনবার করে। দু’জনকে কোনোভাবেই আলাদা করা যাচ্ছিল না। নিয়ম অনুসারে, খেলায় সাম্যাবস্থা শেষ না হলে খেলা গড়াবে টাইব্রেকারে। কিন্তু তামবেরির পায়ের চোটের কারণে টাইব্রেকারে অংশ নিতে পারবেন বলে মনে হচ্ছিল না। সহজেই বারশিম ট্রাইবেকারে অংশ নিয়ে পরতে পারতেন স্বর্ণপদক। কিন্তু এটা তার কাছে ভালো মনে হয়নি। তিনি কর্র্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান, ‘আমরা কি দুটি সোনা পেতে পারি? ’ ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। তামবেরির সঙ্গে সোনার পদক ভাগাভাগি করে নিতে কোনো সমস্যাই নেই তার। কর্র্তৃপক্ষও জানালেন, ‘সেটা সম্ভব’। এ সময় জিয়ানমার্কো তামবেরি আনন্দে মুতাজের হাতে হাত মেলান, তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আনন্দে দুবার গড়াগড়ি খেলেন, চিৎকার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হলো নতুন কীর্তি। বারশিম বলেন, ‘আমার কাছে এখানে আসাটা, এখানের পারফরম্যান্সটার পর মনে হয়েছে আমি এই সোনা জেতার যোগ্য। সেও এমন কিছুই করেছে, আর তাই আমিও জানি, সে কম যোগ্য নয়।’ এ কথা থেকেই বোঝা যায় বারশিম তামবেরির পায়ের চোটের সুযোগ নিয়ে জয়ী হতে চাননি। বরং বন্ধুত্ব, সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে স্বর্ণপদক নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন। এটাই অলিম্পিকের সৌন্দর্য। ব্যতিক্রম ঘটেছে তাদের পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানেও। অন্য বিজয়ীরা নিজেরাই গলায় পদক পরলেও তামবেরি ও বারশিম একে অপরকে স্বর্ণপদক পরিয়ে নিজেদের সম্মানিত করেন।

দেশ নেই যে প্রতিযোগীদের

এবার রাশিয়ার অ্যাথলেটরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাননি। ডোপ টেস্ট কেলেঙ্কারিতে এবারের অলিম্পিকে দেশ হিসেবে রাশিয়া রয়েছে নিষিদ্ধের তালিকায়। এ কারণে দেশটির অ্যাথলেটরা রাশিয়ান অলিম্পিক কমিটির পতাকা নিয়ে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করছে।

বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া অ্যাথলেটরাও যেন অলিম্পিকের মতো বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে যেন বঞ্চিত না হয় সেজন্য গঠিত হয়েছে শরণার্থী অলিম্পিক দল। এই দলে রয়েছেন ১১টি দেশের ১২টি খেলার ২৯ জন খেলোয়াড়। অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই দল অলিম্পিক পতাকা বহন করে। এই দলের যে কোনো অ্যাথলেটের পদক লাভে অলিম্পিক পতাকা তোলা হবে এবং অলিম্পিক সংগীত বাজানো হবে।

বাংলাদেশের অলিম্পিক যাত্রা

অংশগ্রহণের ৪০ বছরেও পদক বন্ধ্যত্ব কাটেনি বাংলাদেশের। কোনো পদক ছাড়াই এবারও দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের অ্যাথলিটরা। ছয় অ্যাথলিটের ৩ জনের পারফরম্যান্স ব্যর্থতায় মোড়ানো হলেও, বাকি ৩ অ্যাথলেট নিজেদের ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্স করেছেন এই অলিম্পিকেই। সর্বোচ্চ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করেও পদক লাভ করতে না পারার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরে।

তবে এই অলিম্পিকে বাংলাদেশের নাম কিন্তু স্মরণ করা হচ্ছে শ্রদ্ধার সঙ্গে। ২০১৬ সাল থেকে ‘ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন ও শান্তিতে অনন্য অবদান’-এর জন্য অলিম্পিক লরেল পুরস্কার ঘোষণা করে আসছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। এ বছর তারা দ্বিতীয় অলিম্পিক লরেল গ্রহণকারী হিসেবে পুরস্কৃত করেছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে। তার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যজ্ঞে বাংলাদেশ উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে শ্রদ্ধার সঙ্গে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত