চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহে তীব্র আইসিইউ সংকট

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২১, ০২:০৬ এএম

চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় শয্যা ও আইসিইউ সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। একদিকে অপ্রতুল আইসিইউ শয্যার কারণে নগরীতে যেমন মৃত্যুর হার বাড়ছে, অন্যদিকে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের কারণে নগরীর সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব হাসপাতালেই রোগীর চাপ বেড়ে চলেছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২০৫টি আইসিইউ রয়েছে। প্রত্যেক হাসপাতালে দুয়েকটি ছাড়া বাকি সব সিটে রোগী ভর্তি। যে হারে রোগী বাড়ছে, তাতে শুধু আইসিইউ নয় সাধারণ বেড পাওয়াটাও মুশকিল হবে মনে হচ্ছে। কেননা বর্তমানে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট সবাইকে খুব দ্রুত সংক্রমিত করছে। আর যারা সংক্রমিত হচ্ছেন, তাদের একদম দুর্বল করে ফেলছে। এ ছাড়া ময়মনসিহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালেও তীব্র আইসিইউ সংকটের খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালটিতে ইতিমধ্যে শয্যার প্রায় দেড়গুণ রোগী ভর্তি আছে। ২২ আইসিইউর বেড খালি  নেই একটিও। মমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র মুহিউদ্দিন খান জানিয়েছেন প্রতিদিনই আইসিইউর জন্য অন্তত ১০-১২ জন অপেক্ষায় থাকেন।   

মাসুদ পারভেজ নামে এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার বড় বোনকে নিয়ে খুব বেকায়দায় আছি। উনি বেশ কদিন থেকে অসুস্থ। পাঁচ মাস আগে একবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন সরকারি কোনো হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে পরে অনেক কষ্ট করে পার্কভিউ হসপিটালে ভর্তি ও সুস্থ হয়েছিলেন। গত ১০-১৫ দিন আগে আবার আক্রান্ত হয়েছেন। শারীরিক অবনতি হওয়ায় আইসিইউর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন কোনো সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ খালি পাইনি। পরবর্তীকালে নানা তদবির করে এক সপ্তাহে ওয়েটিংয়ে থেকে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউর সিট পেয়েছি। এখনো অবস্থা তেমন ভালো নয়। এরূপ শুধু মাসুদ পারভেজের বোন নয়; আরও শত শত করোনা আক্রান্ত রোগী আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষায় আছেন। কেউই পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২০৫টি আইসিইউ আছে। প্রত্যেক হাসপাতালে দুয়েকটি ছাড়া বাকি সব সিটে রোগী ভর্তি। রোগী তো বাড়ছেই। যেই হারে রোগী বাড়ছে, তাতে শুধু আইসিইউ নয় সাধারণ বেড পাওয়াও মুশকিল হবে মনে হচ্ছে। কেননা, বর্তমানে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট খুব দ্রুত সংক্রমিত করছে সবাইকে। আর যারা সংক্রমিত হচ্ছেন, তাদের একদম দুর্বল করে ফেলছে। তাই আমাদের সবার উচিত বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানুন। মাস্ক পরুন।

সিভিল সার্জন আরও বলেন, আইসিইউ সংকট শুধু আমাদের দেশে নয়, সব দেশেই আছে। যে পরিমাণ রোগী, সেইরূপ আইসিইউ বেড রাখা তো অসম্ভব।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও জেলা সিভিল সার্জনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বিআইটিআইডি, নতুন সংযুক্ত হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালসহ মোট ৪৩টি আইসিইউ শয্যা আছে। এসব আইসিইউ শয্যার মধ্যে প্রশাসনের তথ্য মতে দুয়েকটি খালি থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে একটিও খালি নেই। একইভাবে নগরীর বেসরকারি আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল, ম্যাক্স, রয়েল, মেডিকেল সেন্টার, সার্জিস্কোপসহ অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে থাকা ১৬২টি আইসিইউর শয্যার মধ্যে খালি নেই বললেই চলে। দুয়েকটি শয্যা খালি থাকলেও সেগুলো সোনার হরিণের মতো। তদবির ছাড়া এসব আইসিইউ শয্যা পাওয়া দুষ্কর।

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলা নতুন ভবনের করোনা ওয়ার্ডে কোনো শয্যা খালি নেই। খালি নেই আইসিইউ শয্যা। করোনা ইউনিটের প্রতিটি ফ্লোরেই শয্যার ফাঁকে, বারান্দায় ও করিডরসহ যে যেখানে পারছেন সেখানেই শয্যা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কভিড ডেডিকেটেড ভবনের সামনের ডিজিটাল ডিসপ্লেতেও সার্বক্ষণিক প্রচার করা হচ্ছে শয্যা খালি না থাকার তথ্য।

হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. মহিউদ্দিন খান বলেন, গত কয়েক দিনে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, করোনা ওয়ার্ডে পা ফেলার জায়গা নেই। বাড়তি রোগীর চাপে চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে যে যেখানে পারছেন সেখানেই শয্যা (মাদুর দিয়ে) পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে সংকটটা হচ্ছে অক্সিজেন সরবরাহ নিয়ে। তিনি বলেন, প্রতিদিন যে হারে রোগী ভর্তির জন্য হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছেন তাতে যেকোনো সময় চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ডা. মহিউদ্দিন খান জানান, মেডিকেল কলেজের করোনা ইউনিট ২১০ শয্যা নিয়ে চালু হলেও গত দেড় মাস ধরে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বেডের সংখ্যা কয়েক দফা বাড়িয়ে ৪০০ করা হয়েছে। আর আইসিইউর বেড সংখ্যা ১০ থেকে ২২টিতে উন্নীত করা হয়েছে। তবে ৪০০ শয্যার বিপরীতে ৫৮০ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আইসিইউর ২২ বেডের সবগুলোতেই রোগী রয়েছে। সমস্যা সমাধানে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানোর কাজ চলছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল কবীর জানান, শয্যা খালি না থাকায় করোনা রোগীদের ভর্তিসহ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা, প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত