কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

তালেবানি কায়দায় হামলার প্রস্তুতি নেয় আসামিরা

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২১, ০২:১৭ এএম

২০ বছরের বেশি সময় আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ জঙ্গির সাজা বহাল রেখে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। গতকাল সোমবার এ রায় প্রকাশিত হয়। বাংলায় ৮৬ পৃষ্ঠার এ রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম। তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের অপর বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান। এর আগে সাজাপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) গ্রহণ ও আপিল খারিজ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ রায় ঘোষণা করেছিল হাইকোর্টের একই বেঞ্চ।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের ফায়ারিং স্কোয়াড (গুলি করে) কিংবা রশিতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করা যাবে বলে রায়ে বলেছে হাইকোর্ট। কোটালীপাড়ায় এ ঘটনার মূল নেতৃত্বে ছিলেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন মানুষের কল্যাণের স্বার্থে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান (অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর), যা হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। রায়ে আদালত বলে, ষড়যন্ত্রকারী সব আসামিরা তালেবানি কায়দায় এ ধরনের ঘটনা সংঘটনের জন্য মুফতি হান্নানসহ অন্য আসামিদের দায়িত্ব দিয়েছিল। একে ভয়ংকর ও জঘন্য অপরাধ উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণে  হাইকোর্ট বলে, দেশের এবং জঙ্গি তৎপরতা চিরতরে বিলীন হওয়া প্রয়োজন।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ওয়াসিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই এবং মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর। সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্তদের ফায়ারিং স্কোয়াডে দণ্ড কার্যকরের নির্দেশনা ছিল বিচারিক আদালতের রায়ে।

পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, ‘ষড়যন্ত্রকারী আসামিরা মূলত যাকে হত্যা করার জন্য এ ঘটনার অবতারণা করেছিল, তিনি তখন দেশের বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। একটি বৈধ সরকারপ্রধানকে তার সহযোগীদেরসহ হত্যার প্রচেষ্টা এবং তা বাস্তবায়ন করা দেশ ও জাতির জন্য কতখানি ক্ষতিকর তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পরবর্তী সময়ে এ দেশের নিরীহ স্বাধীনতাকামী জনগণ উপলব্ধি করেছিল। আসামিদের এ ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা এবং ধারণা এ জাতির জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। দেশের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গি তৎপরতা চিরতরে এ দেশ থেকে বিলীন হওয়া প্রয়োজন।’

আদালত আরও বলে, ‘এ দেশটি দুর্ভাগা এ কারণে যে, যেখানে জাতির জনককে সপরিবারে বিনা দোষে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে ঘাতকের দল হত্যা করেছিল। দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে এমনভাবে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বিরল। জাতির পিতা এবং তার পরিবারের সদস্যসদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সার্বভৌম এ দেশটি যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও একটি ঘটনার অবতারণা শুরু হয়েছিল এ ঘটনার (কোটালীপাড়া) মধ্য দিয়ে। কাজেই এ মামলায় সংঘটিত ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই।’

পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেছে, ‘উক্ত বোমা দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভয়ংকর বিধ্বংসী। এ দুটি বোমার মধ্যে একটিও যদি বিস্ফোরিত হতো তাহলে ওই এলাকার এক কিলোমিটার বিধ্বস্ত হয়ে যেত এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতো। এমনকি ভূগর্ভে ৯ ফুট ৫ ইঞ্চি গভীরে এবং ৩৪ ফুট ওপরের দিকে প্রভাব বিস্তার করত।’

আদালত আরও বলে, ‘এরূপ ধ্বংসলীলা আফগানিস্তানে সংঘটিত হয়ে থাকে। যেখানে গিয়ে মুফতি হান্নানসহ ষড়যন্ত্রকারীদের কেউ কেউ প্রশিক্ষণ নিয়েছিল এবং তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। সে জন্যই ষড়যন্ত্রকারী সব আসামি তালেবানি কায়দায় এ ধরনের ঘটনা সংঘটনের জন্য মুফতি হান্নানসহ অন্য আসামিদের দায়িত্ব দিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিরা এমন একটি ভয়ংকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, যা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হলে তাদের ষড়যন্ত্র ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দেশে আরেকটি ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হতো।’

রায়ে বলা হয়, ‘আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা দেশের প্রচলিত আইন মান্য করতে নারাজ। তারা জঙ্গি তৎপরতার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। কিন্তু তাদের এ ধরনের চিন্তা দেশের প্রচলিত আইন কখনো সমর্থন করে না।  কারণ তারা সবাই জন্মগতভাবে এ দেশের নাগরিক। ষড়যন্ত্র করে ও দুটি বোমা পোঁতার মধ্য দিয়ে তারা যে অপরাধ সংঘটিত করেছে, তা অত্যন্ত ভয়ংকর ও জঘন্য। এ অবস্থায় কয়েকজন কয়েদির (দণ্ডিত আসামি) দীর্ঘ হাজতবাসে তাদের দণ্ড লঘু করার সুযোগ আছে বলে মনে করি না।’

দণ্ড কার্যকরের ব্যাখ্যায় হাইকোর্ট বলে, ‘অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৮ (১) ধারায় বর্ণনা করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এই ধারা অনুসরণ করেই বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে থাকে। কিন্তু ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩৪ (এ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দুই ধরনের বিধান সন্নিবেশিত রয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ইচ্ছা করলে গলায় রশি ঝুলিয়ে অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিতে পারে।’

আদালত আরও বলে, ‘বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় উভয় পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করার কথা বিচারিক আদালত আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু ফায়ারিং স্কোয়াডে জনগণের উপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে না থাকায় হাইকোর্ট বিভাগ ওই আদেশ পরিবর্তন করে শুধু দণ্ডিত ব্যক্তির গলায় রশি ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন। এ ধরনের (ফায়ারিং স্কোয়াড) পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নজির যেহেতু খুব একটা দেখা যায় না, সে ক্ষেত্রে আমরা মনে করি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ উভয় পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করে তা কার্যকর করতে পারে।’

২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় একটি স্কুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনা ধরা পড়ে। পরদিন ৪০ কেজি ওজনের আরেকটি বোমা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে কোটালীপাড়া থানায় মামলার পর ২০০১ সালের এপ্রিলে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর বিচার প্রক্রিয়া অনেকটা থমকে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে এ মামলার বিচারে ফের গতি আসে। ২০১০ সালে মামলাটি গোপালগঞ্জের সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ বদলি করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এক রায়ে ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ইউসুফ, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই এই চারজন মামলার শুরু থেকেই পলাতক। তারা হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ পাননি। এ মামলায় হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানকেও আসামি করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর ২০০৪ সালে সিলেটে গ্রেনেড হামলা মামলায় প্রথমে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল এ মামলায় মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফলে কোটালীপাড়ার এ মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদের সাজা বহাল রয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। এ ছাড়া আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল বিচারিক। হাইকোর্টের রায়ে সরোয়ার হোসেন মিয়া খালাস পেয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত