উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি খুলে তরুণদের জঙ্গিবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছে। জঙ্গি সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ বা রিক্রুটমেন্টের সঙ্গে জড়িতরা এসব আইডি থেকে জঙ্গিবাদের আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম শতাধিক ফেইসবুক আইডির সন্ধান পেয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। যেকোনো সময় এসব আইডিসংশ্লিষ্টকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে তারা। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে এসব ফেইসবুক আইডিসংশ্লিষ্টের তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি আইডি ছদ্মনামে চালানো হচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ নামে একটি উগ্রবাদী ফেইসবুক আইডিসহ কয়েকটি আইডির অ্যাডমিনকে খুঁজছেন তারা। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ ওরফে ফোরকান ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ আইডির সঙ্গে যুক্ত। ফোরকানসহ সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া চারজনকে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে জঙ্গিরা যেখান থেকে বোমা তৈরির কেমিক্যাল সংগ্রহ করত সেসব প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা করছে তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানে চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ‘বোমাগুরু’খ্যাত ফোরকানের অনলাইনে সেলে প্রশিক্ষণ নেওয়া ৬০ জঙ্গিকেও খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শুধু ‘বোমাগুরু’ ফোরকানই নয়, তার মতো অনেক তরুণ নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ আইডির উগ্রবাদী পোস্ট এবং ভিডিও দেখে। এ আইডির মাধ্যমে তারা জঙ্গিবাদের মতো বিপথে পা বাড়িয়েছে। ২০১৬ সালে ওই আইডির মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণা শুরু হলেও এতদিন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরে পড়েনি। গত মঙ্গলবার রাতে নব্য জেএমবির ‘বোমাগুরু’ ফোরকানকে গ্রেপ্তারের পর ওই আইডির ব্যবহারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদী প্রচারণার নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। ফোরকান জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসির কাছে স্বীকার করেছে, এ আইডির মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। তার কাছে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে জঙ্গিবাদী প্রচারে জড়িত আরও কয়েকটি আইডির তথ্য পায় সিটিটিসি। ২০১৬ সালে ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ আইডি খুলে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ সম্পর্কিত পোস্ট দেওয়া শুরু হয়। সেসব পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের তরুণরা লাইক-কমেন্ট করত। কমেন্টে এসব পোস্টের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক চলত। এসব পোস্টের মাধ্যমে যেসব শিক্ষিত তরুণ জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের প্রতি সহনশীল মনোভাব প্রকাশ করে কমেন্ট করত তাদের চিহ্নিত করে নানাভাবে নার্সিং করে জঙ্গিবাদের পথে নিয়ে আসত আইডিটি। এ আইডিটির মাধ্যমে অনেক তরুণ জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রবাদী বা জঙ্গিবাদী আদর্শ ছড়ানোতে জড়িত বেশ কয়েকটি ফেইসবুক আইডির সন্ধান পেয়েছে সিটিটিসি। এসব আইডির মধ্যে অন্যতম ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’। এ আইডিটির পরিচালনার সঙ্গে কারা জড়িত, অ্যাডমিনের পরিচয় কী, সে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য কি না, তা খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আইডিটি ব্যক্তিবিশেষের নয়। কোনো জঙ্গি সংগঠন সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে এ আইডিটি তৈরি করেছে। তবে আইডিটি এখনো সম্পূর্ণভাবে সচল আছে কি না তা নিশ্চিত হতে তদন্ত করছে সিটিটিসি। এছাড়া আইডিটির অনলাইন জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত ইতিহাসও বের করার কাজ চলছে।
এ ব্যাপারে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জঙ্গিবাদের আদর্শ ছড়ায় এমন কয়েকটি ফেইসবুক আইডি আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। যার মধ্যে ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ অন্যতম। আমরা আইডিগুলোর অনলাইন জঙ্গিবাদ ইতিহাস খুঁজছি। আইডিগুলোর অ্যাডমিনদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বোমা তৈরির জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যাল সংগ্রহ করেছিল ফোরকানসহ অন্য জঙ্গিরা, সেটির একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এসব স্থানে অভিযান চালানো হবে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে ১০-১২টি পুলিশ বক্সে বোমা হামলা চালায় ফোরকানসহ প্রায় অর্ধশতাধিক জঙ্গি। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে দুই জঙ্গি গ্রেপ্তারের পর ‘বোমাগুরু’ জাহিদ ওরফে ফোরকানের সন্ধান পায় তারা। তাকে গ্রেপ্তারের পরই বেরিয়ে আসে অনলাইনে বোমা তৈরি ও জঙ্গি বানানোর নানা কাহিনী। ফোরকান জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, রাসায়নিক পদার্থ সরবরাহ করে এমন কয়েকটি কোম্পানিতে সিভি জমা দিয়েছিল। চাকরি হলেই তার নিজের অবস্থান শক্ত হবে। এটি কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণে এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যাল সংগ্রহ করে শক্তিশালী বোমা তৈরি করবে। এমনকি এই এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যাল সংগ্রহ করা উপাদান দিয়ে বোমা বানিয়ে ড্রোনের সাহায্যে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসসহ, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা ছিল তার। তবে চাকরি পাওয়ার আগেই সে সিটিটিসির হাতে ধরা পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদে ফোরকান আরও জানায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১৪ সালে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সে। এরপরই শুরু হয় তার বোমা বানানোর কৌশল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নব্য জেএমবির প্রায় ৬০ সদস্যকে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
সিটিটিসির প্রধান ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, জঙ্গিকাজে ব্যবহৃত ফেইসবুকের অনেক আইডি শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। ২০১৬ সালে অনলাইনে ‘হোয়াইট হাউসের মুফতি’ নামে আইডির মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবির তৎকালীন আমির মুসার হাত ধরে ফোরকান সংগঠনে যোগদান করে। একপর্যায়ে সিটিটিসি তথা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ধারাবাহিক অভিযানে নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিরা গ্রেপ্তার বা নিহত হলে এই সংগঠনটি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফোরকান আত্মগোপনে চলে যায়। পরে মুসার নেতৃত্বে সংগঠনকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয় সে। এরই অংশ হিসেবে অনলাইনে আইডি খোলার মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামরিক বিভাগে কাজ করতে আগ্রহী সাহসী সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের টাইম ও রিমোট কন্ট্রোল বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নব্য জেএমবি, হিযবুত তাহরীরসহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা ফেইসবুকে শতাধিক আইডি খুলে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের আমরা শনাক্ত করেছি। যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। কারোর পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
