তিন তারকার স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ১১:৪৮ পিএম

আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। এ দিনেই আমরা সপরিবারে হারিয়েছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বিশেষ এই দিনে তার সঙ্গের স্মৃতি মেলে ধরেছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তিন তারকা। কথা বলেছেন মাসিদ রণ

বঙ্গবন্ধু আমার জন্য লজেন্স নিয়ে যেতেন

সৈয়দ হাসান ইমাম

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় আমার ছোটবেলা থেকেই। আমি নানা বাড়ি বর্ধমানে থাকতাম। নানা ছিলেন মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। তখন বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করতেন। তার বয়স হবে ২৪-২৫। আমার বয়স তখন ১০-১২ বছর, স্কুলে পড়ি। সে সময় তিনিসহ ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব স্থানীয় যারা করতেন তারা নানা বাড়িতে আসতেন। নানি তাদের চা করে খাওয়াতেন। বঙ্গবন্ধু আমার জন্য লজেন্স নিয়ে যেতেন। পরে তিনি ঢাকা ফিরে আসেন। আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি ১৯৫৭ সালে, আইয়ুব খানের শাসন আমলের আগেভাগে। এসেই আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন বঙ্গবন্ধুর প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মুক্তধারা’ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়। সেখানে আমি যুক্ত হই। পরবর্তীতে তো তার নির্দেশে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত করি। অসংখ্যবার দেখা হয়েছে, কতো স্মৃতি, কতো গল্প। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। তার আদর্শকেই তো ধারণ করেছিলাম। একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমিও ছিলাম। তার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়, ১৯৭৫ সালের জুনে। আমি আর আমার স্ত্রীকে (নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান) আমেরিকায় আমন্ত্রণ জানানো হয় একটি অনুষ্ঠানে। তার জন্য অনুমতি নিতে গনভবনে গিয়েছিলাম। সেখানেই তাকে শেষবার দেখেছি। বলেছিলেন, ‘ফিরে এসে দেখা কর’। আমরা ফিরেছিলাম আগস্টের ৫ তারিখ। তখন আবার আমার একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। সেটা নিয়ে কিছুদিন ব্যস্ত ছিলাম। তাই আর দেখা করা হয়নি। পরে তো ১৫ আগস্ট সপরিবারে শহিদ হলেন। কিন্তু তাকে কি মুছে ফেলা গেল? তার মৃত্যুর পর দেশের আদর্শ, গতিপথ সব উল্টোদিকে চলতে শুরু করল। আমরা স্বাধীন হয়েও পরাধীন হলাম। অনেকটা পিছিয়ে গেল উন্নয়নের গতি। এখন আবার আস্তে আস্তে আমরা ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। এটাই আশার কথা।

জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধু আমাদের উদ্ধার করেছিলেন

রামেন্দু মজুমদার

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ছোট ছোট স্মৃতি আছে। কিন্তু একটি স্মৃতি আছে, যা একইসঙ্গে দুঃখের ও প্রাণের কাছের। ১৯৬৪ সালে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বড় ভাইয়ের সঙ্গে তেজগাঁওয়ের পলিটেকনিক স্টাফ কোয়ার্টারে থাকি। বাড়ির পাশ দিয়েই তো রেলস্টেশন। একদিন রাতে শুনতে পাই, রেলগাড়ি থামিয়ে লোকজনকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ঘর থেকেই সেই বিভৎস চিৎকার শুনতে পাই। পরিবারের সবাই খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমাদের আত্মীয় ছিলেন অধ্যাপক অজিত গুহ। তিনি বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে বলেছিলেন, আমার এক হিন্দু আত্মীয় পরিবার আটকে আছে। পারলে তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করুন। সেদিন সকালে দেখি জিপে করে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু হাজির আমাদের বাড়িতে। বললেন, দ্রুত সব গুছিয়ে নিয়ে আমার সঙ্গে চলুন। তিনি জিপের সামনে আর আমরা পেছনে বসে আছি। আমাদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। গিয়ে দেখি আরো কিছু হিন্দু পরিবারকে তিনি উদ্ধার করে বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছেন। বেগম মুজিব আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। পরে মুনির চৌধুরী সন্ধ্যায় সেখান থেকে আমাদের নিয়ে এলেন। অনেকের মুখেই আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা শুনি। কিন্তু কয়জন আছে যারা জীবন বাজি রেখে অন্য ধর্মের মানুষকে উদ্ধার করেছেন? এ জন্যই বঙ্গবন্ধু বিরল, এক আদর্শের প্রতীক।

আমার বউভাতের অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু

সাদিয়া আফরিন মল্লিক

বঙ্গবন্ধুকে প্রথম কাছ থেকে দেখি ১৯৭২ সালে। তখন আমি কলেজে পড়ি। আর ছায়ানটে গান শিখি। সে সময় ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন বাংলাদেশ সফরে। তাকে সংবর্ধণা দেওয়ার জন্য কিছু ছাত্রছাত্রীর দরকার ছিল। আমাকেও ডাকা হয়েছিল। শাড়ি পরে গিয়েছিলাম বঙ্গভবনের মাঠের সেই অনুষ্ঠানে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর একটি অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম। আমার বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। শ্বশুর ড. এআর মল্লিক ইন্ডিয়ার হাইকমিশনার ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অর্থমন্ত্রী হন। সেই সুবাদে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাসহ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক ছিল। আমার বিয়েতে বঙ্গবন্ধু বাদে সবাই এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত আমার বউভাতে। আমাদের আর্শিবাদ করেছিলেন, সেই ছবি আছে আমার কাছে। তখন দেশে খাদ্যের খুব মন্বন্তর। তাই শ্বশুর বিয়ের খাবারে কোন চালের তৈরি আইটেম রাখেননি। এ বিষয়টি খুব প্রশংসা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আসলে তিনি এমনই ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। মানুষের কথাই ভাবতেন। তিনিও তো এ দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেনতায় গড়ে তোলার জন্যই কাজ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তা বিপর্যস্ত হয়। তিনি আজ বেঁচে থাকলে এ দেশ সবদিক থেকেই সোনার বাংলা হতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত