অনুমোদন দূরের কথা নীতিমালাই হয়নি

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২১, ০১:৫২ এএম

দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হাজারের ওপর আইপি টিভির একটিরও অনুমোদন নেই। অনুমোদনের জন্য শুধু গত বছরই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে ৫০০ আইপি টিভির মালিক আবেদন করেছে। অনুমোদন না পেলেও বেশিরভাগই সম্প্রচার শুরু করেছে। সংবাদ প্রকাশে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না। ফলে আইপি টিভির অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের সাম্প্রতিক কর্মকা-ই প্রমাণ করে অনুমোদন পেলে মূল ধারার সাংবাদিকতার জন্য বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করবে। তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত সরকারের।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন পর্যন্ত আইপি টিভির জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি করা হয়নি। ২০২০ সালে অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য যে নীতিমালা করা হয়েছিল, তার মধ্যেই আইপি টিভির বিষয়টি রয়েছে। এ নীতিমালার আলোকেই আইপি টিভি নিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য প্রথম পর্যায়ে অনলাইন ও ম্যানুয়ালি পাঁচ শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। সেগুলো নিবন্ধনের জন্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া চলতি বছরও নতুন করে কিছু আবেদন এসেছে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (টিভি-২) রোজিনা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একটি আইপি টিভিরও অনুমোদন তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়নি। অনেকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন। অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার আলোকেই তাদের নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে।’

আইপি টিভির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিভিগুলোর ক্ষেত্রে অনেক যাচাই-বাছাই ও বিভিন্ন বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। নীতিমালার অধীনে এদের অপারেট করতে হয়। নীতিমালা ভঙ্গ করে যদি তারা কিছু করে তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ারও বিধান আছে। অর্থাৎ যেহেতু লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং কিছু বিধি বিধানের অধীনে কাজ করতে হয় সেহেতু চ্যানেলগুলো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে বাধ্য।’

তিনি বলেন, ‘আইপি টিভি যদি কোনো ভালো প্রোগ্রাম করে যেমন কালচারাল কোনো প্রোগ্রাম, কোনো নাটক বা সিরিয়াল প্রচার করে তাহলে ঠিক আছে। তবে দেখা যাচ্ছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সংবাদের নামে স্বার্থ হাসিল করা। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবীদ, বিভিন্ন মহলে স্বার্থ হাসিল করায় তাদের মূল উদ্দেশ্য।’ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি আইপি টিভির লাইসেন্স দেওয়ার আগে এর প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা এবং এর নীতি-নৈতিকতা কতটুকু তারা মেনে পরিচালনা করবে সেটা দেখার বিষয় আছে। না হলে মূলধারার গণমাধ্যম হুমকির মুখে পড়বে।’

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম বিষয় হচ্ছে, আইপি টিভি জিনিসটা কী, যারা এর মালিক তারা নিজেরাই কতটুকু জানেন এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। দ্বিতীয়ত প্রত্যেকটি আইপি টিভি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলেছে। অথচ আইপি টিভি আর ইউটিউব চ্যানেল এক জিনিস নয়। তৃতীয়ত কেউ যদি আইপি টিভির অনুমোদনের জন্য কোনো আবেদন করে তার মানে এই নয় যে, সে সম্প্রচার করার জন্য অনুমোদন পেয়েছে। সুতরাং কেউ যদি অনুমোদনহীনভাবে সম্প্রচার শুরু করে তাহলে আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সম্প্রচার নীতিমালার যে আইনটি আছে সেটি সম্পূর্ণ লঙ্ঘিত হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সম্প্রচারে যে কর্তৃপক্ষ আছে ডাক ও টেলিযোযাযোগ বিভাগ তাদের এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ অনিয়মে ভরে গেছে, কোনো আইনকানুন বিধিবিধানের কেউ তোয়াক্কা করতে চায় না। সোশ্যাল মিডিয়া, আইপি টিভি এগুলো রেগুলেট (নিয়ন্ত্রণ) করার জন্য একটি মন্ত্রণালয় আছে, অধিদপ্তর আছে তারা এগুলো কেন আইনের আওতায় আনে না। যদি এমন বিধান থাকে যে অনুমতি ছাড়া চলতে পারবে না, তাহলে তারা যদি অনুমতি চায় তবে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দিয়ে দেবে। আর যেগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেওয়া ঠিক না সেগুলো না করে দেবে। এমন কড়া অবস্থা থাকবে যে, অনুমতি ছাড়া কোনো আইপি টিভি চলবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সেভাবে তারা জানাবে যে এগুলো অবৈধ, এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। এছাড়া টেলিকমিউনিকেশন, বিটিআরসি, তথ্য মন্ত্রণালয়ও ব্যবস্থা নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে ব্যবস্থা আসাই ভালো।’

সম্প্রতি মহিলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাকে ধরার পরই দেখে গেল তার আইপি টিভি আছে। শুধু হেলেনা জাহাঙ্গীর নয়, আরও অনেকের আইপি টিভি আছে। হেলেনা জাহাঙ্গীর ভিকটিম হবে আর অন্যরা পার পেয়ে যাবে এটা তো হওয়া উচিত নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত