২১ ম্যাচে বসুন্ধরা কিংসের গোলসংখ্যা ৫৫। টানা লিগ শিরোপা জয়ে গোলের এই কীর্তি গড়েছে দলটি। এর মধ্যে ৪২টিই এসেছে তিন লাতিন ফরোয়ার্ডের পা থেকে। ১৯ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে যৌথভাবে আছেন ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রবসন রবিনহো। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার রাউল বেসেরার গোলসংখ্যা ১৬। আর ব্রাজিলিয়ান জোনাথন ফার্নান্দেজ করেছেন ৭ গোল। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে লাতিন এই আক্রমণত্রয়ীতে কতটা নির্ভরতা কিংসের। তাদের ওপর আস্থা রেখেই মালদ্বীপে বিজয় কেতন ওড়াতে চায় বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নরা। পেতে চায় মানিক-রতনের খোঁজ।
কোস্টারিকান দানিয়েল কলিনদ্রেস একটা বড় সময় আস্থা হয়ে কাটিয়ে গেছেন কিংসে। এরপর একেবারে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব আর্জেন্টাইন তারকা হার্নান বার্কোসের। প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকায় উড়িয়ে আনা বিশ্ব তারকা লিওনেল মেসির সাবেক সতীর্থকে দিয়ে অবশ্য মাত্র একটা ম্যাচই খেলাতে পেরেছিল কিংস। যে ম্যাচ আজও আক্ষেপ হয়ে আছে। গত বছর এএফসি কাপের অভিষেক ম্যাচে দেশের মাঠে টিসি স্পোর্টসকে ৫-১ গোলে হারায় কিংস। বার্কোস একাই করেন চার গোল। কিন্তু করোনা শেষ পর্যন্ত হতে দেয়নি আসরটি। ওই এক ম্যাচ খেলেই বিদায় নেন অল্প সময়েই মন জয় করে নেওয়া বার্কোস। বিশ্বকাপ তারকা কলিনদ্রেস ও বার্কোসের প্রস্থানে বড় প্রশ্ন ছিল কে হবেন তাদের উত্তরসূরি? উত্তরটা খুঁজে পেতে দেরি হয়নি। মূলত প্লে-মেকার হলেও অসাধারণ ফিনিশারের পরিচয়টা এর মধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন রবিনহো। কিংসের দ্বিতীয় লিগ শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা ব্রাজিলের শীর্ষ ক্লাব ফ্লুমিনেন্স থেকে ধারে খেলতে আসা রবিনহোর।
রবিনহোর চেয়ে তিন গোল কম করেছেন আর্জেন্টাইন রাউল বেসেরা। তবে ঠিক বার্কোসের মতো হৃদয়জয়ী ফুটবল দেখা যায়নি তার পায়ে। বহু গোলের সহজ সুযোগ হেলায় নষ্ট করে নিজেকে ঠিক উপভোগ্য করে তুলতে পারেননি এখনো। রবিনহোর চেয়ে পিছিয়ে থাকা এ কারণেই। গোল করার চেয়ে করানোতেই বেশি ঝোঁক জোনাথনের। তাই তো নিজে পেয়েছেন ৭ গোল। তবে সেগুলো দেখার মতো। বেশিরভাগই বক্সের বাইরে অথবা ঠিক ওপর থেকে ক্ষিপ্রগতির শটে। মাঝমাঠের সঙ্গে আক্রমণভাগের সেতুবন্ধের কাজটাই মূলত করতে হয় তাকে। গোলের পরিসংখ্যানটা এক পাশে রাখলে কিংসের সাফল্যের মূলেই এই তিন লাতিনের রসায়ন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ছত্রখান করে রাউলকে বল সাজিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে এই লিগে মিলবে অহরহ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ঘরোয়া লিগ আর এএফসি কাপের মঞ্চ তো এক নয়। এখানে ঠিকঠাক কাজ করবে তো লাতিনত্রয়ীর রসায়ন?
আজ দেশের বাইরে কিংসের আন্তর্জাতিক অভিষেক হচ্ছে স্বাগতিক মাজিয়া স্পোর্টসের বিপক্ষে। যেকোনো আসরের প্রথম ম্যাচ বরাবরই বড্ড কঠিন। আর তা প্রতিপক্ষের মাঠে হলে কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়। তো, এই কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে কতটা প্রস্তুত কিংসের আক্রমণভাগের তিন প্রাণভোমরা? রবিনহো ও জোনাথনকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দুই ব্রাজিলিয়ান বড় মঞ্চে নান্দনিকতা উপহার দেবেন, এর পক্ষে বাজিটা ধরাই যায়। কিন্তু রাউল? কাফ মাসলের চোটে লিগের শেষ দুই ম্যাচ খেলেননি। মালেতে আসার পর থেকে টিম ফিজিওর একটা বড় সময়ই কাটছে তাকে নিয়ে। মাজিয়া ম্যাচের আগে শতভাগ ফিট রাউলকে পাওয়া নিয়ে আছে সংশয়।
দুশ্চিন্তা যতই থাকুক রাউল কিন্তু দিচ্ছেন ভালো একটা ম্যাচের প্রতিশ্রুতি, ‘সবাই জানি প্রথম ম্যাচটা সব সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে লিগ জিতে আমরা এখানে এসেছি। সেই স্পিরিটটা মালদ্বীপের মাঠে দেখাতে আমরা মুখিয়ে আছি। এখনো জানি না খেলতে পারব কিনা। তবে কোচ যখনই সিদ্ধান্ত নেবে আমি আমার সেরাটা দিয়েই চেষ্টা করব। এখানে আমরা এসেছি গ্রুপসেরা হতে। তাই ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না।’
ইংরেজি ভাষায় খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্ব্য নন রবিনহো। তাই সাংবাদিকদের খানিকটা এড়িয়েই চলতে চান। তারপরও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে রবিনহো যা বললেন, তার সারমর্ম হলো এই মঞ্চে সুযোগ নষ্টে দিতে হবে বড় মূল্য, ‘ঢাকায় এতদিন যেভাবে খেলেছি, এখানকার খেলাটা হবে তারচেয়ে ভিন্ন। কারণ প্রতিটি দলই খুব শক্তিশালী। সবাইকে তাই সেরাটা দিয়ে খেলতে হবে। প্রত্যেক দলেই ভালো ভালো ফুটবলার আছে। তাই মনোসংযোগটা ভালো থাকা চাই। এই ম্যাচে ফরোয়ার্ড লাইনের গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে পাওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। আমার মনে হয়, শুরুতেই যদি আমরা গোল পাই, তাহলে খেলার চেহারা বদলে যাবে।’
জোনাথন লক্ষ্যপূরণেই বেশি মনোযোগ দিতে চান। আর সেটা গোটা দল নিয়েই, ‘একটা অন্যরকম লক্ষ্য নিয়ে মালদ্বীপ এসেছি। লিগে যাই হয়েছে, এখন সময় এএফসি কাপে পারফর্ম করা। সব ম্যাচ জেতাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য এখন।’
দেশে দুর্বল সব প্রতিপক্ষকে নিয়ে প্রায় প্রতি ম্যাচেই ছেলেখেলা করা লাতিনত্রয়ীকে ঘিরেই স্বপ্নের জাল বিছিয়েছে কিংস। সেরাটা দিয়েই কিংসের মুকুটে আরেকটা পালক গেঁথে দিতে চান তারা।
