তালেবান যোদ্ধাদের দ্রুত আফগানিস্তান দখলে সৃষ্টি হয়েছে মানবিক সংকট। হাজারো মানুষ চেষ্টা করছে দেশ ছেড়ে যাওয়ার। মানবিক সংকটের সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে অর্থনীতি নিয়ে। সেই সূত্র ধরে আফগানিস্তানে অব্যবহৃত বিপুল খনিজ সম্পদ নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করছে বিশে^র। এই খনিজ সম্পদগুলোর সঠিক ব্যবহার ও উন্নয়ন দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশে^র অন্যতম দরিদ্র দেশ আফগানিস্তান। কিন্তু ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা ও ভূ-তাত্ত্বিকরা মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্রসরোডে অবস্থিত দেশটি সম্পর্কে দেন এক সাড়া জাগানো তথ্য। তারা জানান, আফগানিস্তানে রয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারের খনিজ পদার্থের মজুদ। প্রদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে লোহা, তামা, স্বর্ণের মতো খনিজের সরবরাহ। এসব ছাড়াও আছে বিরল খনিজের উৎস। দেশটিতে বিশে^র অন্যতম বড় লিথিয়ামের ভা-ারও আফগানিস্তানে আছে, ধারণা বিশ্লেষকদের। রিচার্জেবল ব্যাটারি ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য একটি উপাদান লিথিয়াম হলেও এটি সহজলভ্য নয়। ইকোলজিক্যাল ফিউচার্স গ্রুপের বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রড স্কুনোভারের ভাষ্যে আফগানিস্তান নিশ্চিতভাবেই ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান ধাতু সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। কিন্তু দেশটিতে একুশ শতকে প্রয়োজনীয় ধাতুগুলোর মজুদও আছে এখানে। নিরাপত্তা বিষয়ক চ্যালেঞ্জ, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব ও তীব্র খরার কারণে অতীতে এসব মূল্যবান ধাতুর সন্ধান সম্ভব হয়নি। তালেবানের শাসনামলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে না। তবে চীন, পাকিস্তান ও ভারতের এ বিষয়ে আগ্রহ আছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এ দেশগুলো চেষ্টা করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় লিথিয়াম, তামা, নিকেল, কোবাল্ট ও বিরল খনিজ উপাদানের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো দরকার। বর্তমানে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও বিরল খনিজের বৈশি^ক উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ হয় চীন, কঙ্গো ও অস্ট্রেলিয়ায়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের মিরজাদ সায়েন্স ম্যাগাজিনকে ২০১০ সালে বলেছিলেন, কয়েক বছর আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকলে দেশটির খনিজ উৎস উন্নয়ন করা যেত। এতে আফগানিস্তান এক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হতো। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান জিওলজিক্যাল সার্ভের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কখনোই শান্ত হয়নি। আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ ভূগর্ভেই রয়ে গেছে, জানান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক মিডল ইস্ট অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া ডিরেক্টর মসিন খান। তার তথ্য অনুযায়ী, এখন আফগানিস্তানে মাত্র ১০০ কোটি ডলারের খনিজ উৎপাদন হয়। তবে আফগানিস্তানের খনিজ খাত উন্নয়নে তালেবানের নতুন ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে জানান স্কুনোভার। সিএনএন বলছে, ভূ-রাজনীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রকল্পগুলোর গল্প ভিন্ন হতে পারে। বিরল খনিজ উপাদানের নেতৃত্বে আছে চীন। দেশটি বলছে, আফগান তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। উল্লেখ্য, তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল বরাদারের সঙ্গে চলতি বছরের ২৮ জুলাই বৈঠক করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
স্কুনোভার বলছেন, আফগানিস্তানের নিকট প্রতিবেশী চীন। দেশটি দূষণমুক্ত জ¦ালানি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। হাতে নিয়েছে নানা কর্মসূচি। লিথিয়াম ও বিরল খনিজ উপাদানগুলোর ঘনত্ব ও বৈশিষ্ট্যের কারণে এগুলোর বিকল্প নেই। আর এই চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এই খনিজগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আফগানিস্তানে খনিজ নিয়ে চীনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন স্কুনোভার। তবে পরিবেশের দিকেও নজর রাখতে হবে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, খনি খননে সাবধানতা অবলম্বন না করা হলে তা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাতে পারে। যা নীরব ঘাতক হতে পারে নির্দিষ্ট জনসংখ্যার জন্য। চলমান অস্থিতিশীলতার কারণে বেইজিং তালেবানদের সঙ্গে অংশীদারত্বের অংশীদার হতে পারে কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। বিশে^র দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশটি অন্যান্য অঞ্চলের দিকে মনোযোগী হতে পারে। মসিন খান ইতিহাস তুলে ধরে জানান, এর আগে অন্য অঞ্চলের তামার খনিতে বিনিয়োগের চেষ্টা করেছিল চীন। কিন্তু এতে সফলতা মেলেনি।
