বহু স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী আশুরা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২১, ১২:১১ এএম

ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাস বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। এ মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় ইয়াওমু আশুরা বা আশুরা দিবস। আবহমানকাল থেকেই এ মাস বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অনেকের ধারণা, কারবালায় নির্মম ঘটনার কারণে আশুরার দিন এত গুরুত্ববহ, এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা কারবালার ঘটনার বহুকাল আগে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছে। আকাশ-জমিন সৃষ্টিসহ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা এ মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিনেই সংঘটিত হয়েছিল। পৃথিবীতে অনেক স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা এদিন ঘটেছিল। মহররম সংগ্রামী শিক্ষা এবং আত্মসচেতনতার মাস। মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী চেতনা খুঁজে পাওয়ার মাস। মহররম আসে দায়িত্ব পালনে সাহসিকতার পথপ্রদর্শক হিসেবে। আসে নির্ভীকভাবে পথচলার কল্যাণময় শুভবার্তা নিয়ে। মহররম আসে পুরনো বছরের জরাজীর্ণতাকে ধুয়ে-মুছে নতুন সাজে সজ্জিত করতে। এ মাস আসে আমাদের নতুন শপথ ও প্রত্যয় গ্রহণের অঙ্গীকার নিয়ে। মহররম মাস এলে মুসলিম বিশ্বে জেগে ওঠে ইসলামি সংস্কৃতি, এ মাসে বহু উল্লেখযোগ্য ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় বিভিন্ন দিক দিয়ে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

হাদিসে মহররম মাসকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে একে ‘আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, মহররম মাসের নফল রোজার সওয়াব অন্য সব নফল রোজার সওয়াবের চেয়ে বেশি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পরে সবচেয়ে বেশি ফজিলতের রোজা হলো- আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ এদিন রোজা পালনের জন্য উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছেন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)। বোখারি শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করে। তিনি তাদের বলেন, এ দিনটির বিষয় কী, তোমরা এ দিনে রোজা পালন করো? তারা বলল, এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও তার জাতিকে পরিত্রাণ দান করেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে নিমজ্জিত করেন। এ জন্য হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এদিন রোজা পালন করেন। তাই আমরা এদিন রোজা পালন করি। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হজরত মুসা (আ.)-এর বিষয়ে আমাদের অধিকার বেশি। এরপর তিনি এদিন রোজা পালন করেন এবং রোজা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।’

ইসলামের বিধান হলো- আশুরার রোজা দুইটি রাখা। ১০ তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে আগে বা পরে অর্থাৎ নয়-দশ কিংবা দশ-এগারো মহররম রোজা রাখা। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা মোস্তাহাব তথা ঐচ্ছিক বলে গণ্য করা হয়। তবে আশুরার রোজা পালন করলে অফুরন্ত সওয়াব পাওয়া যায়। এ কারণে মহান আল্লাহ বান্দার পূর্ববর্তী বছরের সগিরা গোনাহ মাফ করে দেন। তাই কোনো সচেতন মুসলমান আশুরার রোজা পালন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না।

ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণেও ১০ মহররম মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত। ঘটনাটি হলো- কারবালার ঘটনা। অনেকে ‘আশুরা’ বলতে কারবালার ঘটনাই বোঝেন। যদিও ইসলামি শরিয়তে আশুরার রোজা কিংবা ফজিলতের সঙ্গে কারবালার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে কারবালার ঘটনা পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এখান থেকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের ৫০ বছর পর ৬১ হিজরি সালের মহররম মাসের ১০ তারিখ শুক্রবার ইরাকের কারবালা নামক স্থানে তারই উম্মতের কিছু মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন প্রিয়তম দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)। এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি। অনেক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কাহিনী এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়ানো হয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ইতিহাসে আছে, ইয়াজিদ ছাড়াও কারবালার ঘটনার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত রয়েছে কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্মম ষড়যন্ত্র। এ ক্ষেত্রে সিমারের হত্যার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করতে হয়। আশুরার দিন সকাল থেকে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনী হজরত হোসাইন (রা.)-এর সাথীদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। তিনি তো যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে যাননি। তিনি কুফায় লক্ষাধিক মানুষের বাইয়াত পত্রের (আনুগত্যের শপথ) আহ্বানে সাড়া দিতে দুগ্ধপোষ্য শিশু ও নারীসহ সেখানে গিয়েছিলেন। তাই প্রস্তুতিহীন যুদ্ধে তার সাথীরা একে একে সবাই শহীদ হলেন। হজরত হোসাইন (রা.)ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলেন। কারবালার ঘটনা থেকে আমরা বর্তমান সময়েও শিক্ষা নিতে পারি। মুসলমানদের ক্ষতির জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা মুসলমানদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। তাই ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সব সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিভ্রান্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আর পরিস্থিতি যাই হোক না কেন কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা যাবে না।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, কারবালায় ইয়াজিদের পক্ষে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনী বাহ্যিক বিজয় লাভ করলেও প্রকৃত অর্থে তাদের পরাজয় হয়েছিল। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কাপুরুষদের অসম যুদ্ধের বিজয়কে কোনো বিবেকবান মানুষ স্বীকৃতি দিতে পারে না। আর জানার মতো তথ্য হলো, হজরত হোসাইন (রা.)-কে হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। আর কারবালার ঘটনার মাত্র ৪ বছরের মধ্যে মৃত্যু হয় ইয়াজিদের। এরপর আর তার বংশের কেউ শাসক হতে পারেনি। মহররম যাবতীয় অন্যায়, পাপাচার, অনাচার ও সহিংসতাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষকে আত্মিকভাবে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার, তার ক্ষমতার বিশালত্বে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের, নির্ভরশীলতা ও সুদৃঢ় আস্থা জ্ঞাপনের, যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণার অপনোদনের। সর্বতোভাবে খোদাতায়ালার ঐশী সাহায্যের মুখাপেক্ষী ও তার সীমাহীন অনুগ্রহ, রহমত আর বরকতের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত