দেশ-বিদেশে আলোচিত আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করতে পুলিশের দফায় দফায় আবেদনে সাড়া দিচ্ছে না বিশে্বর সর্বোচ্চ সংস্থা ইন্টারপোল। ওইসব আসামিকে ‘মোস্ট ওয়ানটেন্ড’ আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে চিঠিতে। আসামিদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক সাংসদ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের নাম রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক আসামিরা বিশে^র বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে আছেন। অবস্থানের তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না তাদের। তারপরও সরকার নানাভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ৩৪ মাস ধরে উচ্চতর আদালতে আছে দন্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স। বিচারিক আদালতের রায়ের পর পেপারবুক (রায়সহ মামলার যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়ে আছে বছরখানেক আগেই। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডপ্রাপ্তদের আপিলের শুনানি শুরু করা যায়নি।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, এতদিন করোনার কারণে হাইকোর্টের কার্যক্রম নিয়মিত না হওয়ায় শুনানি শুরু করা যায়নি। তবে এখন বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এ মামলার শুনানি দ্রুত শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফৌজদারি বিধান অনুযায়ী কোনো মামলায় বিচারিক আদালতে আসামির মৃত্যুদন্ড হলে দন্ড কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এজন্য সব নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডপ্রাপ্ত এবং কারাগারে থাকা আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করতে পারেন। পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাসংশ্লিষ্ট বেঞ্চে শুনানির পর্যায়ে আসে। তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু তারা (আসামিরা) গ্রেনেড হামলা করেছে, হামলায় জীবননাশ হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার জন্য তারা এ গ্রেনেড হামলা করেছে। তারা অপরাধ করেছে। এসব কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কোর্ট তো এতদিন বন্ধ ছিল। এখন কোর্ট শুরু হয়েছে। আমরা এ মামলার দ্রুত শুনানির চেষ্টা করব।’
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ দেশ রূপান্তরকে জানান, দন্ডিত পলাতক আসামিদের ধরতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা চেষ্টা করছে। যারা দেশের বাইরে বিদেশে পালিয়ে আছে তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ১৪ জন দেশের বাইরে আত্মগোপনে আছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মধ্যে দুজন ভারতের কারাগারে আটক আছে।
২০০৪ সালে এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে প্রাণ হারান মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভানেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী। ঘটনার ১৪ বছর পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর আলোচিত এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে দন্ডিত ৪৪ আসামি হাইকোর্টে আপিল করেছেন। মামলার যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক সাংসদ শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৪ জনকে কয়েক দফা চেষ্টা করেও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিসের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। গত তিন বছরের ব্যবধানে অন্তত তিনবার ওইসব আসামির বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করতে ইন্টারপোল সদর দপ্তরে আবেদন করে পুলিশ। সর্বশেষ চলতি বছর ৮ জানুয়ারি আবারও আবেদন করা হয়। কিন্তু কোনো আবেদনই আমলে নেয়নি ইন্টারপোল। তবে দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা মাত্র চারজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করেছে ইন্টারপোল। এমনকি গত ১০ বছর ধরে দন্ডিত অন্য দুই আসামি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের তিহার কারাগারে আটক আছে। তাদের ফিরিয়ে আনারও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ এসেছে।
গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন), যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডপ্রাপ্তদের আপিল সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গত বছর ১৫ আগস্ট পেপারবুক বিজি প্রেস থেকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আসে। হত্যা মামলায় ১৩ ভলিউমে মোট ৫৮৫টি পেপারবুক প্রস্তুত হয়েছে যার পৃষ্ঠা সংখ্যা সাড়ে ১০ হাজার। এতে মোট আপিল ২২টি এবং জেল আপিল ১২টি। অন্যদিকে বিস্ফোরক মামলায় ১১ ভলিউমে ৪৯৫টি পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ১০ হাজার পৃষ্ঠার। এখানে ১৭টি আপিল ও ১২টি জেল আপিল।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার দন্ডিত চার আসামির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা আছে। তারেক রহমানসহ আরও ১৪ আসামিকে ধরতে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করতে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ইন্টারপোল সদর দপ্তর তা আমলেই নিচ্ছে না। আসামিরা এখন কোথায় কোথায় অবস্থান করছেন সেই তথ্যসহ পাঠানো হয়। সবাই মোস্ট ওয়ানটেন্ড আসামি হওয়ায় রেড নোটিস জারি করতে বলা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার অন্য এক কর্মকর্তা বলেছেন, চার বছর আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক সাংসদ শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা ছিল। পরে তারা এ নোটিসের বিরুদ্ধে আইনজীবী নিয়োগ করেন। রাজনৈতিক কারণে তাদের আসামি করে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে তারা ইন্টারপোলকে বোঝাতে সক্ষম হন। পরে রেড নোটিস প্রত্যাহার করে নেয় ইন্টারপোল। কোনো দুর্বৃত্ত যখন জঘন্য অপরাধ করে এবং সেই অপরাধের জন্য আইনের শাস্তির ভয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তখন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ওইসব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ইন্টারপোল কাজ করে থাকে।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রেনেড হামলায় মামলায় আসামি ছিলেন ৫২ জন। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর আদালত রায় দেয়। রায়ে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৩০ জন কারাগারে আছেন। অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। বাকিরা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। তারেক রহমান একযুগ ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। গ্রেনেড হামলা মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। হুজির শীর্ষ নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদ সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর আপন ভাই। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন। আদালত তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। সাবেক সাংসদ শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সৌদি আরব অবস্থান করছেন। মাঝেমধ্যে তিনি লন্ডন যাতায়াত করেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকা, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম কানাডা, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ পাকিস্তান বা সৌদি আরব, রাতুল আহমেদ বাবু দক্ষিণ আফ্রিকা বা ইতালি, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান (মাগুরা), জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার ও মুফতি শফিকুর রহমান সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তাছাড়া হুজির সদস্য আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিন ভারতের তিহার কারাগারে আটক রয়েছেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হারিছ চৌধুরী, মাওলানা তাজউদ্দিন, রাতুল বাবু ও মোহাম্মদ হানিফকে ধরতে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করেছে। হামলার পর তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা চলে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করে। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুন মাসে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই তাজউদ্দিন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজিবি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তদন্তে বেরিয়ে আসে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই এ সংক্রান্ত মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে অধিকতর তদন্ত শুরু করে। পরে বিএনপির নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। দন্ডিত আসামি ও জামায়াত নেতা মুজাহিদুল ইসলাম, হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও শহীদুল আলমকে অন্য মামলার রায়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
