আর্থিক উন্নতি, শিক্ষার মান ও বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ১২:১০ এএম

শিক্ষার মান, উদ্ভাবন, গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ের অগ্রগতিতে নয়, দেশের নামজাদা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে ‘সবচেয়ে বেশি ধনী’ হওয়ার সুবাদে। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত ‘দেশের সবচেয়ে ধনী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ার পর বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না। কেবলই মনে হচ্ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ কি শিক্ষার উন্নয়ন নাকি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উন্নয়ন? যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আর্থিকভাবে স্ফীত হচ্ছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ পর্যন্ত শিক্ষা-গবেষণার উন্নতিতে কখনো সংবাদ শিরোনাম হতে পারল না কেন? দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আয়-উন্নতি করছে, আর্থিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছে, এক দিক থেকে এটা অবশ্যই ভালো, সুখবর। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী না হলে প্রতিনিয়ত ধুঁকতে থাকে। শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টি গৌণ হয়ে যায় আর্থিক টানাপড়েনের কারণে। সেক্ষেত্রে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (এনএসইউ) অন্তত টাকার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া, আয় বৃদ্ধিই কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য? নাকি শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষায় আলোকিত করা মূল লক্ষ্য? বিশ্বমানের শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টি কতদূর এগুলো?

উল্লেখ্য, বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে ব্রিটিশ কোম্পানি কুয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস লিমিটেড (কিউএস) প্রতি বছর মোট ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর জুন মাসে পৃথিবীর সেরা ১৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তালিকা করেছে, সেখানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১০০১ থেকে ১২০০তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়েও স্থান হয়নি। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়টির টাকার কোনো অভাব নেই। বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা আছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। দেশের এক ডজনেরও বেশি বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত হিসেবে এ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে প্রতি বছর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনায় আয়কৃত এ অর্থের অর্ধেকও ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে না। এনএসইউর বার্ষিক অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকারও কম। প্রতি বছরই বেঁচে যাওয়া বড় অঙ্কের এ অর্থ যুক্ত হচ্ছে নর্থ সাউথের তহবিলে। উদ্বৃত্ত অর্থে ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির তহবিল (বণিক বার্তা, ৩ আগস্ট, ২০২১)।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, দেশের আর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এত বড় অঙ্কের তহবিল নেই। এমনকি আয়ের পরিমাণ ও উদ্বৃত্ত তহবিলের আকারে নর্থ সাউথ এখন দেশের অনেক বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও ছাড়িয়েছে। কথা হলো, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে তহবিল বাড়াতে পারে কি? আইন অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে অবাণিজ্যিকভাবে। আর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যে ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তার চুক্তিপত্রেও বলা হয়েছে, এ ট্রাস্ট মানবহিতৈষী, দানশীল, জনহিতকর, অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও অবাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হবে। কিন্তু তা হচ্ছে কি? অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ টিউশন ফি আরোপ করে বড় অঙ্কের অর্থ লাভ করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কি সেটা করতে পারে? ইউজিসিও বলছে, শিক্ষার্থীদের ওপর মোটা অঙ্কের টিউশন ফি আরোপ করে বড় অঙ্কের তহবিল গঠন সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় অর্থ যদি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কিংবা শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তবু কথা ছিল। একটা মোটা অঙ্কের টাকা বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে যথেচ্ছ ব্যয় করা হচ্ছে। বৃহৎ স্বার্থে ট্রাস্টে টাকা জমা হওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো স্বচ্ছতা নেই। অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের তহবিল থেকে নিজেদের ইচ্ছামতো অর্থ ব্যয় করছে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ড। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকায় একেকজন ট্রাস্টি প্রায় ৩ কোটি টাকার ল্যান্ড রোভারের বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার গাড়ি কিনে ব্যবহার করছেন। বিওটিসহ নিজেদের তৈরি করা বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কমিটির সভা ডেকে বড় অঙ্কের সিটিং অ্যালাউন্স নেন ট্রাস্টিরা। সভাভেদে সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ সদস্যদের কেউ কেউ ৫০ হাজার টাকাও নাকি নিচ্ছেন। নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও কেনাকাটা কিংবা সেবার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে কয়েকজন ট্রাস্টির বিরুদ্ধে। এমনকি স্ত্রীসহ স্বজনদের নামমাত্র নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন-ভাতা বাবদও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অনেক ট্রাস্টি।

উল্লিখিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এসবের দ্রুত প্রতিবিধান হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে উদ্যাগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও সরকার জনকল্যাণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে। শুধু তথাকথিত অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তানদের একটি শিক্ষাসনদ প্রদানের বিনিময়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের ভোগবিলাসে সেই টাকা ব্যয়ের অনুমোদন সরকার নিশ্চয়ই দেয়নি। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। প্রশ্ন হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার জন্য কত তহবিল বরাদ্দ করেছে? তাদের ল্যাবরেটরিতে কী কী সুবিধা আছে? ট্রাস্টিদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং নানা ছুঁতোয় বিশাল সম্মানী হাতিয়ে নেওয়া কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ অর্ধেক বা তারও কম, তাই বিশ্ববিদ্যালয়টির টিউশন ফির পরিমাণ ৪০-৫০ শতাংশ কমানোর সুযোগ রয়েছে। এতে করে দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়তে পারে।

এমনিতেই আমাদের দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। সেখানে তুলনামূলকভাবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়টির একটা সুনাম আছে। এই সুনাম অক্ষুণœ রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। তারপরও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটাকে প্রায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। শিক্ষার মান উন্নয়ন করা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানে অর্থ ও নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোতেই তাদের বেশি নজর থাকে। এই মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ শিক্ষার উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। এই টাকা বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি তৈরিতে, গবেষণা খাতে ব্যয় করা যেতে পারে।

আজ পর্যন্ত জানতে পারলাম না মৌলিক কোনো গবেষণা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে বা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী এমনকি বৈশ্বিক পরিসরে অনেক বিষয় আছে গবেষণার। বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণায় বেশি টাকা বিনিয়োগ করলে মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি সারা বিশ্বে তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। তাহলে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে আগ্রহ নিয়ে পড়তে আসতে পারে। তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও আয়-উন্নতি ও কলেবর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যশ ও সুনাম বৃদ্ধি পাবে।

গবেষণা খাতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং মাপকাঠির অন্যতম জায়গা; অথচ এখানেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা বেশি। এর জন্য দু’টি বিষয়কে প্রধানত দায়ী করা যায়। শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত গবেষণামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মৌলিক গবেষণাই না হয়, তাহলে শিক্ষার মান বাড়বে কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান বিতরণ করে না, জ্ঞান সৃষ্টিও করে। আর উন্নত গবেষণার মাধ্যমেই সেটি সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের মুক্ত জ্ঞানচর্চার স্থান। শিক্ষার্থীরা গবেষণা করবেন, নতুন নতুন উদ্ভাবন করবেন, জাতিকে বিশ্বদরবারে মেলে ধরবেন এটাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশ্য। কিন্তু হচ্ছে ঠিক উল্টো। শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হচ্ছে কিছু পাঠ্যবই, লেকচার শিট, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা আর নামমাত্র রিসার্চ পেপার, যার যথার্থতা শিক্ষকরা ঠিকভাবে বিচার করেও দেখেন না। তাদের মুক্ত জ্ঞানচর্চার সুযোগ না দিয়ে বরং ক্লাসে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা হয়। এই যদি হয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতির হিসাব, তাহলে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক নয় কি?

আমাদের উচ্চশিক্ষা আজ এক হতাশার নাম। আমাদের দেশে শিক্ষকরাও প্রশ্ন করের না, ছাত্ররাও প্রশ্ন করতে শেখে না। এমনকি এসব নিয়ে সমাজের অন্য কেউই কোনো প্রশ্ন করেন না। প্রশ্ন করা যায় না। দেশে এখন চালু হয়েছে প্রশ্নহীন শিক্ষা, প্রশ্নহীন সমাজ-রাজনীতি। অথচ শিক্ষা মানুষকে ভাবাতে আর প্রশ্ন করতে শেখায়। কোনো দেশের কোনো যুগের শিক্ষাতেই বাক্হীন, প্রশ্নহীন থাকার কথা বলা হয়নি। আরেকটি কথা, উচ্চশিক্ষা স্বপ্ন দেখতে শেখায়, সাহস জোগায় স্বপ্নকে সাকার করার। তাই উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিরন্তর ভাবনা-চিন্তা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলাপ-আলোচনা-গবেষণা আরও বাড়ানো দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার তথাকথিত পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীকে কীভাবে সামনে, মানসম্মত শিক্ষার একটি স্তরে আনা যায়, তার পথপদ্ধতি অনুসন্ধান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক দেশ জাতির কল্যাণ ও মানব উন্নয়নের সাধনায় নিবেদিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন কেবল টাকা বানানোর মেশিন না হয়ে ওঠে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত