আফগানিস্তানে তালেবানি শাসনের আঞ্চলিক প্রভাব

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ১০:৪৪ পিএম

যে ভূ-রাজনৈতিক কারণে আফগানিস্তানের দখল নিতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক থেকে লড়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র, সেই ভূ-রাজনীতির অপরাজিত অধিপতি এখন যুক্তরাষ্ট্রই। অর্থনীতিতেও। সেই সূত্রে আফগানিস্তানের মূল প্রাকৃতিক সম্পদ তেল এবং গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করছে ইউনোকল করপোরেশন, পাশের দেশ সাবেক সোভিয়েতভুক্ত তাজিকিস্তানের তেল-গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ কোম্পানি টেথিস পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের হাতে, আর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। ফলে অর্থনৈতিক যে হিসাব থেকে আফগানিস্তানে আধিপত্য জরুরি ছিল সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বিজয়ীর’ অনুকূলে। তাই আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হচ্ছে সেটি নিয়ে মিছে চিন্তিত হওয়ার বিলাসিতা ততক্ষণ অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের নেই, যতক্ষণ না সেটি তার নিজের জন্য হুমকির কারণ হচ্ছে। কিন্তু দেখার পালা, কী তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্বরাজনীতির এই উর্বর খেলার মাঠে!

আফগানিস্তান এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে! এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। একটু পেছনের দিকে তাকালে স্মরণ করা যাবে, দখলদার রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আফগান মুজাহিদিন তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। রাশিয়ার পিছু হটার পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে মুজাহিদিনের মধ্যকার বহুপক্ষীয় লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের পরবর্তী পরিণতি নতুন নামে এই তালেবান গোষ্ঠীর উত্থান। অনেক নাটকীয়তার পর আবার নাইন-ইলেভেনের ঘটনা। আর তারপর তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুসেড ঘোষণা। এরপর পুরো দুই দশক ধরেই আফগানিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। আর এই পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে এখন আফগানিস্তানে তালেবানের চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই। সুতরাং তাদের সমর্থন করাটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক। এর প্রথম লাভটা হচ্ছে, তারা তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচাপাতি থেকে মুক্তি পাবে। দ্বিতীয় লাভটা হচ্ছে, ইসলামপন্থি উত্থানের যে ফোবিয়া তারা ছড়িয়ে দিয়েছে তা আরও জোরালো হবে। মাঝখানে ফলাফলটা যা দাঁড়াবে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুদিকেই লাভ।

আফগানিস্তানের সর্বশেষ আশরাফ গণির সরকার বা তার আগে হামিদ কারজাইয়ের আমল, প্রত্যেক প্রশাসনই ছিল বিপুল দুর্নীতিগ্রস্ত। সাধারণ মানুষের উন্নতির কথা কেউ ভাবেনি। যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আফগান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আফগান প্রদেশগুলো চলে ‘প্রদেশ প্রভু’-দের দ্বারা। এদের নিজস্ব সেনা (মিলিশিয়া) আছে। তাদের হারাতে হারাতেই তালেবান রাজধানী কাবুল পর্যন্ত পৌঁছেছে। নব্বই দশকে যখন তালেবান ক্ষমতা দখল করেছিল, তখনো তারা এদের হারাতে হারাতেই এসেছিল। কিন্তু পরে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রবেশ করে আফগানিস্তানে, তখন এদের ক্ষমতা হ্রাস করানো হয়। হামিদ কারজাইয়ের সরকার তৈরির পর এই প্রভুরা ক্রমে সরকারের কাছাকাছি আসেন। নিজস্ব বাহিনী তুলে নিয়ে সরকারের বাহিনীর মাধ্যমে শাসন করতে শুরু করেন। এরা আগাগোড়াই তালেবান বিরোধী ছিলেন। এদের সখ্য ছিল মুজাহিদিনের সঙ্গে। কাছাকাছি আসায় সরকারও এদের ওপর ভরসা করতে শুরু করে। গণি চেষ্টা করেছিলেন এদের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়ার। যাতে তালেবানের সঙ্গে এরা লড়তে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সামান্য কয়েকজন প্রদেশ প্রভু ছাড়া কেউই তেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। কেন? তা এখনো খুব একটা স্পষ্ট নয়। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় মাজার-ই-শরিফের কথা। চাইলে তালবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত এই প্রদেশ। কিন্তু তোলেনি। হেরাটে ইসমাইল খান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও সরে এলেন। কেন, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সৃষ্ট পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে তালেবানের দিকে হাওয়া ঘুরিয়ে দেয়। খুব ধীরে হলেও তা ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোটা আফগানিস্তানকে তাতিয়ে তোলে। পাকিস্তান সরাসরি মদদ দিতে শুরু করেছিল তালেবানকে। শুধু পাকিস্তান নয়, মদদ ছিল চীনেরও। কয়েকদিন আগেই চীনের সঙ্গে তালেবান বৈঠক করেছে। চীন প্রায় সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে, বেইজিংয়ের যে ‘বিনিয়োগ’ আফগানিস্তানে আছে, তা সুরক্ষিত রাখলে তারা তালেবান সরকারের পাশে দাঁড়াবে। সেগুলো মেনে নিয়েই তালেবানরা এগিয়েছে। এর মধ্যে অনুঘটকের কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হাত গুটিয়ে নেওয়া। চীন এখন কী করবে? চীন অবশ্যই চাইবে তালেবানের সখ্য। যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব একচ্ছত্র না হয়। চীনের উদ্দেশ্য একটা ভারসাম্য তৈরি করা। যেন সে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিছিয়ে না পড়ে।

আখেরে কী হবে? এমন প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারেন না। কেননা, বাস্তবতা পাল্টায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সেভাবে গতিমুখ পরিবর্তন করে। এটা নিয়ে অবশ্য নানান কথা আছে। উগ্রবাদী মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদা, আইএস কিংবা মুজাহিদিন কিংবা তালেবান সবই যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তৈরি তাই তারা ভালোই জানে কীভাবে তাদের মোকাবিলা করতে হয়। আর কীভাবে এসব জিইয়ে রাখতে হয়। কীভাবে এসব ব্যবহার করতে হয়। এখন আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠার প্রভাব প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং ভারতের মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে কতটা চাঙ্গা করবে সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে বৈকি। 

বাংলাদেশ থেকে কিছু লোক তালেবানের সঙ্গে যোগ দিতে হিজরত করেছে, বলছে পুলিশ। তালেবান জঙ্গিরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা নিয়ে নেবে। এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে? কারণ আরও দুই যুগ আগে থেকেই এইখানে রাজপথে মিছিলে প্রকাশ্য দিবালোকে মৌলবাদীরা স্লোগান দিয়েছে, ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। এই উপায়ে বাংলাদেশেও তলে তলে জঙ্গিদের অভাবনীয় বিস্তার ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও উগ্রবাদী তৎপরতা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রথম যখন মুসলিম উগ্রবাদের জন্ম হয়েছিল, তার সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধের একটা সরাসরি সম্পর্ক ছিল। সেই যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সম্ভাবনা থাকবে। অন্যদিকে, দেশেও এখন প্রবল ‘ইসলাম ফোবিয়া’ প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। যদি দেশের ইসলামপন্থিরা ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পায়, তাহলে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না তালেবানি শাসনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করতে পারে।

লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত