গত তিন সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার শনাক্ত হার কমছে। প্রথম সপ্তাহে (২-৮ আগস্ট) দৈনিক গড় শনাক্ত হার ছিল ২৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। পরের সপ্তাহে তা কমে ১৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়। গত এক সপ্তাহে শনাক্ত হার কমে সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই তিন সপ্তাহে গড় শনাক্ত হার কমেছে ১৫ শতাংশ। এমনকি ৯ সপ্তাহ পর গতকাল রবিবার প্রথম শনাক্ত হার ১৫ শতাংশে নেমে এলো।
এই তিন সপ্তাহে মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যাও কমেছে। প্রথম সপ্তাহে দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ২৪৮ ও পরের সপ্তাহে ২১৮ জন। সেখানে গত সপ্তাহে দৈনিক গড় মৃত্যু নেমে এসেছে ১৫৮ জনে। একইভাবে কমেছে রোগীর সংখ্যাও। দুই সপ্তাহ আগে যেখানে দৈনিক গড়ে শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ৭৬৭ জন করে; সেখানে গত সপ্তাহে দৈনিক গড়ে শনাক্ত হয়েছে অর্ধেকে, অর্থাৎ ৬ হাজার ১৫৭ জন। অবশ্য এই তিন সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও কমেছে। প্রথম সপ্তাহে দৈনিক গড় পরীক্ষা ছিল ৪৬ হাজার ৭১২টি, দ্বিতীয় সপ্তাহে তা আরেকটু কমে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৫৮৭টি এবং গত সপ্তাহে তা আরও কমে দৈনিক গড় পরীক্ষা হয় ৩৪ হাজার ৪২৮টি।
এমন অবস্থায় দেশের সংক্রমণ নিম্নগামী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে পরীক্ষা আরও বাড়ানো এবং সব জায়গায় সমানসংখ্যক পরীক্ষা করা দরকার বলে মনে করেন তারা। এ ব্যাপারে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে “ইউনিফর্ম কালেকশন অব স্যাম্পল” (নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ) মানে সব জায়গা থেকে সমানসংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। সেটা আমাদের দেশে হচ্ছে না। সেজন্য আমরা সংক্রমণের গতিপ্রকৃতিটা বলতে পারি না। এ ধরনের নমুনা পরীক্ষা হলে আমরা বলতে পারতাম পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।’
পরীক্ষা বাড়ানো যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন যে শনাক্ত হার, সেটা যে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে সেটা অনুযায়ী। নানান কারণেই এখন মানুষ পরীক্ষা করতে যায় না। সবকিছু খুলে গেছে। চলাফেরা সহজ হয়ে গেছে। লোকজন কাজে ফিরছে। খুব জরুরি না হলে পরীক্ষা করে না।’ তিনি বলেন, ‘টেস্ট যদি বেশি হতো, তাহলে বুঝতে পারতাম সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা। আরও বেশি পরীক্ষা হলে শনাক্ত হার কমে যাবে।’
অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে। এটা বাড়লে ভালো হতো। তাহলে প্রকৃত শনাক্ত হার ও সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র আরও নিশ্চিত হওয়া যেত। এখন যে পরীক্ষা ও সে অনুপাতে যে শনাক্ত হার, তাতেও ফল ভালো আসছে। এখন কমতেই থাকবে।’
দরকার ইউনিফর্ম পরীক্ষা : অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ইউনিফর্ম ধরনের পরীক্ষা শুধু স্কুল-কলেজ খোলার জন্যই দরকার নয়; সবকিছুর জন্যই সার্বিক পরীক্ষা দরকার। সংক্রমণ বুঝতে হলে এ ধরনের পরীক্ষা দরকার। এ ধরনের পরীক্ষার সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু সক্ষমতাটা গোছানো নয়। আমরা যদি সব জেলায় একটা করে পরীক্ষা কেন্দ্র করতে পারতাম, তাহলে বলতে পারতাম ইউনিফর্ম নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে পরীক্ষা বেশি হচ্ছে। অন্য জায়গায় তেমন হচ্ছে না। টেস্টিং সেন্টার থাকলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হতো। এখন যে পরিমাণ পরীক্ষা হচ্ছে ও তাতে যে শনাক্ত হার, সেটা অনুযায়ী আমরা স্কুল-কলেজ খোলাসহ জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিতে পারি। তবে আরও পরীক্ষা করা গেলে সিদ্ধান্ত আরও সঠিক হতো।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শনাক্ত হার ৫ শতাংশ হলো মহামারীর একটা ন্যূনতম লেভেল। ৫ শতাংশের বেশি হলে মহামারী বলা হয়। ৫ শতাংশের নিচে নামলে সংক্রমণ সহনীয় মাত্রায় বলা হয়।’
প্রকৃত অবস্থা বুঝতে দরকার সার্ভে : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে যাদের লক্ষণ আছে এবং পজিটিভদের সংস্পর্শে যারা এসেছে, তাদের সবার টেস্ট করতে হবে। সাধারণ মানুষের টেস্ট করলে পজিটিভ পাওয়া যাবে না, গেলেও খুবই কম। এভাবে যদি দেখা যায় শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে আছে, তখন বাচ্চাদের স্কুল খোলার জন্য ইউরোপে বলেছিল। তবে এটা নিশ্চিত কোনো ফর্মুলা না। দেশ সিদ্ধান্ত দিতে পারে কখন খুলবে।’
তিনি বলেন, এখন যেটা হচ্ছে সার্ভিলেন্সে (নজরদারি)। সার্ভিলেন্সের তথ্য দিয়ে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না, সার্ভে করতে হয়। সার্ভে দিয়ে প্রতি ১ বা ১০ লাখের রোগীর হার কত, সেটা বের করা যায়। সার্ভিলেন্স দিয়ে মূলত রোগের প্রবণতা বোঝা যায় রোগ বাড়ছে না, কমছে; ছড়াচ্ছে, না এক জায়গায় আছে। আর শনাক্ত হার বুঝতে হলে সার্ভে করতে হবে। তবে সার্ভিলেন্সের ডেটা থেকে হার পরোক্ষভাবে বোঝা যায়।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এখন যেটা হচ্ছে সার্ভিলেন্সে (নজরদারি)। সার্ভিলেন্সের তথ্য দিয়ে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না, সার্ভে করতে হয়। সার্ভে দিয়ে প্রতি ১ বা ১০ লাখের রোগীর হার কত, সেটা বের করা যায়। সার্ভিলেন্স দিয়ে মূলত রোগের প্রবণতা বোঝা যায়- রোগ বাড়ছে না, কমছে; ছড়াচ্ছে, না এক জায়গায় আছে। আর শনাক্ত হার বুঝতে হলে সার্ভে করতে হবে। তবে সার্ভিলেন্সের ডেটা থেকে হার পরোক্ষভাবে বোঝা যায়।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য সুসংগঠিতভাবে পরীক্ষা যদি নাও করতে পারি, কিন্তু হাসপাতালের দিকে তাকালেও বোঝা যাবে। শনাক্ত হার তো আছেই। হাসপাতালে রোগী বাড়ছে না কমছে, সেটা দেখলেও চিত্র বোঝা যায়। এখন হাসপাতালগুলো খালি হয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ জায়গায়।’
কখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে জানতে চাইলে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ইউরোপে স্কুল খুলেছিল চরম লকডাউনের মধ্যেও। কারণ সেখানে বাচ্চাদের স্কুল হচ্ছে কর্মজীবী মা-বাবাদের জন্য একটা ডে-কেয়ার সেন্টার। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সেখানে স্কুলটা হচ্ছে বাচ্চাদের পুষ্টি ও কাপড়চোপড়, লেখাপড়া সব ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশে করতে হবে এর উল্টোটা। আগে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে হবে। যেখানে আবাসিক সুবিধা আছে। ধীরে ধীরে কমবয়সীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। সবার শেষে বাচ্চাদের স্কুল খুলতে হবে। আগে শহরের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা যেতে পারে। পরে কলেজ, তারপর হাই স্কুল, সবার শেষে প্রাইমারি স্কুল খুলতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এখন শনাক্ত হার ও রোগীর সংখ্যাও কম। এখন পরীক্ষা বাড়ালেও রোগীর সংখ্যা খুব একটা বাড়বে না, শনাক্ত হার কমবে। শনাক্তের হার বেশি থাকলে পরীক্ষা বাড়ানো অবশ্যই উচিত। আদর্শ হলো শনাক্ত হার যেন ৮-১০ শতাংশের মধ্যে থাকে, এভাবে পরীক্ষা করা। অর্থাৎ ১০০ জনকে টেস্ট করে ৮-১০ জন যেন শনাক্ত হয়। শনাক্ত হার এর চেয়ে বেশি হলে যথেষ্ট পরীক্ষা হচ্ছে না বলে ধরে নেওয়া হয়। এখন তো শনাক্ত হার নিম্নগামী। তবে ১৭ শতাংশও অনেক বেশি। পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে শনাক্ত হার কমানোর দরকার নেই। যারা শনাক্ত হতে চায় না, তাদের টেস্ট করতে হবে। তারা যেন টেস্টের আওতায় আসে।’
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এখনকার অনুপাতে যে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটা যথেষ্ট। যদি সংক্রমণ কম থাকে তাহলে পরীক্ষা বাড়ালে শনাক্ত হার কমে যাবে। সংক্রমণ যদি বেশি থাকে তাহলে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ালে শনাক্ত হার না বাড়লেও রোগীর সংখ্যা বাড়ে। এখন তো কমতির দিকে। পরীক্ষা বাড়ালে শনাক্ত হার আরও কমবে, তবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে।’
এ মাসেই ১০ শতাংশে নামার সম্ভাবনা : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এখন সংক্রমণ নিম্নগামী। এখন যে শনাক্ত হার, সেটা ১১ আগস্টের আগের যে বিধিনিষেধ ছিল, সেটার প্রভাব। পরপর দুবার বিধিনিষেধের পর এখন যদি বিভিন্ন স্থানে সংক্রমণের গুচ্ছগুলো ভেঙে দিতে পারি, তাহলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়বে না। বাড়লেও ধীরে ধীরে বাড়বে। কারণ ১১ আগস্ট থেকে সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলো, সেটার কারণে আবার সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এ সপ্তাহের মধ্যেই শনাক্ত হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে পারে। কিন্তু সেটা নাও হতে পারে। কারণ দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় দ্রুত চূড়ায় উঠেছে ও দ্রুত নেমেছে। তখন শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে নামেনি, ৭ শতাংশে ছিল। তারপর আবার বেড়ে গেল।’
৯ সপ্তাহ পর শনাক্তের হার কমে ১৫% : দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার তুলনায় দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার ৯ সপ্তাহ পর আবার ১৫ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে ৩১ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করে দেশে ৪ হাজার ৮০৪ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১৩৯ জনের। তাতে দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার দাঁড়াচ্ছে ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ১৭ জুনের পর সর্বনিম্ন। সেদিন ২৪ হাজার ৮৭১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩ হাজার ৮৪০ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছিল, শনাক্তের হার ছিল ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জুলাই মাসের বেশিরভাগ সময় এই হার ৩০ শতাংশের আশপাশে ছিল। সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত মোট ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৯৮ জন কভিড রোগী শনাক্ত হলো; তাদের মধ্যে ২৫ হাজার ২৮২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শনিবার তার আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২৪ হাজার নমুনা পরীক্ষা করে দেশে ৩ হাজার ৯৯১ জন নতুন রোগী শনাক্তের কথা জানিয়েছিল। আর মৃত্যু হয়েছিল ১২০ জনের।
