হামলা সংঘর্ষ মামলার পর মেয়র-ইউএনও ‘সমঝোতা’

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২১, ০২:৪০ এএম

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনের সামনে থেকে ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে ‘ভুল বোঝাবুঝি’র কারণে হামলা, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনার ‘মীমাংসা’ হয়েছে। গতকাল রবিবার রাতে বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদলের সরকারি বাসভবনে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এক ‘সমঝোতা’ বৈঠকে মামলা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। বৈঠকে অংশ নেওয়া মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীর বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

গত বুধবার রাতে বরিশাল সদরের ইউএনও মুনিবুর রহমানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাসের কথা-কাটাকাটি হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ সময় ইউএনওর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আনসার সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতি শুরু হলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ইউএনওর বাসায় হামলা চালান। পরে আনসার সদস্যরা গুলি ছুড়লে চারজন আহত হন। পরদিন এই ঘটনায় মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে ইউএনও এবং সদর থানার ওসি দুটি মামলা করেন। এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বরিশালের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তার দাবি করা হয়। এর পর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন মেয়র। এর মধ্যে গতকাল সকালে  ইউএনও মুনিবুর রহমান, কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম ও উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজালাল মল্লিকের নামে পৃথক দুটি মামলার আবেদন করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা বাবুল হালদার এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। বিকেল সাড়ে ৪টায় আদালত অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পিবিআইকে নির্দেশ দেয়।

এরপর গতকাল রাতে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠকটি বসে। বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল, মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ,  বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান, জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন। সমঝোতা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এ কে এম জাহাঙ্গীর। গতকাল রাতে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা উভয়েই বুঝতে পারছি যে, আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে সরকারের বদনাম হচ্ছে। তাই আমরা চাই, যেটা হয়েছে সেটা এ পর্যন্তই থেমে যাক।’

আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘বিভাগীয় কমিশনার রাতে আমাদের সবাইকে চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এ কারণে মেয়রসহ আমরা সকলে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। চা খেতে খেতে ১০-১৫ মিনিটের মতো আমাদের মধ্যে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা হয়। আসলে যা ঘটেছে সেটা অনাকাক্সিক্ষত এবং ভুল বোঝাবুঝি। তাই বিষয়টি এ পর্যন্তই শেষ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সমঝোতার কারণে পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বা বিসিসির কর্মীদের কোনো প্রকার হয়রানি করবে না। আমাদের নেতাকর্মীরাও কোনো প্রকার আন্দোলনে যাবে না। উভয়পক্ষের মামলার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হবে।  সমঝোতার বিষয়ে আওয়ামী লীগ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।’ 

অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আপনারা যা চান আমরাও তাই চাই।

এদিকে বরিশালের মেয়রের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনাটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তার মতে, এটা অচিরেই মিটে যাবে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বরিশালের আলোচিত ঘটনাটি নিয়ে এই প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।

তবে বিরোধী দল বিএনপি বরিশালের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ‘অনির্বাচিত’ সরকারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছে। গতকাল দলটির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ মন্তব্য করা হয়।

বরিশাল সিটি মেয়রের বিরুদ্ধে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুনিবুর রহমানের করা মামলা দায়ের ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ঢাকায় অবস্থানরত বরিশাল বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীবৃন্দ ও সচেতন নাগরিক সমাবেশ। গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে এ দাবি জানান তারা। মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, ‘বরিশালের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ যুবসমাজের আইকন। এখানে যারা এসেছেন সবাই তাকে ভালোবেসে এসেছেন। শোকাবহ আগস্ট মাসে তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে এটা দুঃখজনক। কারণ এ মাসেই তার পরিবারের ছয়জন সদস্য নিহত হয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের আবেদন, এ মামলা যাতে দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।’

গতকাল আদালত সূত্রের বরাতে বরিশাল প্রতিনিধি জানান, বরিবার সকালে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে দুটি নালিশি অভিযোগ দায়ের করা হয়। গতকাল সকালে বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা পৃথক মামলা দুটি দায়ের করেন অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস ও অ্যাডভোকেট দিলীপ ঘোষ। আদালতের বিচারক মো. মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ দুটি পরবর্তী আদেশের জন্য রাখেন।

এর মধ্যে একটি মামলার বাদী বরিশাল সিটি কপোরেশনের প্যনেল মেয়র (২) অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন। তার মামলায় বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নুরুল ইসলাম, কোতোয়ালি মডেল থানার উপপুলিশ পরিদর্শক মো. শাহজালাল মল্লিক ও আনসার সদস্য ইউএনওর দেহরক্ষীসহ অজ্ঞাত ৪০-৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অপর একটি মামলা দায়ের করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা বাবুল হালদার। ওই মামলায় সদর ইউএনও মুনিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আনসার সদস্য ইউএনওর দেহরক্ষীসহ অজ্ঞাত ৪০-৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এর আগে  বৃহস্পতিবার দুপুরে কোতোয়ালি থানায় পৃথক দুই মামলায় এখন পর্যন্ত ৮ আসামিকে গেপ্তার করা হয়েছে।  গতকাল সকাল ১০টার দিকে  তাদের আদালতে হাজির করে তাদের জামিন আবেদন করা হয়। অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম বিল্লাহ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠান। একই সঙ্গে তাদের সুচিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। ওই দুটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত