প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ০২:৪৮ এএম

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি দিনে দিনে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে চাপা পড়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের চার বছর শেষ হচ্ছে আজ। কাল থেকে পঞ্চম বছরে পড়বে। করোনা মহামারী ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে প্রায় দুই বছর ধরে। এরমধ্যে আবার নতুন করে আফগান শরণার্থীর দিকে নজর দিয়েছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সুদূর হয়ে যাচ্ছে।

গত চার বছর ধরে বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে বারবার মিয়ানমার সরকারকে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন’ বিষয়ে বলা হলেও একজনও রোহিঙ্গা তাদের দেশে ফেরত যায়নি।  এটা এখন সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারপক্ষ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। করোনা মহামারীর কারণে এমনিতেই সারা বিশ্বে একধরনের আর্থিক সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কমছে রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের জন্য দাতাদের প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তার পরিমাণ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দুই শক্তিশালী দেশ ভারত ও চীনের নীরব ভূমিকাও প্রত্যাবাসন থেমে থাকার বড় একটি কারণ। তারা বলছেন, যত দিন যাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তত কঠিন হবে। মিয়ানমার তো অবশ্যই চাইবে না রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। সেই ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের সফল। কারণ চার বছর পর্যন্ত তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আটকে রাখতে পেরেছে। মিয়ানমারের রাখাইনেও তারা এমন পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে, যেন রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে ভয় পায়। তাই বাংলাদেশকে চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের একার প্রচেষ্টায় এই প্রত্যাবাসন অনেক কঠিন হবে। কারণ মিয়ানমার একটা কঠিন পক্ষ। চীন ও ভারতকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। তারা বলছেন, মিয়ানমারের এই দুই প্রতিবেশী দেশ  মিয়ানমারকে কোনো ধরনের চাপ দিচ্ছে না। তারা শুধু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সাধারণভাবে উৎসাহ জোগাচ্ছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা করতে হবে। তা না  হলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো কঠিন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক চাপ না বাড়ালে প্রত্যাবাসন আরও মন্থর হবে। তিনি বলেন, মহামারীর কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন অন্যান্য কাজকর্ম শুরু হয়েছে। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজও শুরু করতে হবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের ওপর বহুমাত্রিক চাপ বৃদ্ধির কাজ করা যায়। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়গুলো আলোচনা করতে হবে। মিয়ানমারে যারা বিনিয়োগ করতে চাইছে তারা যাতে সেখানে বিনিয়োগ না করে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাপনাও রয়েছে। যারা মিয়ানমারের পক্ষের দেশ তারাও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছে। এটা এখন সর্বজনীন দাবি। এখন কভিড-১৯ মহামারীর কারণে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। মিয়ানমার এই বিলম্ব করছে। আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। ছয় লাখ রোহিঙ্গার নাম-ঠিকানাসহ তালিকা মিয়ানমারের কাছে দিয়েছি।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার দুই পর্যায়ে মাত্র ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে যাচাই করে প্রত্যাবাসনের জন্য চূড়ান্ত করেছে। তার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের মাত্র আট হাজারের তালিকা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ২২ হাজারের তালিকা এখনো দেয়নি। মহামারীর পাশাপাশি গত বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের কারণেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে আছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে সেটি স্থগিত করা হয়। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর কাজও শুরু করেছে বাংলাদেশ। এ মাসের শেষ দিকেও কিছু রোহিঙ্গা ভাসানচর যাবে।

এদিকে গত ১৮ জুন ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ক গৃহীত রেজুলেশনে দেশটির গণতান্ত্রিক সমস্যা, জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক বন্দি, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার প্রতি নজর দেওয়া হলেও প্রায় চার বছর ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের  বিষয়টি  সমাধানের জন্য কোনো আলোচনা করা হয়নি। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায় থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে এমন উদাসীনতা প্রশ্নের উদ্রেক তৈরি করে বটে। 

রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের এ ধরনের বর্বরতা প্রথম নয়। বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের তাদের আবাস থেকে উচ্ছেদের নানা প্রচেষ্টা চলমান ছিল। সবশেষ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মায়ানমার সেনাবাহিনী  লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, শিশু ও নারী নির্যাতন, বেদম প্রহার, ঘরবাড়ি স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফার একটি সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে নাগরিকত্বের ওপর। ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় সংযুক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে। এছাড়া ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে কফি আনান কমিশনের সুপারিশের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যে সমস্যার সমাধান করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দলিলটি রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়ে অন্যতম মাইলফলক বলে ধরা হলেও মিয়ানমার সরকার বরাবরই ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী’ শব্দকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। তবে, এ চুক্তির আলোকেই ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট মায়ানমার বাংলাদেশ থেকে প্রথম পর্যায়ে সাত ভাগে ভাগ করে করে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে নিজেদের দেশে ফেরত নেওয়ার কথা বলেছে। তবে তা এখনো হয়নি। 

এরপর ২০১৯ সালে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আরোপিত মামলা- Application of the Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide (The Gambia v. Myanmar) করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি সেই মামলার শুনানি শেষে অন্তর্বর্তীকালীন প্রত্যাবাসনে বিষয়টি না এলেও রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই অধিবাসী সেটি স্পষ্ট করা হয়েছে।

এদিকে এ বছরের ৩১ মে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, ইউএনএইচসিআরের দুজন কর্মকর্তার ভাসানচর সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি। এ বছরেরই ১৬ জুন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন এস বার্গনারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠককালে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জাতিসংঘে স্পষ্ট একটি রোডম্যাপ তৈরির বিষয়টি নজরে আনা হয়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মাত্র দুদিনের ব্যবধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ক গৃহীত রেজুলেশনে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। আমাদের চীন এবং ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই সংকট সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, করোনা এবং গত নভেম্বরে মিয়ানমারের নতুন শাসকের কারণে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও কিছুটা মন্থর হয়েছে। তবে এই চাপ বাড়াতে হবে। শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত