আইপি টিভির নামে সাত মিনিটের জন্য লাখ টাকা

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ০৩:০৪ এএম

আইপি টিভি নামধারী সি ভিশনে কারও বিরুদ্ধে সাত মিনিটের একটি সংবাদের দাম এক লাখ টাকা! টিভিটির মালিক পরিচয় দেওয়া জনৈক আরিয়ান লেনিনকে এক অডিও রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, ‘ইসলামী কলেজের ভিপি খলিলুর রহমান নাহিদের একটি সাত মিনিটের নিউজের দাম ১ লাখ টাকা।’

সংবাদ প্রচারের নামে প্রচারণা করেই ক্ষ্যান্ত নন তারা। ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনার মামলা মীমাংসাও করেছে। মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব দিয়ে দুপক্ষকে কখনো কৌশলে আবার কখনো সংবাদের নামে চরিত্র হননের ভয় দেখিয়ে তাদের বৈঠকে বসতে বাধ্য করে।

চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড়ে লিলি ভবনের নিচতলায় থাকা সি ভিশন নামের ওই আইপি টিভিটির কার্যালয়ে হয় দফারফা করার বৈঠক। আর এসব কিছুর আয়োজন করেন সি ভিশনের কথিত মালিক আরিয়ান লেনিন।

দেশ রূপান্তর আইপি টিভির পরিচয়ধারী অনিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানের সুলুক সন্ধান করেছে। এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আরিয়ান লেনিনের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং সি ভিশনের এক সাবেক কর্মীর দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে আইপি টিভির নামে চাঁদাবাজির তথ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর ১৫ মে রাতে কক্সবাজারে নাপিতখালী এলাকায় ভাড়া বাসায় সাবেক স্বামী মো. মোরশেদের (৩১) হাতে ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। পরদিন কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন ওই নারী। সি ভিশনের ফেইসবুক পেজ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে কল করে সহায়তা চান ভুক্তভোগী নারী। তাকে সাহায্যের কথা বলেন টিভিটির মালিক পরিচয় দেওয়া আরিয়ান লেনিন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরিয়ান লেনিন টিভিটির সিনিয়র রিপোর্টার।

ওই নারীর অভিযোগ, আরিয়ান লেনিন নিজেকে মালিক পরিচয় দিয়ে বেশ কিছুদিন কথা বলেন। সবকিছু শুনে পরে অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর ধর্ষণ মামলা তুলে আপসের কথা বলেন আরিয়ান লেনিন। প্রস্তাব দেন ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা মিটিয়ে ফেলতে। কিন্তু সে প্রস্তাবে সাড়া না দিলে সি ভিশনের কথিত মালিক ও সাংবাদিকরা ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্র হনন করা শুরু করে। এমনকি তার (ধর্ষণের শিকার নারী) বিরুদ্ধে নিউজ করার ভয় দেখিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদাও দাবি করে। ক্যামেরা নিয়ে ওই ভুক্তভোগী নারীর ও আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছে টিভিটির সাংবাদিকরা। মামলায় মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আরিয়ান লেলিন ওই নারীর পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করার কথা বলে অভিযুক্ত মোরশেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আরিয়ান লেনিন কৌশলে উভয়পক্ষকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড়ে ‘ওআর নিজাম রোডের’ লিলি ভবনের নিচতলায় সি ভিশনের অফিস বসেন। কিন্তু এ প্রস্তাবে ওই নারী রাজি না হওয়ায় বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকেন। মামলা মীমাংসা না করায় একপর্যায়ে ওই নারীর চরিত্র খারাপ বলে নিউজ করার ভয় দেখানো হয়। ভুক্তভোগী নারীর ভাড়া বাসা ও নিজ বাড়ি ও বোনের বাড়িতে সি ভিশনের ‘সাংবাদিক’রা গিয়ে নানা আপত্তিকর কথা বলে। ভাড়া বাসার মালিকের ছেলেকে ভয় দেখিয়ে ক্যামেরার সামনে মিথ্যা বক্তব্যও রেকর্ড করান আরিয়ান লেলিন ও তার সহযোগীরা।

ভুক্তভোগী নারী নিরুপায় হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় গত ১৮ জুলাই একটি সাধারণ ডায়েরিও করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘কথিত অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে হুমকি ও টাকা দাবি করছে।’

ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে আরিয়ান লেনিনের ফোনে কথোপকথনের কিছু অডিও রেকর্ড এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। তার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো

আরিয়ান লেনিন : ওরা আজকে ধরেন আমাকে দিতে চাইবে (টাকা), আজাদ ভাইকে দিল, আপনি আরেকটা সাংবাদিককে ধরলে ওকে দিতে যাবে। আপনার কক্সবাজার থানার আইওকে দিতে যাবে। সব জায়গাতে দিতে দিতে একসময় এ মামলাগুলো চলমান প্রক্রিয়ায় ও জামিনে থেকে এভাবেই চলতে থাকবে, কিছুই হবে না। তো লাভটা কার। এখন তো মোরশেদের বাপের ১০ থেকে ১১ লাখ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আছে। তাহলে এই টাকাটা আপনি কেন নেবেন না।

আরিয়ান : মোরশেদের প্রতি আমার মায়া-দয়া ইমোশন কোনোটাই নেই কিন্তু ওর বাবা কালকে যখন আমার পায়ে ধরছে, কান্না করছে, বলছে ‘আই টেহা দিতে কোনো সমস্যা নেই’ তখন একটা জিনিস মনে হয়েছে আপনার ১১ লাখ ৩০, এক টাকা ৩০ যাই হোক, আপনি টাকাটা নিলে টাকাটা আপনি পাবেন।

প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় উল্টে যায় আরিয়ান লেনিনের কর্মকান্ড। ওই নারীর বিরুদ্ধে নিউজ করার হুমকি দিলে কথোপকথনের একপর্যায়ে ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘আমি যদি হেনস্তা করে থাকি তার তো প্রমাণ লাগবে। তো নিউজ করলে করুক। আমার কী সমস্যা। প্রমাণ ছাড়া কোনো চ্যানেল আছে বাংলাদেশে যে আমার বিরুদ্ধে নিউজ করবে। আমি তো এটা চ্যালেঞ্জ করব। কে কী বলছে, কী অফার করছে সবকিছু আমার কাছে রেকর্ড আছে।’

আরিয়ান : আপনার শ্বশুররা (ডিভোর্স হওয়া মোরশেদের বাবা) একটা অভিযোগ করছে, ওনাদের বললাম আপনারা আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেন। তারা বলল আপনারা নাকি ওনাদের বাড়ি সাংবাদিক পাঠাচ্ছেন, হেনস্তা করছেন। তখন মিজান ভাইকে (সি ভিশনের এডিটর পরিচয়দানকারী) বলছে আপনারাও একটা নিউজ করেন। সে হিসেবে মিজানভাই ওদের সঙ্গে কথা বলেছে। বিষয়টি মিজান ভাই দেখছে।

আরিয়ান : শামীম যদি ৩ লাখ টাকাও দেয় তাহলে কত বড় লোভ আমি সামলাচ্ছি। ওরা কি একটা সময় বলে নাই আপনার বিরুদ্ধেও নিউজ করতে। ওরা কি আমাকে লাখ টাকাও দিত না, দিত। আমার এমনও নিউজ আছে, ইসলামী কলেজের ভিপি খলিলুর রহমান নাহিদের ঘাট নিয়ে একটি সাত মিনিটের নিউজ আছে, ওই নিউজের দাম কিন্তু ১ লাখ টাকা।

ওই নারী দেশ রূপান্তরকে অভিযোগ করে বলেন, ‘সাংবাদিকের সহায়তা চেয়ে কী যে বিপদে ফেঁসে গেছি তা বলার নয়। সি ভিশনের মালিক পরিচয় দেওয়া আরিয়ান লেনিন মামলা মীমাংসার প্রস্তাব দিলে আমি বলেছি বিষয়টি কোর্টে ফায়সালা হবে। সে কৌশলে চট্টগ্রামের সি ভিশনের অফিসে আমাকে এনে সমঝোতায় বসায়। সেখানে ১১ লাখ টাকায় মিটমাট করতে বলে। আমি রাজি না হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে নিউজ করবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। সর্বশেষ বলেছে ২ লাখ টাকা না দিলে আমার চরিত্র খারাপ বলে নিউজ করে দেবে। সবকিছু আমার কাছে রেকর্ড করা আছে। আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।’

এদিকে সি ভিশনের সাবেক এক কর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সেখানে এক মাসও কাজ করিনি। তাদের কাজকর্ম আমার ভালো লাগেনি, এজন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। আমারও তো জীবনের নিরাপত্তা দরকার।’

ধর্ষণের শিকার নারীকে সমঝোতার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিয়ান লেনিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সি ভিশন টিভির ফেইসবুক পেজের মাধ্যমে ওই ভুক্তভোগী নারী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ প্রকাশের জন্য অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে নিউজ না করার অনুরোধ করে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীকে মামলা মীমাংসা করার জন্য আমাকে অনুরোধ করে। আমি ওই নারীকে মীমাংসার প্রস্তাব দিই। পরে দুপক্ষের সম্মতিতে আমাদের অফিসে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়। এরপর বাইরেও তারা একাধিকবার বৈঠক করেছে কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

সমঝোতায় রাজি না হওয়ায় ভুক্তভোগী নারীর চরিত্র হনন করা ও ২ লাখ টাকা দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘টাকা দাবির বিষয়টি সত্য নয়। আর ওই নারী তথ্য গোপন করে মামলা করে। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ভুক্তভোগী নারীর বিষয়ে খোঁজখবর নিই। তার বিরুদ্ধে নিউজ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

সাত মিনিটের সংবাদে ১ লাখ টাকা নেওয়ার অডিও রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রসঙ্গক্রমে বিষয়টি আসে।’

ভুক্তভোগীকে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া এবং আইপি টিভিতে সংবাদ প্রকাশে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও কেন তারা এসব করছেন জানতে চাইলে লেলিন বলেন, ‘আমার চাকরি চলে গেছে, আমি এখন সি ভিশনের সঙ্গে নেই।’

আরিয়ান লেনিনের উকিল নোটিস : গত ১৩ আগস্ট দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আইপি টিভিতে এরা কারা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের একটি অংশে আরিয়ান লেনিন ও আইপি টিভি সি ভিশনের কিছু কর্মকা- উল্লেখ করা হয়। এই সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট আইনজীবীর মাধ্যমে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক ও প্রতিবেদককে পৃথক লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছেন আরিয়ান লেনিন। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য এ লিগ্যাল নোটিস দেন তিনি। লিগ্যাল নোটিসে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনে সি ভিশনের মালিক হিসেবে আরিয়ান লেনিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোটেই সত্য নয়। আরিয়ান লেনিন সি ভিশনের শুধু একজন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার। প্রতিবেদনে আরিয়ান লেনিনের বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টির নেতা সোলায়মান আলম শেঠ কর্তৃক গত বছরের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করার কথা উল্লেখ থাকলেও ওই তারিখে চকবাজার থানায় আরিয়ান লেনিনের বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ ডায়েরির অস্তিত্ব নেই। তার বিরুদ্ধে উল্লিখিত প্রতিবেদনে প্রকাশিত চাঁদাবাজির অভিযোগ সুনির্দিষ্ট নয় এবং ওই প্রতিবেদনে কোনোরূপ তথ্য প্রমাণাদি উল্লেখ করা হয় নাই। অতএব অত্র নোটিস প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে প্রচারিত প্রতিবেদনটি প্রত্যাহারপূর্বক দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইবেন।’

প্রতিবেদকের বক্তব্য : সি ভিশন কোনো নিবন্ধিত আইপি টিভি না। ফলে মালিকানার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট না। আরিয়ান লেনিন সবার কাছে সি ভিশনের মালিক পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তাদের ফেইসবুক পেজে আরিয়ান লেনিনের ফোন নম্বর থাকলেও তার পদবি দেওয়া নেই। শেঠ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ সোলায়মান আলম শেঠ গত বছরের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় আরিয়ান লেনিন ও মোহাম্মদ সেলিম নামে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংবাদিক পরিচয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় ও কাল্পনিক সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। যার নম্বর ১০২০। জিডির কপি দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। প্রকাশিত সংবাদটিতে ভুলক্রমে গত বছরের ২০ এপ্রিল ছাপা হয়েছে।

এছাড়া লিগ্যাল নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, আরিয়ান লেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদে চাঁদাবাজির অভিযোগ সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে আজ ‘আইপি টিভির নামে সাত মিনিটের জন্য লাখ টাকা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরা হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত