সচিবের মাকে দেখভালে এখন ২৪ জনের কেউ নেই

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ০২:১৩ এএম

রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাকে দেখভালে দায়িত্ব দেওয়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিবসহ ২৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ এখন আর হাসপাতালে নেই। গত সোমবার রাতে তালিকা করে দেখভালের খবর প্রকাশ হয়ে গেলে গতকাল মঙ্গলবার সারা দিন সচিবের মায়ের পাশে মন্ত্রণালয়ের কাউকে দেখা যায়নি। দুপুরে সচিবের মায়ের পাশে তিনজন মধ্যবয়সী নারীকে দেখভাল করতে দেখা যায়। তারা সচিবের মায়ের স্বজন বলে পরিচয় দিলেও তারা তাদের নাম ও স্বজনের ধরন বলেননি।

হাসপাতাল থেকে জানা গেছে, করোনা ইউনিট-১ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন সচিব রওনক মাহমুদের মা মজিরুন্নেসা। তার বয়স ৯৫ বছর। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বয়সের কারণে ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সচিবের মাকে দেখভালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধীনস্ত দপ্তরের ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- এমন তথ্য পাওয়া যায় গত সোমবার রাতে। স্মারক নম্বর ও তারিখবিহীন এ সংক্রান্ত একটি লিখিত আদেশও দেখা যায়। আদেশের শুরুতেই বলা হয়- ‘সম্মানিত সচিব স্যারের শ্রদ্ধেয় মায়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকল্পে নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বর্ণিত সময়সূচি অনুযায়ী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের আইসিইউ-কভিড-১৯ বেডে (করোনা ওয়ার্ড-১, ইমার্জেন্সি দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিকে) দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করা হলো।

ওই আদেশে তিন দিনে পালা করে তাদের এ কাজ করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, এই ২৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব সমন্বয় করছেন সচিবের একান্ত সচিব আজিজুল ইসলাম। সচিবের মায়ের সার্বিক অবস্থা জানাতে হবে পিএসকে, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ, টেস্ট করানোর ও তা দ্রুত সংগ্রহ করা এবং হোয়াটসঅ্যাপে সচিবের পিএসকে রিপোর্টের কপি পাঠাতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে থাকতে হবে রোগীর কাছাকাছি, রোগীর আত্মীয়দের কাছে জানান দিতে হবে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি।

গত সোমবার রাতে গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে এমন কর্মকাণ্ডের কথা গণমাধ্যমের কাছে অস্বীকার করেছেন সচিবের একান্ত সচিব আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিষয়টি কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে করেছে। হাসপাতালে গেলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

একান্ত সচিব আরও বলেন, আমাদের সচিব স্যারের মায়ের বয়স ৯৫। তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সচিব স্যারও অসুস্থ, তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক সপ্তাহ আগে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। তাই আমরা মানবতার খাতিরে অনেকেই সচিব স্যারের মাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছি। সে বিষয়টা জেনে সচিব স্যার আমাদের বলেছেন হাসপাতালে ভিড় করা যাবে না। যদি কেউ দেখতে যান তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন সময়ে যেতে হবে। একসঙ্গে জটলা করে যাওয়া যাবে না। 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি বলেও জানান এই একান্ত সচিব। তিনি বলেন, যে চিঠিটি গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে সেখানে কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর বা স্মারক নম্বরও নেই। এটি একটি ভুয়া চিঠি।

পরে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এ নিয়ে কথা বলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, পত্রিকার সূত্র ধরে জানতে পেরেছি, আমাদের মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের মা অসুস্থ। সেখানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দেখভাল করছেন বলে একটি নিউজ এসেছে। সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমি তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তিনি বলেছেন, এটি সঠিক নয়। তিনি কাউকে কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব দিয়ে ওখানে পাঠাননি। সচিব নিজেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারপর তার ৯৫ বছর বয়সী মা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। সচিব নিজেই অসুস্থ। এমন বিপদের সময়ে মন্ত্রণালয়ের অনেকে সহানুভূতি জানাতে হাসপাতালে গিয়েছেন। সচিব কাউকে কোনো দায়িত্ব দেননি। মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, মন্ত্রণালয় থেকে এরকম কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমে এসেছে সচিবের মাকে দেখাশুনার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুধু দায়িত্বই দেওয়া নয়, রীতিমতো চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু করা হলে কারও না কারও সই থাকে, মেমো নম্বর থাকে, তারিখ থাকে, এগুলো কিছুই করা হয়নি। আমি চেক করে দেখেছি, মন্ত্রণালয় থেকে এ রকম কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, সচিবও কাউকে এরকম দায়িত্ব দেননি বলে আমাকে জানিয়েছেন। সচিব বলেছেন, তার মাকে কেউ কেউ দেখতে যেতে পারেন। করোনায় উপচেপড়া ভিড় হওয়ার কারণে অনেকে হয়তো আলাদা আলাদা যেতে পারেন। কেউ গেছেন কি না সেটিও সচিব বলতে পারেননি। কেউ গেলে নিজ দায়িত্বেই যেতে পারেন।

অবশ্য হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবের মাকে দেখভালের ঘটনা সত্য বলে জানিয়েছেন। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, হাসপাতালের কভিড ইউনিট-১ ওয়ার্ডের দুই নম্বর আইসিইউ বেডে সচিবের মা চিকিৎসাধীন। এই ওয়ার্ডে চারটি আইসিইউ বেড। সেখানে সোমবার রাতেও অনেক মানুষ দেখা গেছে। মন্ত্রণালয় থেকে তালিকার কথা অস্বীকার করা হলেও সেখানে গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পালাক্রমে অবস্থান করতে দেখা গেছে। লোকজন ছিল। সেখানে উপস্থিত লোকজনও স্বীকার করেছেন তারা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এই প্রতিবেদক সরেজমিন গতকাল দুপুরে কভিড ইউনিট-১ ওয়ার্ডের আইসিইউতে গেলে সচিবের মায়ের দুই নম্বর আইসিইউ বেডের পাশে তিনজন মধ্যবয়সী নারীকে দেখভাল করতে দেখা যায়। তারা নিজেদের সচিবের আত্মীয় পরিচয় দিলেও নাম বলেননি। তবে এ সময় মন্ত্রণালয়ের কাউকে দেখা যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বর্তমানে কভিড ইউনিটে দায়িত্বরত কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন উলুব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওনার (সচিবের মা) শারীরিক অবস্থা এখন একটু স্ট্যাবল। তারপরও করোনার ব্যাপার। তার ওপর ওনার বয়স ৯৫ বছর। এই জন্য কিছু বলা যায় না। তবে আমরা তার সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী।

এই চিকিৎসক অবশ্য তালিকা করে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সচিবের মাকে দেখভালের বিষয়ে কিছু বলেননি।

করোনা ওয়ার্ডের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি জায়গায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যতিরেকে এভাবে লোকজনের যাওয়াটা উচিত নয় বলে মনে করেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা সংক্রামক ব্যাধি। করোনা মহামারীর পর সারা বিশ্বেই নির্মমতা ও মমত্বহীনতার চিত্র মানুষ দেখেছে। শুরুতে করোনা রোগীর পাশে কোনো চিকিৎসক ও নার্স যেতে চাইতেন না। স্বজনরাও যেতেন না। এখন সুরক্ষা নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সরা সেবা দিচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো রোগীর পাশে যান না। এমনকি মারা যাওয়ার পর তাদের বিশেষ সুরক্ষার মধ্য দিয়ে দাফন বা সৎকার করা হয়। স্বেচ্ছাসেবকরা এসব কাজ করছেন। বিশেষ করে করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউ খুবই স্পর্শকাতর। সেখানে নানা ধরনের করোনা রোগী রয়েছেন। এমন অবস্থায় সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করোনার মতো একটি সংক্রমিত জায়গায় ওই রোগীর পাশে দেওয়াটা খুবই খারাপ ও অমানবিক। এই ওয়ার্ড ও আইসিইউতে যারা যান, তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষা নেন। সেখানে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া কারও যাওয়া ঠিক নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত