করোনার স্থবিরতা কাটেনি অগ্রাধিকার প্রকল্পে

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ০২:১৪ এএম

করোনা পরিস্থিতিতে ঝিমিয়ে পড়া অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারভুক্ত (ফাস্ট ট্র্যাক) উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। ইতিমধ্যে কয়েকটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, দুয়েকটির মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ার পথে আবার এর কয়েকটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, এসব প্রকল্পে কাজের স্বাভাবিক করতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার বিকল্প নেই। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানোর বিষয়ে সরকার আন্তরিক।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়েছে। মহামারীর পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে আমারা এগিয়ে চলছি। জীবন ও জীবিকা স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের গতিতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছিল। কিন্তু কাজের গতি স্বাভাবিক করতে সরকার বেশ আন্তরিক। আমরা শিগগিরই প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) সঙ্গে বৈঠকে বসব। কাজের খোঁজখবর নেব। সমস্যা থাকলে সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারভুক্ত (ফাস্ট ট্র্যাক) প্রকল্পগুলোর মধ্যে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর কাজ ৯৪ দশমিক ২৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ মূল সেতুর কাজের আর বাকি মাত্র ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশের কম। মূল সেতুর কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। যার মধ্যে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। সেতুর বাকি কাজ প্রায় ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ব্যয় করতে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময় রয়েছে। আর পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পের নকশা জটিলতা কেটেছে। এই প্রকল্পের অগ্রগতি ৪৩ শতাংশ। এছাড়া মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দোহাজারী-রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পসহ ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত অন্য মেগা প্রকল্পগুলোতেও সন্তোষজনক গতি আসছে না।

পদ্মা সেতু : নানা চড়াই-উতরাই পার করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সেতুটি চলাচলের জন্য উদ্বোধন করার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে দুই বছর মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। ইতিমধ্যে কাজ শেষ হয়েছে ৯৪.২৫ শতাংশ। গত সোমবার সেতুটির সব রোডওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। মূল সেতুর মোট ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবের সর্বশেষটি বসানো হয়। এখন পিচঢালাই হয়ে গেলেই ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর সড়কপথ যান চলাচলের উপযোগী হয়ে যাবে। সেতুর বুকে সবগুলো রোডওয়ে স্ল্যাব বসাতে সময় লেগেছে প্রায় ৩ বছর ৫ মাস।

এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার কারণে কাজে একটু ব্যাঘাত ঘটেছিল। চীনা পরামর্শক ও প্রকৌশলীরা কাজ করতে পারেনি। তবে এখন পুরোদমে কাজ চলছে।’

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন হলেও ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় সেতুর অবকাঠামো। এরপর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছিল ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর। একই সঙ্গে চলতে থাকে রোডওয়ে ও রেলওয়ে সø্যাব বসানোসহ অন্যান্য কাজ। ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যেই এ সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

২০০৯ সালে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। এরপর তিন দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়। এখন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়ন থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পদ্মা সেতু রেল লিংক : সেতুর বুক চিরে চলে যাবে ট্রেন। সেজন্য আলাদাভাবে নেওয়া হয়েছে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প। গত এপ্রিল পর্যন্ত এর অগ্রগতি ৪৩ শতাংশ। নকশা জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজে সমস্যা হচ্ছিল। তবে এখন সে সমস্যা কেটে গেছে। এ প্রসঙ্গে রেলসংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) গোলাম ফখরুদ্দীন এ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘কাজে কোনো সমস্যা নেই, এখন পুরোদমে কাজ চলছে।’

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এতে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। গত এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ ৪২ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পে সংশোধিত ব্যয় ধরা হয় ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এতে চীন সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বাকি ১৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা সরকার নিজে জোগান দিচ্ছে। ২০১৬ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর; কিন্তু ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের ব্যয় আরও ৪ হাজার ২৬৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

মেট্রোরেল : বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেল প্রকল্পের গতি করোনার কারণে কিছুটা কমে গিয়েছিল। এখনো ঝিমিয়ে পড়া ভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি প্রকল্পটি। কাজ চলছে ঢিমেতালে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৪৩ শতাংশ কাজ হয়েছে। জাপানের সহায়তায় মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে ২০১২ সালের জুলাইয়ে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের জুনে। তবে প্রকল্পের আশানুরূপ অগ্রগতি না থাকায় স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালের বিজয় দিবসে দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প উদ্বোধনের সংশোধিত তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার প্রকল্পে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ঋণ দিচ্ছে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। প্রথম পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব হতে আগারগাঁও অংশে পূর্তকাজের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত আগারগাঁও থেকে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত অংশের পূর্তকাজের অগ্রগতি ৪০ দশমিক ৩০ শতাংশ। কারওয়ানবাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

আলোচিত এ তিন প্রকল্প ছাড়াও অন্যান্য মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও আইএমইডি সন্তুষ্ট নয়। আইএমইডি বলেছে, ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত জাতীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশাল এসব প্রকল্পে যে ধরনের গতি থাকা প্রয়োজন কার্যত তা নেই। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে, অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে বাস্তবসম্মত সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে। এর আগেই একই ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল।

ফাস্ট ট্র্যাকের আওতাভুক্ত অন্য প্রকল্পগুলো হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, মেট্রোরেল প্রকল্প, দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। এর মধ্যে পায়রা বন্দরের কাজ শেষ হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : দেশের প্রথম পারমাণবিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অর্থের বিবেচনায় সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। গত জুলাই পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি ৩৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। ব্যয় করা হয়েছে ৪২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সার্বিক কাজ গতি খুব একটা নেই। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র : গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৪৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিওবি অংশে ২ হাজার ৪১০ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য অংশে ১৪ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৪ সালের জুলাই মাসে। জাপান সরকারের সহযোগিতায় এ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র : বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে এর কাজ শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দোহাজারী-ঘুমধুম ডুয়েলগেজ ট্র্যাক : মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা করণে প্রকল্পের গতি নেই। বর্তমানে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ থাকলেও বাকি কাজ করা সম্ভব হবে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি জুলাই পর্যন্ত অগ্রগতি ৬১ শতাংশ। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল প্রকল্পটি। সেই অনিশ্চয়তা এখনো রয়েছে। আইএমইডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ আর বেশিদিন বাকি নেই। এর মধ্যে কাজ শেষ করা কঠিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত