ভর্তি বাণিজ্য করে কোটিপতি আইডিয়ালের আতিকুর

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ০২:১৫ এএম

নীতিমালায় এ পদ না থাকার পরও তিনি রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ২০০৪ সালে আতিকুর রহমান খান এই প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আতিকুর রহমান যোগ দেওয়ার পর থেকেই নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি টাকা আয় করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো ব্যাবস্থা নেওয়া হয়নি। পদ না থাকার পরও তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে প্রশাসনিক কর্মকর্তার কোনো পদ নেই। অবৈধভাবে এ সৃষ্টি করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে মাউশি। কলেজ শাখার পরিচালককে প্রধান করে গঠিত কমিটির অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন উপপরিচালক (কলেজ) ও সহকারী পরিচালক (কলেজ)। সরেজমিন তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতামতসহ কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গত ১৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ গত সোমবার রাতে প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ আতিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে মাউশিকে নির্দেশ দিয়েছিল। ওই নির্দেশের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো।

মাউশির কমিটি গঠন সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা/উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের পত্রে তদন্ত করে প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আতিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ : আতিকুর রহমান খান ২০০৪ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, নন-এমপিও হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসনিক কাজকর্মও করেন। এ চাকরি শুরুর পর থেকে তিনি  ঢাকায় কয়েকটি বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। তার ৯৭টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে।

মাউশিতে দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, রামপুরা বনশ্রী এলাকার ৫ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর প্লটে ভিশন-৭১ নামে একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান, আফতাবনগরে চারটি বাড়ি এবং বনশ্রীতে আরেকটি বাড়ি রয়েছে আতিকুরের।। বনশ্রী এলাকাতেই খান ফিলিং অ্যান্ড এলপিজি, আফতাবনগরে ন্যাশনাল ফ্রায়েড কিচেন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া রামপুরা মসজিদ মার্কেটে বিশ্বাস লাইব্রেরি ও আফতাবনগর ‘বি’ ব্লকে বিশ্বাস বাজার নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু নিজের নামে নয় স্ত্রী নাহিদা আক্তার নীপা, বড় ভাই আব্দুস সালাম খান, ফজলুর রহমান খান ও শ্বশুর নুরুল ইসলামের নামেও লেনদেন রয়েছে।

দেশের ১৫টি ব্যাংকে আতিকুর রহমান খানের ৯৭টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যাংকে ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১১০ কোটি ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ৩৯২ টাকা লেনদেন হয়েছে।

বড় ভাই আব্দুস সালাম মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বাংলা মাধ্যম দিবা শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। গাজীপুরের কালিগঞ্জের বাসিন্দা আতিকুরের বাবা একজন কৃষক। আইডিয়াল স্কুলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ‘কনকর্ড’ নামে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। 

জানা গেছে, আতিকুর রহমান খানের মালিকানাধীন ন্যাশনাল ফ্রায়েড চিকেনের নামে ২০১৫ সালে একটি ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এছাড়া আতিকুর রহমান খানের মালিকানাধীন এইচ কে খান এন্টারপ্রাইজের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে ৮ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে।

ভর্তি বাণিজ্য করেই আতিকুর রহমান বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শাখা ছাড়াও মুগদা ও রামপুরায় দুটি শাখা রয়েছে। এই স্কুলে বাংলা মাধ্যমে প্রভাতী ও দিবা এবং ইংলিশ ভার্সনে প্রভাতী ও দিবা শাখায় প্রতি বছর অন্তত ৩ থেকে ৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। আতিকুর রহমান খান এই ভর্তি বাণিজ্য সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত